মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

‘নিরাপত্তাহীনতা ও পুলিশী হয়রানি থেকে বাঁচতে শহরমুখী তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা

খুলনা অফিস: খুলনাঞ্চলের তৃণমূল জনপ্রতিনিধিরা নানা কারণে শহরমুখী। ফলে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে প্রান্তিক জনমনে। বিপদ-আপদ, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে প্রিয় জনপ্রতিনিধিকে ডেকেও সহযোগিতা না পাওয়াতে ক্ষুব্ধ তৃণমূল জনগোষ্ঠী। খুলনার নয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান, দু’টি পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ৬৮ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বররা অধিকাংশ-ই শহরে সময় কাটান বেশি। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী জেলার জনপ্রতিনিধিরাও খুলনা শহরে বসবাস করছেন। জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শহরে অবস্থান করার মূল কারণ নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও পুলিশী হয়রানি থেকে সুরক্ষা। তবে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধিরা এসব থেকে কিছুটা সুরক্ষিত। তারা শহরে থাকছেন পরিবার-পরিজনের সাচ্ছন্দ্য জীবন-যাপন ও রাজনৈতিক কারণে। নিরাপত্তার কারণে পার্শ্ববর্তী জেলার জনপ্রতিনিধিরাও বিভাগীয় শহর খুলনায় বসবাস করেন। কিন্তু তাতেও শঙ্কামুক্ত নন তারা। তবে সুখে-দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবার পর এলাকায় না থাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৃণমূল জনগোষ্ঠীর। সাবেক জনপ্রতিনিধিরাও ভুলতে বসেছেন জনসেবা। ফলে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অতীতের সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এখন আর নেই। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রূপসা উপজেলার টিএস বাহিরদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর শেখ ব্যবসায়িক কারণে থাকেন ঢাকায়। প্রতি সপ্তাহের দু/একদিন তিনি পরিষদে আসেন।
প্রত্যেক ইউপি সদস্যের কাছে অগ্রীম স্বাক্ষর করা নাগরিক সনদপত্র থাকে, তারা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত নাগরিক সনদপত্র সরবরাহ করেন। অন্য জনপ্রতিনিধিরা এলাকাতেই থাকেন। নাগরিক সনদপত্র কোন ইউপি সদস্যের কাছে থাকে না দাবি করে টিএসবি ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, ‘শুক্র-শনিবার ছাড়া বন্ধের দিনগুলো ঢাকায় থাকি এটা সত্যি।
তবে নাগরিক সনদপত্র অগ্রীম স্বাক্ষর করে মেম্বরদের কাছে রেখে যাই অভিযোগটা সঠিক নয়। কে এসব অভিযোগ দেয় আপনাদের? আমি এই মুহূর্তে (মঙ্গলবার দুপুর পৌণে ২টার দিকে) পরিষদে বসা।’ কয়রা উপজেলার কোন চেয়ারম্যান শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও ক্ষমতাসীন দলের একাধিক ইউপি সদস্যের বাড়ি রয়েছে শহরে। একই অবস্থা ডুমুরিয়া উপজেলায়। পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু জাফর সিদ্দিকী রাজু বসবাস করেন শহরেই। পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট স ম বাবর আলীর পরিবার হাজী মহসিন রোডে বাসায় থাকলেও তিনি উপজেলা পরিষদের কোয়াটারে থাকেন। বটিয়াঘাটার ভান্ডারকোট ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ইসমাঈল হোসেন মোল্লা বাবু নগরীর পশ্চিম বানিয়াখামার ও সুরখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হাদী সরদার গল্লামারী এলাকায় বসবাস করেন। ফুলতলা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা নিজ নিজ এলাকাতেই বসবাস করেন। 
গেল বছরের ২৫ এপ্রিল রাতে জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক ফুলতলা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সরদার আলাউদ্দিন মিঠু ও তার দেহরক্ষী নওশের আলী গোয়েন্দা পুলিশের পোশাক পরিহিত আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। ডবল হত্যাকান্ডের এ ঘটনাটি প্রশাসন ও খুলনাবাসীকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। দাকোপের উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেনের শহরের আহসান আহমেদ রোডে সিটি ল’ কলেজের সামনে ও বয়রায় মহিলা কলেজের বিপরীতে দু’টি বাড়ি রয়েছে। তবে বেশির ভাগ সময় চালনায় মাসুম শ্রিম্প্রিস হ্যাচারির বাসায় কাটান বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া উপজেলার ১নং পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল কাদের, ৫নং সুতারখালী ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির, জেলা পরিষদ সদস্য কেএম কবির হোসেন ও জয়ন্তী রানী সরদার এবং সুতারখালীর সংরক্ষিত ইউপি সদস্য খাদিজা আক্তারের শহরে বাড়ি রয়েছে। দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী শহরের বাড়ি থেকে নিয়মিত পরিষদে অফিস ও জনসেবা করেন বলে দাবি তার। তেরখাদা উপজেলা চেয়ারম্যান শরফুদ্দীন বিশ্বাস বাচ্চু, ভাইস-চেয়ারম্যান মোল্লা এহিউল ইসলাম ও হোসনেয়ারা চম্পা, সদর ইউপি চেয়ারম্যান এফএম অহিদুজ্জামান, বারাসাতের ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আলমগীর ও মুধপুরের ইউপি চেয়ারম্যান মো. মুহসিন বেশিরভাগ সময় শহরের বাড়িতে থাকেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জানা গেছে, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইলের কয়েকজন সাবেক-বর্তমান জনপ্রতিনিধি খুলনা শহরে বসবাস করছেন। তাদের প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীনতার কারণেই এলাকা ছেড়েছেন বলে একাধিক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন।
বাগেরহাটের ফকিরহাট সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান খান (৪৫) ও তার মোটরসাইকেল চালক মুন্না শিকদার (৩০) কে রূপসা উপজেলার আমদাবাদ স্কুলের সামনে ২০১৩ সালের ১৮ মে সকালে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। খুলনা শহরের বাসা থেকে রূপসা ফেরীঘাট পার হয়ে বাগেরহাটের ফকিরহাট ইউনিয়ন পরিষদে যাচ্ছিলেন তিনি। টানা তিন মেয়াদের এ চেয়ারম্যান শুধু নিরাপত্তার কারণে খুলনা শহরের বাগমারা এলাকায় বসবাস করতে তিনি।
এখনো সেখানে বসবাস করছেন তার স্ত্রী বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান শিরিনা আক্তার। এ হত্যাকান্ডের অভিযোগে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কারাগারে রয়েছেন।
সর্বশেষ, গত বছরের ২৫ আগস্ট রাতে খুলনার দিঘলিয়ার নিজ বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় নড়াইলের হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা নাহিদ হোসেন মোল্লাকে। সুশাসনের জন্য নাগরিক ‘সুজন’র খুলনা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ জাফর ইমাম বলেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জায়গাটা এখন অনুপস্থিত; সে জন্যেই জনপ্রতিনিধিরা যথেচ্ছা সময় কাটান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ