সোমবার ৩০ জানুয়ারি ২০২৩
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা জবানবন্দী দণ্ড প্রসঙ্গ

জিবলু রহমান : [দুই]
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, বিএনপি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘বেশি দিন’ কারাগারে রাখতে চায়। দুদকের আইনজীবীকে সময়মত আপিল ও জামিন আবেদনের কপি সরবরাহ করা হলে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ই খালেদা জিয়ার জামিন হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আজকে খালেদা জিয়া কারাগারে, আমার নেত্রী যদি কারাগারে থাকত, তবে যত দ্রুত সম্ভব তার মুক্তি কামনা করতাম, দ্রুত মামলা লড়তাম। কিন্তু বিএনপি নেতৃবৃন্দ অহেতুক, যাতে করে বেশি দিন বিএনপি নেত্রী কারাগারে থাকে, সেই ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচার বহু আগেই শেষ করা যেত। কিন্তু বিএনপির আইনজীবীরা ‘পরিকল্পিতভাবে’ মামলাটি বিলম্বিত করেছে, যাতে নির্বাচনের বছরে ‘বিশৃঙ্খল পরিবেশ’ সৃষ্টি করা যায়। রায়ের কপির জন্য যথাসময়ে দরখাস্ত দেয়নি, পিটিশনের জন্য যথাসময়ে দরখাস্ত দেয়নি, ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলার আপিল শুনানি (গ্রহণযোগ্যতা) হয়েছে, সেখানেও জামিনের জন্য দুদকের কাগজপত্র যথাসময়ে দেয়নি।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম একা নন, প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের নেতারা খালেদা জিয়ার মামলা ও মুক্তি আন্দোলন নিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে চলা আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রেখে সরকারের পাতা ফাঁদ এড়াতে পারছে বিএনপি। এতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে বহুগুণ। পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলেও বিএনপির প্রশংসা হচ্ছে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, খালেদা জিয়াকে জেলে ঢুকানো হলে বিএনপি জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংস কর্মসূচি দিবে। এতে সরকার সন্ত্রাস দমনের নামে বিএনপি নেতা-কর্মীদেরও নির্মূলের সুযোগ পেয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি জাতীয় নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা আরো স্থায়ী করে নিতে পারবে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকারের পাতানো সেই ফাঁদে পা না দেয়ায় উল্টো এখন ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক, বিবৃতি, সমর্থন ও খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেও সরকারের প্রতি চাপ বাড়াচ্ছেন বিশ্বনেতারা। গণতন্ত্রের স্বার্থে বিশ্ববাসীর এমন ভূমিকায় সরকারের মধ্যে অস্বস্তিও তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে। যুক্তরাষ্ট্র এমন নির্বাচনই দেখতে চায় জানিয়ে তিনি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই উদ্যোগ নেয়ার ওপর জোর দেন। মার্কিন দূত এ-ও বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে তার দেশ সব ধরণের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বিকেলে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। তাকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে এরই মধ্যে হুশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধী জোট। এ অবস্থায় বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশ গ্রহণের বিষয়টি কিভাবে আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র এটাই ছিল রাষ্ট্রের কাছে সাংবাদিকদের মূখ্য জিজ্ঞাসা। রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট অবশ্য এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে তার আশাবাদের কথাই বলেছেন। তিনি এটাই বলেছেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোন পরিবর্তন নেই। তার ভাষায়- ‘আমাদের অবস্থান আগের মতোই আছে। আমরা চাই অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং সর্বদলের অংশগ্রহণ। বাক স্বাধীনতা, সংগঠন করার অধিকার ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার গণতন্ত্রের জন্য দরকার। পয়োজন সহিংসতাযুক্ত নির্বাচন। এটি কেবল নির্বাচনের দিন নয়, সবসময়ের জন্য প্রযোজ্য।’ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন জাতিকে উপহার নিতে নির্বাচন কমিশনের যে অঙ্গীকার রয়েছে তা-ও স্মরণ করে পশ্চিমা ওই কূটনীতিক। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আদালত ৮ ফেব্রুয়ারি ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা আত্মসাতের দায়ে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনকে দণ্ডিত এবং প্রত্যেককে আত্মসাৎ করা সমপরিমাণ টাকা সমহারে জরিমানা করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক ড. আক্তারুজ্জামান-এর ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ে প্রকাশিত তথ্য হলো-১৯৯১ সালে ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের’ নামেই ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা এসেছিল। অথচ খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে এই অর্থ দেয়া হয়েছে বেসরকারিভাবে, সরকারি তহবিল গঠনের জন্য নয়।
বিশেষ আদালত এই রায়ে বলেছেন, এই দুর্নীতির ঘটনায় মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। আর তাতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তারেক রহমান, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগনে মোমিনুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী সালিমুল হক কামাল এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। খালেদা জিয়া ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ এবং তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকী ‘সরকারের আর্থিক নিয়মকানুন-সংক্রান্ত বিধিবিধানের বরখেলাপ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা’ করার দায়ে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত হয়েছেন।
আসামি খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে টাকা তুলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে ব্যাংকে গচ্ছিত রাখায় তা বেড়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা হয়েছে। বিশেষ আদালত তাঁর রায়ে এই দাবি নাকচ করে বলেছেন, সঞ্চিত টাকা থেকে আত্মসাৎ না করলে এ টাকার পরিমাণ আরও বাড়ত। তা ছাড়া ঘোষিত লক্ষ্যে ব্যবহার না করে অনির্দিষ্টকাল টাকা ফেলে রাখাও অপরাধ।
রায়ের বিবরণে আছে, প্রধানত সচিব কামাল সিদ্দিকীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে কুয়েত থেকে আসা অর্থ সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখা হিসাবে গচ্ছিত রাখা এবং দুই বছর পর ১৯৯৩ সালে তা দুই ভাগ জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের হিসাবে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার ‘যোগসাজশ’কে শাস্তিযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টাকা গ্রহণ করায় তা সরকারি টাকায় পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে পাওয়া এ অনুদান তিনি দাতার কাছে ফেরত দিতে পারতেন। তিনি তা করেননি। ১৯৯৩ সালে জিয়া অরফানেজের নামে বগুড়ায় কেনা প্রায় ৩ একর জায়গা এখনো ধানি জমি হিসেবে পড়ে আছে। তাই তিনি যে ‘কোনো আইন লঙ্ঘন’ করেননি, সে বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
খালেদা জিয়ার অনিয়ম সম্পর্কে রায়ে বলা হয়, ‘খালেদা জিয়া এতিম তহবিলের কাস্টডিয়ান হয়েও কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দুটি চেকের মাধ্যমে ট্রাস্টদ্বয়ের প্রতিটি ট্রাস্টকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করেছিলেন। সরকারি এতিম তহবিলের টাকা রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হয়ে অন্যায়ভাবে অন্য দুটি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে হস্তান্তর করা সঠিক হয়নি। কাজেই আসামির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে প্রতীয়মান হয়।’
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল কেবলই তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় মোমিনুর রহমানকে নিয়ে। এই ট্রাস্টে ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে সেই অর্থ স্থানান্তরের আগে হিসাবটিতে কোনো টাকা ছিল না। সে অর্থ কীভাবে ‘আত্মসাৎ’ করা হয়েছে, তা-ই ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার মূল বিচার্য।
কুয়েত ওই টাকা সরকারিভাবে দেয়নি, কেবল জিয়া অরফানেজকে দিয়েছিল-খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য আদালত নাকচ করেছেন।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ