সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সিরিয়ার পূর্ব গৌতার পরিস্থিতি ‘কল্পনাতীত’ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫০

২১ ফেব্রুয়ারি, বিবিসি : সিরিয়ার বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত গৌতার পূর্বাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর কয়েকদিনের টানা বোমাবর্ষণের পর সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ধারণাতীত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটিতে জাতিসংঘের সমন্বয়ক পানোস মৌমজিস।

বিবিসিকে তিনি বলেছেন, রাজধানী দামেস্কের কাছের এ এলাকায় আসাদবাহিনীর গোলাবর্ষণ ‘চরম যন্ত্রণাদায়ক’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

এ দফার হামলায় বিদ্রোহীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ওই এলাকাটিতে অন্তত আড়াইশ মানুষ নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

সিরীয় বাহিনীর দাবি, তারা পূর্ব গৌতাকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করতে লড়ছে।

বিবিসি বলছে, রুশ সমর্থিত সিরিয়ার সরকারপন্থি বাহিনী রোববার রাত থেকে বিদ্রোহীদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি পূর্ব গৌতা পুনরুদ্ধারে তৎপরতা বাড়ায়।

দামেস্কের কাছে পূর্ব গৌতাই বিদ্রোহীদের সর্বশেষ বড় ঘাঁটি। এখানকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইসলামপন্থি দল জঈশ-ই-ইসলাম। আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট সাবেক জিহাদি জোট হায়াত তাহির আল-শামও এলাকাটিতে বেশ সক্রিয়।

“নারী ও শিশুদের চিৎকার-কান্নার শব্দ তাদের বাড়ির জানালা দিয়ে শুনতে পাচ্ছি আমরা। ক্ষেপণাস্ত্র ও মর্টার পড়ছে যেন বৃষ্টির মতো। এই দুঃস্বপ্ন থেকে পালানোর জায়গা নেই, এটি শেষও হয় নি,” বলেন পূর্ব গৌতার অধিবাসী ফিরাস আব্দুল্লাহ।

আসাদবাহিনীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত রাশিয়া ও ইরানের পাশাপাশি তুরস্কের অ্যাখ্যা দেওয়া এ ‘ডি-এস্কেলেশন জোনে’ ২০১৩-র রাসায়নিক হামলার পর এবারের বোমাবর্ষণকেই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বলছেন এলাকাটিতে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা।

তারা জানান, সরকারি বাহিনীর হামলায় নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৫০-রও বেশি; আহতের সংখ্যা প্রায় ১২০০। মঙ্গলবার পূর্ব গৌতার আরও ১০টি শহর ও গ্রামে সরকারি বাহিনী নতুন করে বোমাবর্ষণ করেছে বলেও দাবি তাদের।

মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে এবং আহতদের সরিয়ে নিতে এলাকাটিতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

“মানুষের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই; তারা টিকে থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু অবরোধের কারণে সৃষ্ট ক্ষুধা তাদের আরও দুর্বল করে ফেলছে,” ইউনিয়ন অব মেডিকেল কেয়ার অ্যান্ড রিলিফ অর্গানাইজেশনকে এমনটাই বলেন স্থানীয় এক চিকিৎসক।

জাতিসংঘের এক মুখপাত্র সোম ও মঙ্গলবার পূর্ব গৌতায় সরকারি বাহিনীর হামলায় অন্তত ছয়টি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের পরিমাণ বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মৌমজিস।

বিবিসি বলছে, গত বছরের নভেম্বরের শেষ থেকে সিরিয়ার সরকার পূর্ব গৌতায় প্রতিদিন একটি করে কনভয়কে মানবিক সেবা দিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পরও ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

এলাকাটিতে রুটির দাম দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ২২ গুণ বেশি হয়ে গেছে, পাঁচ বছরের নিচে অন্তত ১২ শতাংশ শিশু ভুগছে ভয়াবহ অপুষ্টিতে।

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এ সর্বাত্মক লড়াইয়ের পাশাপাশি তুর্কি বাহিনীকে ঠেকাতে উত্তরের কুন্দি এলাকা আফরিনেও প্রবেশ করেছে সরকার সমর্থিত বাহিনী।

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে কুন্দিদের সরিয়ে দিতে কয়েক সপ্তাহ আগে সীমানা পেরিয়ে সিরিয়ার আফরিনে প্রবেশ করে তুর্কি বাহিনী। মঙ্গলবার আফরিনে আসাদসমর্থিত বাহিনীর অগ্রবর্তী দলকে ছত্রভঙ্গ করতে তাদের লক্ষ্য করে গোলা ছোডার কথাও জানিয়েছে আঙ্কারা।

আঙ্কারা সিরিয়ার স্বায়ত্তশাসিত ওই এলাকা থেকে কুর্দি গেরিলাদের নির্মূলে কয়েক সপ্তাহ ধরে অভিযান চালিয়ে আসছে। তুর্কি অভিযান মোকাবেলায় কুন্দি ওয়াইপিজি গেরিলারা পরে সিরীয় বাহিনীর সহায়তা কামনা করে।

ওয়াইপিজির অনুরোধে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার সিরিয়ার সরকার সমর্থক বাহিনী তুরস্ক সীমান্তের দক্ষিণে কুন্দি অধ্যুষিত এলাকা আফরিনের প্রবেশ করে।

তুরস্কের এ অভিযানকে সার্বভৌমত্বের ওপর ‘নির্লজ্জ আক্রমণ’ অ্যাখ্যা দিয়েছে সিরিয়া; সিরীয় বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হলেও আঙ্কারা বলছে, তারা অভিযান থেকে পিছু হটবে না।

রুশ বিমান হামলা ও ইরান সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তায় আসাদ সমর্থিত বাহিনী সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইদলিবেও বিরোধীদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ডিসেম্বর থেকে অব্যাহত ওই হামলায় ইদলিবের তিন লাখেরও বেশি অধিবাসী বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বলেছেন, সিরিয়ার পূর্ব গৌতায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি ‘গভীরভাবে শঙ্কিত’। সেখানে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সরকারি বাহিনীর বিমান হামলায় শতাধিক লোক নিহত হওয়ার পর তিনি এ শঙ্কা প্রকাশ করলেন।

খবরে বলা হয়, গুতেরেস বেসামরিক নাগরিক রক্ষাসহ মানবিক আইনের মূল নীতি সমুন্নত রাখতে সকল পক্ষের প্রতি আহবান জানান।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ মুখপাত্র স্টিফান দুজারিক বলেন, ‘পূর্ব গৌতায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ায় জাতিসংঘ মহাসচিব গভীরভাবে শঙ্কিত।’

মানবাধিকার বিষয়ক সিরীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানায়, মঙ্গলবার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব গৌতায় সিরিয়া ও রাশিয়ার ব্যাপক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১০৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ শিশু রয়েছে।

 সেখানে এর আগের দিন সোমবারের বিমান হামলায় সিরিয়ার ১২৭ নাগরিক নিহত হয়। সবমিলের সেখানে নিহতের সংখ্যা আড়াইশো ছাড়িয়েছে বলে খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

দুজারিক বলেন, ‘পূর্ব গৌতায় বিমান হামলা ও গোলা বর্ষণের কারণে সেখানকার প্রায় চার লাখ লোক আতংকের মধ্যে রয়েছে।’তিনি আরো বলেন, ‘সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর অবরোধের কারণে পূর্ব গৌতার বাসিন্দারা অপুষ্টিসহ চরম দূরাবস্থার মধ্যে বসবাস করছে।’

গুতেরেস স্মরণ করিয়ে দেন যে পূর্ব গৌতা রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ঘোষিত একটি অস্ত্রবিরতি অঞ্চল হিসেবে আখ্যায়িত। এ ব্যাপারে তিনি সকল পক্ষকে তাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি মনে করিয়ে দেন।

এদিকে জরুরি মানবিক সাহায্য সরবরাহ ও চিকিৎসার সুযোগ দিতে ৩০ দিনের অস্ত্রবিরতি দাবির খসড়া প্রস্তাবের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সিরিয়ায় সরকারিবাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিমান হামলার ঘটনা নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫০-এ দাঁড়িয়েছে। দেশটির রাজধানী দামেস্কের নিকটবর্তী বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অবরুদ্ধ এলাকা পূর্ব গউতায় এ ঘটনা ঘটে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবারও সেখানকার অন্তত ১০টি শহর ও গ্রামে বোমা হামলা হয়।এর আগে গত সোমবার পূর্ব গৌতায় সরকারি হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হন।মানবাধিকারকর্মীদের বরাতে জানা গেছে, গউতায় দুই দিনে ৫০ জনেরও বেশি শিশু নিহত হয়। দেশটির সরকারি বাহিনীর ৪৮ ঘণ্টার গোলাবর্ষণে এ পর্যন্ত আরো ১২০০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া এলাকাটিতে প্রায় চার লাখ মানুষ আটকা পড়ে আছে। এদিকে গৌতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ