সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

ভারত থেকে চিনি আসায় আখ চাষে ধস

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরাঃ উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আখ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। আখের ভরা মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলাতে আখের দেখা নেই বললেই চলে। ভারত থেকে চিনি আমদানির কারণে চাষীরা আখ চাষে দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে এখানকার চাষীরা আখের রশ জ্বালিয়ে পাটালি তৈরি করা হত। যার কদর ছিল যুগ যুগ ধরে। চিনির দাম কমতে  থাকায় আখ চাষীরা আখের রসের সাথে চিনি মিশিয়ে পাটালি তৈরি করতে থাকে। এর পর ও ভারতীয় চিনির আমদানির কারণে সর্বশেষ পাটালি তৈরিতেও আগ্রহ হারিয়েছে আখ চাষীরা। তারা আখের পরিবর্তে,গম,জব,সহ ধান উৎপাদনে ঝুকে পড়েছে।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলাতে ১৯৬ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়। যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৪০৮ মেঃটন।
প্রকৃত পক্ষে আবাদের পরিমান সরকারী হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ কম। কয়েকজন আখ চাষী জানান,আখ চাষে দিন দিন ক্ষতি হচ্ছে। তাই আখ বাদ দিয়ে তারা অন্য ফসল উৎপাদন করছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরা তালা ,মাগুরা, ইসলামকাটী,কুমিরা পাটকেলঘাটার সরুলিয়া,খলিষখালী,নগরঘাটা,ধানদিয়ার  কয়েকটি গ্রাম ঘুরে আখ চাষের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চোখে মেলে সীমিত পরিসরে আখ চাষ। আশ্বিন-কার্তিক মাসে মান্দার সময়ে যারা আখ কেটে রস বিক্রয় করে সংসার চালায় তারাই বর্তমানে আখ চাষ করছে বলে জানা যায়। বাণিজ্যিক ভাবে আখ চাষ করতে কম দেখা যাচ্ছে কৃষকদের।
 এরই মধ্যে ভারতে  আখ উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে  চিনি রপ্তানি করা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর এজন্য দেশটি প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাকেই টার্গেট করেছে।
সম্প্রতি রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, তুলনামূলক কম শুল্কে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় চিনি রপ্তানি করতে দুই দেশের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ভারত।
ভারত সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন বেশি চিনি উৎপাদন করবে। ফলে তাদের দেশে চিনির কোনো ঘাটতি থাকবে না। বরং বাড়তি চিনি তারা রপ্তানি করবে। খবরে বলা হয়েছে, ভারত সরকার চিনি রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সরকারকে আমদানি শুল্ক কমানোর অনুরোধ করবে।
এদিকে ভারতীয় চিনি কল অ্যাসোসিয়েশনের মহা-পরিচালক অবিনাশ বর্মণ বলেন, বাংলাদেশে কমপক্ষে আধা ডজন চিনি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান আছে। তারা অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে তা সাদা চিনিতে রূপান্তর করে।
অবিনাশ বর্মণ আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় চিনির আমদানি শুল্ক কমালে ওইসব রিফাইনারি কারখানাগুলো চিনি আমদানি করতে আগ্রহী হবে।
চলছে চিনি উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু আখের অভাবে একের পর এক  বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সরকারি চিনিকলগুলো। ইতিমধ্যে রাজশাহী, রংপুর, শ্যামপুর, জয়পুরহাট ও পাবনা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে।  আরো কয়েকটি বন্ধের পথে।
চিনি শিল্প করপোরেশন চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে (২০১৭-১৮) চিনি রিকভারি (আখ হতে প্রকৃত চিনি সংগ্রহ) বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ফলে চিনির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। তাতে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে। গতবছর ৯  লাখ ৯১ হাজার ৪৫৪ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫৯ হাজার ৯৮৪ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছিল। আর রিকভারির হার ছিল ৬ দশমিক ০৫ ভাগ। চিনি শিল্প করপোরেশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি চিনি উৎপাদন মৌসুমে চিনি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে এক লাখ ২৮০ মেট্রিক টন চিনি। আর চিনি রিকভারির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় শতকরা ৭ দশমিক ৪৩ ভাগ। চলতি ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪২ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫৫ হাজার ৯৩২ টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। রিকভারির গড় হার হচ্ছে ৫ দশমিক ৭৩ ভাগ। 
সূত্র জানায়, আগে আখ চাষ লাভজনক ছিল। কিন্তু নানাবিধ কারণে চাষিরা আখ চাষ কমিয়ে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকে। ফলে চিনি শিল্প করপোরেশনের সংকট শুরু হয়। প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচের অনেক কম দামে চিনি বিক্রি করতে হয়। ফলে লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ