শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা জবানবন্দী দন্ড প্রসঙ্গ

 জিবলু রহমান : বিএনপির পক্ষ থেকে আদালতে পেশ করা দূতাবাসের একটি পত্রে বলা হয়েছিল, কুয়েত ওই টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দিয়েছে। আদালত চিঠিটিকে ‘জাল’ বলে গণ্য করেছেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, তাঁদের দেয়া দলিলকে জাল হিসেবে মন্তব্য করার জন্য রায়দানকারী বিচারকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাব্যবস্থা নিতে তাঁরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন। তাঁর কথায়, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে কুয়েত দূতাবাসের লেখা মূল চিঠি তাঁদের কাছে আছে। সময়মতো তাঁরা সেটি উচ্চ আদালতে পেশ করবেন। একে জাল বলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অপমান করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলের মানহানি ঘটেছে।

আদালতের রায় অনুযায়ী ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আশুলিয়ার জমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য কথাবার্তা হয়। সে বছরই একটি চুক্তির আওতায় তিনি সোয়া ২ কোটি টাকা অগ্রিম নেন। ২০০৭ সালের ৩১ মের মধ্যে জমি বিক্রির দলিল সম্পাদনের তারিখ থাকলেও তা হয়নি। শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতকে এ তথ্য দিয়ে আরও বলেন, ‘২০১২ সালের জানুয়ারিতে একটি টাকার মোকদ্দমা মামলায় আমি নোটিশপ্রাপ্ত হই যে ট্রাস্টকে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে। আদালত ওই সোয়া ২ কোটি টাকা ২০১৩ সালে এক সোলেনামার ভিত্তিতে ফেরত দিতে ডিক্রি জারি করেন। এরপর আমি প্রাইম ব্যাংক নিউ ইস্কাটন ও গুলশান শাখা থেকে ১৩টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ট্রাস্টকে হস্তান্তর করি।’

বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, ওই ব্যক্তির বায়না করা সাড়ে ৭৪ শতক জমি ছিল বলে প্রমাণ মেলেনি। অর্থও সোনালী ব্যাংকের বদলে তিনি উত্তরা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন, যেখানে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কোনো হিসাব ছিল না। অন্য আসামি কাজী সালিমুল হক প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সোনালী ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ আসামি তারেক রহমান ও মোমিনুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রাইম ব্যাংকে নিয়ে আসেন। এরপর নানা কৌশলে প্রথমে নিজে কিছু টাকা আত্মসাৎ করেন, পরে আসামি শরফুদ্দিন আহমেদকে সরাসরি সহায়তা করেন।

এরপর বিচারক লিখেছেন, ওই লেনদেনে তারেক রহমান ও মোমিনুর রহমানের যৌথ স্বাক্ষর করা পাঁচটি চেক পাওয়া গেছে। কাজী কামাল নিজেই বলেছেন, ‘এই টাকা যে জনাব তারেক রহমানের নিজস্ব টাকা কিংবা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা বা অন্য কারও টাকা, বর্ণিত পাঁচটি চেক দেখে বোঝার উপায় ছিল না।’ বিচারক লিখেছেন, ‘কাজী কামালের আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য থেকে দেখা যায়, তিনি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের হিসাব হতে ইস্যু করা পাঁচটি চেক থেকে এফডিআর করেন এবং তা আসামি তারেক রহমানকে বুঝিয়ে দেন।’ এ থেকে পরিষ্কার যে আসামি কাজী কামালের হাত হয়ে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা আসামি তারেক রহমানের হাতে চলে যায়। সরকারি টাকা আত্মসাতের দায় তাই আসামি তারেক ও কাজী কামাল এড়াতে পারেন না। আদালত মনে করেন, যৌথ স্বাক্ষরে পাঁচটি চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করায় আসামি তারেকের সঙ্গে মোমিনুর রহমানও ‘সম্ভবত দায়ী’।

বিচারক আরও বলেন, আসামি শরফুদ্দিন আহমেদ ট্রাস্টের কাছে ৭৫ দশমিক ৫ শতক জমি বিক্রি না করেও আসামি কাজী সালিমুল হক ও জনৈক গিয়াসউদ্দিনের (শরফুদ্দিনের বড় ভাই) মাধ্যমে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ‘দুষ্ট মন নিয়ে’ নিজ হিসাবে জমা করেছেন। পরে ট্রাস্টের সঙ্গে ভুয়া টাকা মোকদ্দমা ও মিথ্যা সোলেনামা দাখিল করে এবং মিথ্যা কল্পকাহিনি সৃষ্টি করে তথাকথিত বায়নার টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে জমা দেওয়ার মিথ্যা কাহিনি রচনা করেছেন।

বিচারক বলেন, এটা প্রমাণিত যে ‘আসামি বেগম খালেদা জিয়াসহ অপরাপর আসামিগণ পরস্পর যোগসাজশে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে বা অন্যকে অবৈধভাবে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি এতিম তহবিলের অর্থ নামসর্বস্ব জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে স্থানান্তর করেন কিংবা করার কাজে সহায়তা করেন এবং সে কারণে তাঁরা সকলেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।’ আদালত মনে করেন, ছয় আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন। এ কারণে তাঁরা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধীও বটে।

আদালত বলেছেন, দ-বিধির ৪০৯ ধারায় আসামিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সশ্রম বা বিনাশ্রম দ-ের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু লেখা নেই। সেখানে শুধু ‘ইমপ্রিজনমেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ অবস্থায় সব আসামিকে সশ্রম কারাদ- দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি’, খালেদা জিয়ার মৌখিক বক্তব্যের এ উল্লেখটিকে বিচারক তাঁর রায়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি-’এই বাক্যে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বাদ পড়েছে। তবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সে বক্তব্য দিয়েছেন কার্যবিধির ৩৪২ ধারায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এমন নজির ভূরি ভূরি আছে, যেখানে বলা হয়েছে, এ ধারার আওতায় আসামির বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া বক্তব্যকে ব্যবহার করা যাবে না। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)

খালেদা জিয়া মামলায় যেসব জবানবন্দী দিয়েছেন তা সকল সংবাদপত্রে এসেছে। রায়ে বিকৃতির যে অভিযোগ এসেছে তা খুব দুঃখজনক। ইতিহাসের প্রয়োজনে কয়েকটি জবানবন্দীর বিবরণ পূর্ণরায় আলোচনা করলাম। ১৯ অক্টোবর ২০১৭ ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আদালতে দেয়া খালেদা জিয়ার জবানবন্দীর পূর্ণ বিবরণ এরূপ-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মাননীয় আদালত, 

আসসালামু আলাইকুম। 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে কেন্দ্র করে আমিসহ অন্যান্যের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও পুরোপুরি বানোয়াট। সমস্ত অভিযোগ স্ববিরোধী বক্তব্যে ভরপুর।

এই ট্রাস্টের অর্থায়ন, পরিচালনা বা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং এখনো নেই। 

দুর্নীতি দমন কমিশনÑদুদকের আইনগত কর্তৃত্ব ও এখতিয়ারের বাইরে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর এমন একটি ভিত্তিহীন অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় বিচারের নামে দীর্ঘদিন ধরে আমি হয়রানি, পেরেশানি ও হেনস্তার শিকার হচ্ছি। 

আমার স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হচ্ছে। বিঘিœত হচ্ছে আমার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য, তাদের স্বার্থ ও কল্যাণে নিয়োজিত আমার প্রয়াস ও পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

 

এমন সব হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার কারণে আমার দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও জনগণের এক বিরাট অংশকে থাকতে হচ্ছে গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ