সোমবার ৩০ জানুয়ারি ২০২৩
Online Edition

প্রসঙ্গ আসামের বাংলাভাষীদের বিতাড়ন

ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসাম থেকে প্রায় দেড় কোটি বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিককে তাড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, কিছুদিন আগে আসামের রাজ্য সরকার এক কোটি ৯০ লাখ নামের যে বৈধ নাগরিক তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করেছে, সে তালিকায় ইচ্ছাকৃতভাবে এই দেড় কোটি বাংলাভাষীর নাম বাদ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, নাগরিক তালিকা তৈরির সময় থেকেই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এর বিরুদ্ধে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্নস্থানে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা বলেছেন, শুধু বাংলাভাষী বলে নয়, প্রায় দেড় কোটি ভারতীয়কে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রধান কারণ, তারা মুসলিম। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগকে পাশ কাটানোর কৌশল হিসেবে যুক্তি হাজির করতে গিয়ে সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, এসব বাংলাভাষী মোটেও ভারতীয় নয়। তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়ে বসবাস এবং চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। তাদের কারণে প্রকৃত ভারতীয়রা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো প্রচারণা চালানো হয়েছে। প্রচারণার এই অভিযানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সবশেষে অংশ নিয়েছেন ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তিনি আবার এর মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ও আবিষ্কার করে বসেছেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে জেনারেল রাওয়াত বলেছেন, চীনের মদদে পাকিস্তান লাখ লাখ বাংলাদেশি মুসলিমকে আসামে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এর ফলে আসামের জনবিন্যাসে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে। আগে আসামের মাত্র চার-পাঁচটি জেলায় মুসলিমদের প্রাধান্য ছিল, বর্তমানে সেখানে আট-নয়টি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান অর্জন করেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে চীনের কালো হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলে জেনারেল রাওয়াত সমগ্র বিষয়টিকে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগিতায় চীনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ভারতের সেনা প্রধান অবশ্য দেড় কোটির কথা বলেননি, বলেছেন লাখ লাখ।
অন্যদিকে আসামের বিজেপি সরকার বলে চলেছে, বাংলাদেশ থেকে নাকি ৩০ লাখ মুসলিম অনুপ্রবেশ করে ওই রাজ্যে বসবাস করছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেয়ার পর গত বছরের শেষদিন ৩১ ডিসেম্বর সরকার যে নাগরিক তালিকা প্রকাশ করেছে তার মধ্যে ৩০ লাখকে নয়, বাদ দেয়া হয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ বালাভাষীকে- যাদের প্রায় সকলেই মুসলিম। এই তালিকাকে সরকার অবশ্য চূড়ান্ত বলেনি। জানিয়েছে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে আগামী ৩১ মে। ওই তালিকার কারণে কথিত বাংলাদেশিদের সংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, আসাম সরকার একই সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় কেন্দ্র বানানোর কাজ শুরু করেছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘রাষ্ট্রবিহীন’ পরিচয়ে রাখা হবে। এরকম অনেক কেন্দ্রে এরই মধ্যে কয়েক হাজার বাংলাভাষী মুসলিমকে আটক রাখা হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক। আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল বলেছেন, ‘রাষ্ট্রবিহীন’ বাংলাভাষীদের কোনো সাংবিধানিক অধিকার থাকবে না। তবে তারা জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক মানবাধিকার ভোগ করবে। অর্থাৎ তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় দেয়া হবে। একই কারণে আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আসামের বিজেপি সরকারের বাংলাভাষী মুসলিম বিরোধী এই নীতি ও কর্মকান্ড সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, অতীতে অনেক উপলক্ষে খোদ ভারতেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে এমন একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের আগে থেকে যারা আসামে বসবাস করার প্রমাণ দিতে পারবে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে ২০১৬ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের সময় থেকেই বিজেপি সে সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। বিজেপি এই বলেও অভিযোগ তুলেছে যে, লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশির কারণেই আসামের প্রকৃত নাগরিকরা চাকরি পাচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যেও পিছিয়ে পড়েছে তারা।
এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই আসামের বিজেপি সরকার নাগরিক নিবন্ধনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। ভিত্তি বছর ও তারিখ হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে নির্ধারণ করে সরকার বলেছিল, রাজ্যের বৈধ নাগরিকের স্বীকৃতি পেতে হলে প্রত্যেককে নথি ও কাগজপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে ও তার পরিবার সদস্যরা ওই তারিখের আগে থেকে আসামে বসবাস করে আসছে। অন্যদিকে বিশেষ করে মুসলিমরা জানিয়েছে, অশিক্ষিত হওয়ায় তাদের পূর্বপুরুষরা এ ধরনের নথি বা কাগজপত্রের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি বলে সেগুলো সংরক্ষণও করেননি। এজন্যই মুসলিমদের কাছে সরকারকে দেখানোর মতো যথেষ্ট নথি বা কাগজপত্র নেই বললেই চলে। সে কারণে জাতীয় নিবন্ধন তালিকায়ও তাদের নাম ওঠেনি। মুসলিম এ জনগোষ্ঠীকেই রাজ্যের বিজেপি সরকার অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর আয়োজন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর মনে করি। কারণ, নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে ভারতেরই হিন্দু ও মুসলিম রাজনীতিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে তাদের বাপ-দাদার ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করার পদক্ষেপ নেয়া হলে হিংসা, মারামারি, খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়বে। ভারতীয় মুসলিমরা তো বটেই, আসামের মুসলিমদের সমর্থনে এগিয়ে আসবে অন্য সব রাজ্যের সাধারণ মানুষও। তেমন অবস্থায় আসাম অশান্ত হয়ে উঠবে, যার পরিণতি রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জন্য শুভ হবে না।
আমরা তাই মনে করি, অমন ভয়ংকর পরিণতি এড়ানোর স্বার্থে হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত আসাম রাজ্যের বিজেপি সরকারকে অনতিবিলম্বে মুসলিম বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া থেকে নিবৃত্ত করা। বাংলাদেশ সরকারকেও তৎপর হতে হবে- যাতে এত বিপুল সংখ্যক মুসলিমকে আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো সম্ভব না হয়। এ জন্য সরকারের উচিত জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং ভারত সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ