মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

তিন শহীদের রক্তের ওপর উদযাপিত হয় ভালবাসা দিবস

মোবায়েদুর রহমান : [দুই]
প্রকাশ্যে হোক আর গুনগুন করে হোক, এই সব তরুন তরুনীদের কাছে রবীন্দ্রনাথের একটি গান অন্তত ভ্যালেন্টাইন্স ডে বা ভালবাসা দিবসের জন্য  অসাধারণ জনপ্রিয়, আকর্ষণীয় এবং যথাযথ বলে বিবেচিত হবে। গান টি হলোÑ
উড়াব ঊর্ধ্বে প্রেমের নিশান
দুর্গম পথ মাঝে
দুর্দম বেগে দুঃসহতম কাজে।
রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব-
চাই না শান্তি, স্বান্তনা নাহি চাব।
পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি
ছিন্ন পালের কাছি,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব
তুমি আছ আমি আছি।
দুজনের চোখে দেখেছি জগৎ,
দোঁহারে দেখেছি দোঁহে-
মরু পথ তাপ দুজনে নিয়েছি সহে।
ছুটি নি মোহন মরীচিকা - পিছে- পিছে,
 (গীত বিতান পৃষ্ঠা-২০৩, পল্লব সংস্করণ ১৯৯৩)
একে তো প্রেম, তার ওপর আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে বা ভালবাসা দিবস। সুতরাং তারা হবে উদ্দাম। তারা করবে উদ্বাহু নৃত্য। যৌবন জোয়ারে তারা তাদেরকে ভাসিয়ে দেবে আর সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠবে,
ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো
আমার মুখের আঁচলখানি।
ঢাকা থাকে না হয় গো,
তারে রাখতে নারি টানি॥
আমার রইল না লাজলজ্জা,
আমার ঘুচল গো সাজসজ্জা-
তুমি দেখলে আমারে
এমন প্রলয়- মাঝে আনি
আমায় এমন মরণ হানি॥
(গীত বিতান পৃষ্ঠা-২৮০, পল্লব সংস্করণ ১৯৯৩)
বাহারী জামা কাপড় পড়ে প্রতিবছর ১৪ই ফেব্রুয়ারি অসংখ্য তরুণ তরুণী রাস্তায় নেমে আসছে। কপোত কপোতী মিলিত হচ্ছে, গান গাচ্ছে। সেটি উচ্চস্বরে হোক বা অনুক্ত হোক। ওদের সুরে ভাষা পেয়েছে এবং মনের বীনায় সংগোপনে ঝংকৃত হয়েছে অমর কন্ঠশিল্পী মোহাম্মদ রফির ভরাট কন্ঠের সেই গান।
জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ
হায় মোহাব্বত জিন্দাবাদ
তথা কথিত ভালবাসা দিবসে যেসব তরুণ তরুণী কলকলিয়ে ওঠে তারা কারা? ঘর পালিয়ে বাইরে যারা প্রেম করে তারা কারা? পরিচিত জনের চোখের আড়ালে যারা প্রেম করে তারা কারা? এরা তারাই, যারা কোনো সহজ সরল সমাজ স্বীকৃত বন্ধনে আবদ্ধ নেই। ফিরে যাচ্ছি ১৯৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র একটি অনুষ্ঠান। আজব একটি নাম,‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। বাংলা করা হয়েছে ভালবাসা দিবস। ঐদিন ঐ দিবসটি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত পেলো। চুটিয়ে প্রেম করার অধিকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো। ঐদিন ভ্যালেন্টাইন্স ডের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে হাজির ছিলেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আজ তিনি যোগাযোগ মন্ত্রী। ভ্যালেন্টাইন্স দিবসকে যদি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দেয়া হয় তা হলে সরকারের একজন মন্ত্রী ভালবাসা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হন কিভাবে? আর যদি বা হলেনই, তাহলে ভ্যালেন্টাইন্স দিবসের মাহাত্ম বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন এবং মনিকা লিওনস্কির অবৈধ প্রেমের জয়গান গাইলেন কিভাবে?
১৪ই ফেব্রুয়ারি : রক্ত ঝরার দিন
এই ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবসের ঝান্ডা উড্ডীন হয়েছে এক রক্তাক্ত হৃদয় বিদারক দিবসের ওপর পাঁড়া দিয়ে। তখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল এরশাদ। ১ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ তিনি বিএনপি সরকারের প্রধান প্রেসিডেন্ট জাস্টিস আব্দুস সাত্তারের নিকট থেকে সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে গান পয়েন্টে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক শাসনের অবসান ও শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে তুমুল ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৮৩ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অগ্নি ঝরা দিন। ১৯৮৩ সালের এই দিনে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সূচিত হয়েছিল প্রথম বড় ধরনের আন্দোলন, যা মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। সেই থেকে দিনটি স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে নানান আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে । কিন্তু ৯২-এর পর থেকে এই শফিক রহমানদের ‘ভ্যালেন্টাইন্স’ প্রোপাগান্ডার প্রভাবে নতুন প্রজন্মের চেতনায় দিবসটি নাড়া দিতে পারছে না। পশ্চিম থেকে আগত এই বিকৃত মানসিকতায় ভেসে যাচ্ছে রক্তের অক্ষরে লেখা এক গৌরবময় সংগ্রামের ঐতিহাসিক দিন। দিনটি এখন পরিণত হয়েছে ভালোবাসা দিবসের নামে বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির দিন হিসেবে। নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারছে না, ফাগুনের এই আগুন ঝরা দিনের সঙ্গে মিশে আছে ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শহীদ জাফর, জয়নাল ও দিপালী সাহার লাল টকটকে রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার কাহিনী। এই ৩ তরুণ তরুণী তাদের জীবন দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে (এরশাদ) প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। রক্তের অক্ষরে যারা আমাদের গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ের সূচনা করেন, ভ্যালেন্টইনের নেশায় তাদের জন্য অবহেলা ছাড়া আমরা কিছুই দিতে পারিনি। ১৯৮৩ সালের এই দিন মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলীতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন ছাত্র। এই ছাত্র হত্যার পর সামরিক সরকার নিন্মোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
(১) সভা, শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও ধর্মঘট নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
(২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত এবং মেট্রোপলিটন ঢাকার অবশিষ্ট এলাকায় রাত্রি ১০টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। ১৫ ই ফেব্রুয়ারি সচিবালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয়। সামরিক আইন ভঙ্গ করে তারা একটি শোভাযাত্রা বের করে। এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ধ্বনি দিতে দিতে তারা একযোগে সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পুলিশ কার্জন হল সংযোগ স্থলে বাধা দেয়। বাধা পেয়ে ছাত্ররা পুলিশের প্রতি ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য হোস পাইপের সাহায্যে পানি নিক্ষেপ করে। সেটি ব্যর্থ হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।’... (দৈনিক ইত্তেফাক : ১৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ১৯৮৩)
১৭০০ বছর আগে বনাম
১০ বছর আগে
ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালনের ইতিহাস ১৭৪৭ বছর আগেকার। এতোদিন আগের কথা ইতিহাসে পড়ে শফিক রেহমান এই দিবসটি বাংলাদেশে চালু করার জন্য গলদঘর্ম হয়েছেন। এবং ১৯৯৩ সালে এই দিবসটির পক্ষে প্রচার শুরু করেছেন। অথচ এর মাত্র ১০ বছর আগে ১৯৮৩ সালের একই দিন অর্থাৎ ১৪ ই ফেব্রুয়ারি এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেমে যে ৩ টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল সে কথা বিলাত ফেরত শফিক রহমান বেমালুম ভুলে গেলেন? আর যাবেন না কেন? তিনি তো তার ইংরেজী এবং বিলেতী কায়দায় রপ্ত। দেশে ফিরে তিনি তার মস্তিষ্ক জাত কালচার থেকে ভ্যালেন্টাইন্স উগরিয়ে দেন। স্বৈরাচারের সহায়তায় সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিনে’ প্রেমের বন্যা ছুটিয়ে দেন। তারই বিষময় পরিণতিতে আজ সমাজ দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে পরকীয়া, অজাচার ও ভ্রষ্টাচারের বিষ বাষ্প। [সমাপ্ত]
Email: journalist15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ