রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

রোহিঙ্গাদের সেবায় বাংলাদেশে ছুটে আসা এক কানাডীয় সেবিকার গল্প

৭ মার্চ, সডেবারি স্টার : ৩৭ বছর বয়সী কানাডীয় নাগরিক স্ট্যাসি হর্নার। অন্তারিওর সাডবারি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বে শোর হেলথকেয়ার সলিউশনস-এর সেবিকা হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। রোগির বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন কানাডার এ সেবিকা। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগঠন সামারিটান’স পার্সের সঙ্গে এসেছিলেন স্ট্যাসি হর্নার। মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অসহায় রোহিঙ্গাদের দিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা। সাডবারিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এ স্ট্যাসি হর্নারই গত বছরের জুনে একই সংস্থার হয়ে ইরাকে কয়েক সপ্তাহ সেবা দিয়েছেন।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ অভিযান জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানের ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘ এই অভিযানকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছে। হর্নার বলেন, চার মাসে সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বেশিরভাগই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। আর এইসব বিপন্ন রোহিঙ্গাকে স্বাস্থ্যসেবা দিতেই ধর্মভিত্তিক সংগঠন সামারিটান’স পার্সের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি।

সামারিটান’স পার্স একটি খ্রিস্টান মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠন। ধর্ম প্রচারক গ্রাহাম বিলির ছেলে ফ্রাংকলিন গ্রাহাম ১৯৭৯ সাল থেকে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এটি নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসীদের সংগঠন হলেও বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটে থাকা সব মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয় তারা। স্ট্যাসি হর্নার জানান, মাঠ পর্যায়ে সেবা প্রদানের সময় ধর্ম প্রচারের কাজ করা হয় না। প্রেমই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠে। ধর্মকে ছাপিয়ে মানবতাই পায় প্রাধান্য।

হোয়াইট ফিশের বেথেল ব্যাপটিস্ট চার্চের সদস্য স্ট্যাসি হর্নার রোহিঙ্গা শিবিরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ‘আমরা খ্রিস্টান কিনা সেটাও তারা জেনে আসেনি। আমরা সেখানে তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম, তাদের ক্ষত সারাতে গিয়েছিলাম এবং ঈশ্বরের প্রেম হয়ে তাদের কাছে গিয়েছিলাম।’

সামারিটান’স পার্সের কাজের লক্ষ্য সম্পর্কে স্ট্যাসি হর্নার আরও বলেন, ‘তাদের লক্ষ্য হলো সেখানে যাওয়া এবং প্রায়োগিকভাবে ঈশ্বরের ভালোবাসা প্রদর্শন করা। আপনাকে সেখানে ঈশ্বর সম্পর্কে একটি শব্দও বলার দরকার নেই। কিছুই বলতে হবে না আপনার। শুধু যা করবেন তাহলো ভালোবাসা পৌঁছে দেয়া।’

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী সংগঠন (ওসিএইচএ) এরইমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটকে বিশ্বের সবচেয়ে শোচনীয় পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তারা কয়েকদিন ধরে হাঁটার পর পৌঁছাতে পেরেছেন। যাত্রাপথে তাদেরকে গুলিবিদ্ধ হতে হয়েছে, শার্পনেলের ও স্থলমাইন বিস্ফোরণে আহত হতে হয়েছে। হর্নার বলেন, অসুস্থ অবস্থায়ও শরণার্থীদের আসতে দেখা গেছে। তিনি জানান, উত্তর আমেরিকায় তাদেরকে শৈশবে ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগের টিকা দেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের এসব টিকা নেওয়া নেই। তাই তাদেরকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। 

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছিল। হর্নারের ধারণা, অন্তত চার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। হর্নার জানান, সামারিতান’স পার্স রোহিঙ্গা শিবিরে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করেছিল এবং সেখানে ডিপথেরিয়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। স্ট্যাসি হর্নার বলেন ‘আমাদের পূর্ণাঙ্গ একটি সেবা কেন্দ্র ছিল। এটি ছিল একইসঙ্গে চিকিৎসা কেন্দ্র ও রোগিদের বিচ্ছিন্ন করে সেবা দেওয়ার কেন্দ্র। এ সেবা কেন্দ্রটি ছিল ৬০ শয্যাবিশিষ্ট।’

বাংলাদেশে থাকাকালীন প্রতিদিন ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে ঘুম থেকে জেগে যেতেন স্ট্যাসি হর্নার। গাড়িতে করে হাসপাতালে যেতে তাদের সকাল সাতটা বেজে যেতো। এরপর ১২ ঘণ্টা ধরে চলতো তাদের কাজ। কাজ করার সময় ডিপথেরিয়ার ব্যাকটেরিয়া তাদের কাপড়ে লেগে যেতো। আর তাই প্রতিদিন কাজ শেষে তাদেরকে কাপড়-চোপড় ক্লোরিন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হতো। টানা ২০ দিন ধরে এভাবে কাজ গেছেন স্ট্যাসি। দেশে ফেরার আগে ২৪ ঘণ্টার বিরতি নিয়ে এরপর তিনটি নাইট শিফটও করেছেন। কাজটি যে কষ্টকর ছিল তা স্বীকার করেছেন এ কানাডীয় সেবিকা। তবে প্রয়োজনে বার বারই এমন কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানালেন তিনি। সাডবারি স্টারকে স্ট্যাসি হর্নার বলেন, ‘এ কাজটি খুব ক্লান্তিকর, তবে নিশ্চিতভাবেই এর গুরুত্ব আছে। অবিচলভাবে আবারও এ কাজ করতে আমি প্রস্তুত আছি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ