মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

মানবাধিকার প্রসঙ্গ

বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম : [দুই]
শুধু ন্যায় বিচার করতেই বলা হয়নি, বরঞ্চ সেই সাথে যেসব অমুসলিম অসদাচরণ করে তাদের সঙ্গে সদাচরণ করারও উপদেশ দেয়া হয়েছে : ‘ভাগ আর মন্দ সমান নয়। অন্যায় ও মন্দকে দূর করে দেয় ভাল দিয়ে যা অতীব উত্তম। দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা ছিল, সে তোমার প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে’। (সূরা হামীম আস সাজদা-৩৪)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমরা (রা:) সূত্রে নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ প্রাণকে (যিম্মি অথবা রাষ্ট্র কর্তৃক নিরাপত্তা প্রাপ্ত ব্যক্তি) হত্যা করল, সে বেহেশতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ বেহেশতের গ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। (বুখারী)।
মানবাধিকার: আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। অজ্ঞ সমাজের এই অধঃপতিত মানসিকতার প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (সা:) কন্যা লালন পালনের এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার কারার অস্বাভাবিক পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেন।
‘যে ব্যক্তি পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দু’টি কন্যা সন্তান প্রতিপালিত করেছে, কিয়ামতের দিন আমার ও তার মধ্যে কোন দূরত্ব থাকবে না। এ কথা বলে তিনি তাঁর আঙ্গুলগুলোকে পরস্পরের সাথে মিশিয়ে দেখালেন। (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: ‘কোন বাপ তার সন্তানকে সুন্দর নৈতিক চরিত্র শিক্ষা দানের চাইতে উত্তম কিছু দান করে না।’ (তিরমিযী, বায়হাকী)।
মানুষ তার সন্তানকে ও পরিবার পরিজনের জন্য যা কিছু ব্যয় করে তা যদি আল্লাহ্র সন্তুস্টি লাভের উদ্দেশ্যে তার বিধান অনুযায়ী ব্যয় করে, তবে এই ব্যয় আল্লাহর পথে ব্যয় বলে গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: মুসলমান যখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আশায় আপন পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করে, তখন তা তার পক্ষে ‘সদকা’ বলে গণ্য হয়’ (বুখারী, মুসলিম)।
অপর হাদীসে এর চাইতেও অগ্রসর হয়ে বলা হয়েছে: ‘মানুষ যা ব্যয় করে তন্মধ্যে সর্বোত্তম দীনার হচ্ছে সেটি, যা সে আপন বাল-বাচ্চাদের জন্য ব্যয় করে, যা সে ব্যয় করে আল্লাহ্র পথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে, কোন পশুর জন্যে এবং যা সে ব্যয় করে তার আল্লাহর পথের সাথীদের জন্যে।’ (মুসলিম)।
পরিবার পরিজন ছাড়াও সকল আত্মীয় স্বজনের প্রতিই আমাদের কর্তব্য রয়েছে। কারণ, একদিকে তারা মানুষ হিসেবে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য রয়েছে। অপরদিকে তারা আমাদের আত্মীয় আর এ হিসেবেও তাদের প্রতি রয়েছে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘মিসকীনদের জন্য ব্যয় করা একটি সদকা। আর আত্মীয়দের জন্য ব্যয় করা দুটি সদকা। কারণ, এটি একদিকে দান আর অপরদিকে রক্ত সম্পর্ক রক্ষা করা।’ (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, দারমী, মুসনাদে আহমাদ)।
অমুসলিমদের অধিকার: পারস্পরিক অধিকার প্রযোজ্য হবার এবং প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে মুসলমান হবার শর্ত নেই। প্রতিটি মানুষ হিসেবে সুবিচার, দয়া এবং উত্তম ব্যবহার লাভের অধিকারী। প্রত্যেক অসহায় দারিদ্র ব্যক্তি অসহায়।
দরিদ্র হিসেবে আমাদের সহানুভূতি লাভের অধিকারী। প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের উপর আমাদের প্রত্যেক প্রতিবেশীর অধিকার বর্তায়। আমাদের উপর আমাদের প্রত্যেক আত্মীয়ের অধিকার বর্তায়, চাই সে মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম। কুরআন পাকে বলেছেন:
‘যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি, তাতে কল্যাণকর ও সুবিচারপূর্ণ ব্যবহার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। অবশ্যই আল্লাহ সুবিচারকদের পছন্দ করেন।’ (সূরা আল-মুমতাহিনা; আয়াত-৮)
অমুসলিমরা যদি জুলুম এবং বাড়াবাড়ি করে, সেক্ষেত্রে মুসলমানদের কি করতে হবে সূরা শুরায় সে বিষয়ে বিধান দেয়া হয়েছে: ‘অবশ্য যে ব্যক্তি সবর অবলম্বন করবে এবং ক্ষমা করে দেবে, তার এ কাজ নিঃসন্দেহে উচ্চমানের কাজ।’
অন্য আয়াতে আছে : ‘শুধু ন্যায় বিচার করতেই হয়নি, বরঞ্চ সেই সাথে যেসব অমুসলিম অসদাচরণ করে তাদের সঙ্গে সদাচরণ করারও উপদেশ দেয়া হয়েছে। (সূরা মায়েদা: আয়াত-৮)।
ভাল আর মন্দ সমান নয়। অন্যায় ও মন্দকে দূর কর সেই ভাল দিয়ে যা অতীব উত্তম। দেখবে তোমার সাথে যার শত্রুতা ছিল, সে তোমার প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে। (সূরা হামীম আসসাজদা : আয়াত ৩৪)।
হাদীসের মধ্যে আসছে-
‘মুসলিম সে, যার মুখ এবং হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে’ (বুখারী, মুসলিম)
হাদীসের মধ্যে আসছে-
‘কুধারনা থেকে বিরত থেকো। কেননা, কুধারনা সবচাইতে বড় মিথ্যা কথা। কারো পিছে গোয়েন্দাগিরি করো না। কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না। একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ো না। পরস্পরের প্রতি হিংসায় লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা করো না। পরস্পরের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহর বান্দাহ হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও। (বুখারী/মুসলিম)
হাদিস :
অর্থ : যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রত্যেককে ভালো না বাসবে ও দয়া না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না। (তিরমিযী)
হাদিস : একজন মুসলমান অন্র মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং অন্য মুসলমানকে হত্যা করা কুফরি (বুখারী)।
মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণপত্রের ত্রিশটি ধারার মধ্যে কয়েকটি ধারা নি¤েœ বর্ণিত হলো :
ধারা-১
বন্ধনহীন অবস্থায় এবং সমমর্যাদা ও অধিকারাদি নিয়ে সকল মানুষই জন্মগ্রহণ করে। বুদ্ধি ও বিবেক তাদের অর্পণ করা হয়েছে এবং ভ্রাতৃসুলভ মনোভাব নিয়ে তাদের একে অন্যের প্রতি আচরণ করা উচিত।
ধারা-৩
প্রত্যেকের জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে।
ধারা-৪
কাউকে দাস হিসেবে বা দাসত্বে রাখা চলবে না, সকল প্রকার দাস-প্রথা ও দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধ থাকবে।
ধারা-৭
আইনের কাছে সকলেই সমান এবং কোনরূপ বৈষম্য ব্যতিরেকে সকলেরই আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই ঘোষণাপত্র লঙ্ঘনকারী কোনরূপ বৈষম্য বা এই ধরনের বৈষম্যের কোন উস্কানির বিরুদ্ধে সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার সকলেরই আছে।
ধারা-৯
কাউকে খেয়াল খুশিমত গ্রেফতার, আটক অথবা নির্বাসন করা যাবে না।
ধারা-১০
প্রত্যেকেরই তার অধিকার ও দায়িত্বসমূহ এবং তার বিরুদ্ধে আনীত যে কোন ফৌজদারি অভিযোগ নিরূপণের জন্য পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার-আদালতে ন্যায্যভাবে প্রকাশ্যে শুনানি লাভের অধিকার রয়েছে।
ধারা-১২
কাউকে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়াল-খুশিতে হস্তক্ষেপ অথবা সম্মান ও সুনামের উপর আক্রমণ করা চলবে না।
ধারা-১৫
(ক) প্রত্যেকেরই একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে। (খ) কাউকেই যথেচ্ছভাবে তার জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা অথবা তাকে তার জাতীয়তা পরিবর্তনের অধিকার অস্বীকার করা চলবে না।
ধারা-১৬
ক) পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ ও নারীদের জাতিগত, জাতীয়তা অথবা ধর্মের কারণে কোন সীমাবদ্ধতা ব্যতিরেকে বিবাহ করা ও পরিবার গঠনের অধিকার রয়েছে। বিবাহের ব্যাপারে, বিবাহিত অবস্থায় এবং বিবাহ বিচ্ছেদকালে তাদের সমঅধিকার রয়েছে।
খ) কেবল বিবাহ ইচ্ছুক পাত্র-পাত্রীর অবাধ ও পূর্ণ সম্মতির দ্বারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে।
গ) পরিবার হচ্ছে সমাজের স্বাভাবিক ও মৌলিক একক গোষ্ঠী; সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
ধারা-২৩
ক) প্রত্যেকেরই কাজ করার, অবাধে চাকরি নির্বাচনের, কাজের জন্য ন্যায্য ও অনুকূল অবস্থা লাভের এবং বেকারত্ব থেকে রক্ষিত হবার অধিকার রয়েছে।
খ) প্রত্যেকেরই কোন বৈষম্য ব্যতিরেকে সমান কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
গ) প্রত্যেক কর্মীর তার নিজের ও পরিবারের মানবিক মর্যাদা রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম এমন ন্যায্য ও অনুকূল পারিশ্রমিক এবং প্রয়োজনবোধে সে সঙ্গে সামাজিক সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থাদি সংযোজিত লাভের অধিকার রয়েছে।
ঘ) প্রত্যেকের নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন ও এতে যোগদানের অধিকার রয়েছে।
ধারা-২৪
প্রত্যেকেরই বিশ্রাম ও অবসর বিনোদনের অধিকার রয়েছে। কাজের সময়ের যুক্তিসঙ্গত সীমা ও বেতনসহ নৈমিত্তিক ছুটি এ অধিকার অন্তর্ভুক্ত।
মাননীয় বিশেষ অতিথিবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, আপনাদের মাঝে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। আমার বক্তৃতা আর দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছ নেই। আমি সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আপনাদের সকলের এবং বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। খোদা হাফেজ, ফি আমানিল্লাহ। [সমাপ্ত]
-লেখক : প্রেসিডেন্ট, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ