বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার। উনিশশ’ বায়ান্ন সালের এই দিনেও ছাত্র-জনতার কর্মসূচি অব্যাহত ছিলো। ভাষা-আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিলো আমাদের আত্মপরিচয়ের আন্দোলন। সঙ্গত কারণেই সে আন্দোলনে এ জনপদের প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ততা পরিলক্ষিত হয়। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বদানকারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক নানা কর্মসূচির পাশাপাশি সঙ্গীত শিল্পীদের ভূমিকাও ছিলো উল্লেখ করার মতো। উদ্দীপক গানের কলিতে কেবল হৃদয়িক ঝংকারই সৃষ্টি হয়নি, আন্দোলনকারীদের চলার পথকে করেছে সাবলীল ও গতিময়। মূলত গণসঙ্গীত শিল্পী-গীতিকাররাই এর নেপথ্য নায়ক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের আগে ও পরে পঁচিশ বছর তারা নির্মোহভাবে প্রাণ সঞ্চারিত করেছেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থেকে।
বলা যায়, উনিশশ’ সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গণসঙ্গীতে নতুন জমিন তৈরি হয় বাংলাদেশে। পাকিস্তানী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াবার জন্য দ্রুত গণসঙ্গীতের সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। ১৯৫০ সালেই গড়ে ওঠে ‘ধূমকেতু শিল্পী সংঘ’। এর সংগঠক-পরিচালক ছিলেন শিল্পী নিজামুল হক, মোমিনুল হক এবং তখনকার প্রখ্যাত ছাত্রনেতা গাজিউল হক। ধূমকেতু শিল্পী সংঘ প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শিল্পী সংসদ’। এ সময় ঢাকার বাইরেও নতুন দল গড়ে ওঠে। আব্দুল লতিফ-ভাষা আন্দোলনের এক সরব সংগ্রামী ও খ্যাতিমান শিল্পী। ভাষা আন্দোলন আবদুল লতিফের লেখনীকে ক্ষুরধার করে তুলল, তার কণ্ঠকে করে তুলল উদাত্ত। মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তিনি জ্বালাময়ী ভাষায় লিখলেন সেই গান যে গান শুনে জনগণের শিরা-উপশিরায় রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল। গানে সুরারোপ করলেন শিল্পী নিজে। তারপর গান গেয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে নেমে পড়লেন-“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়- এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়?” এই গানটি কত শতবার গীত হয়েছে তার হিসেব নেই। এই একটি গানের জন্য শিল্পী অমর হবেন বলে ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের ভবিষ্যদ্বাণী আজ সত্য। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রশংসা করে তার লেখা একটি গান এমন ‘আমার দেশের ছাত্র-ছাত্রীর নাই তুলনা নাই/ওরা বছর বছর মরছে বলে/আমরা বেঁচে যাই/ওরা বাংলা ভাষার মান রাখিতে/কইরাছে লড়াই/সেদিন ওরা রাইখ্যাছিল/বাঙালিদের মান/তাই বাংলা ভাষা বিশ্ব সভায়/পাইল রে সম্মান’। আরও একটি জনপ্রিয় গান-‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলিরে বাঙাল/... তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’। ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে এই গানটি খুলনায় ব্যাপক গীত হয়। পরে ঢাকায় প্রচার করেন বিশিষ্ট গীতিকার-সুরকার আলতাফ মাহমুদ। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের আরেক শিল্পী সুখেন্দু চক্রবর্তী ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা অনেক গান গেয়েছেন এবং তার নিজের লেখা গানও ছিলো। এক অখ্যাত বয়াতির কাছেও ভাষা আন্দোলনের গান শুনেছেন তিনি। সে গান ‘ছাড়ব না প্রাণ থাকিতে দুনিয়াতে/ বাংলা বলে প্রাণ যদি যায়’।
১৯৫৩ সালে মহান একুশের প্রথম গান লিখেছিলেন ভাষা সৈনিক আ ন ম গাজীউল হক। সে গানের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ যেন বুলেট। গানের বুলেট উপহার দিয়ে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে উদ্দীপিত করতে লিখলেন-“ভুলব না, ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারি, ভুলব না,/লাঠি, গুলি আর টিয়ার গ্যাস, মিলিটারী আর মিলিটারী/ভুলব না।/‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এ দাবিতে ধর্মঘট,/বরকত সালামের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ/ভুলব না....।” গাজীউল হকের এ গানটির পর আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো/একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি চিরায়িত, স্মরণীয়। গাফফার চৌধুরীর গানটিতে আব্দুল লতিফ ও আলতাফ মাহমুদ দু’জনে সুরারোপ করলেও আলতাফ মাহমুদের সুরে গাওয়া গানটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর বদরুল হাসানের লেখা গান ‘ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙ্গাতে/ ঘুমিয়ে গেল যারা’।
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল রমেশ শীল। কবিয়ালের ভাষায় তিনি বাংলা ভাষার গান রচনা করে এবং গেয়ে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগালেন গ্রামে-নগরে-বন্দরে। তার জাগরণী গানে বাংলা ভাষার প্রতি পল্লী জনগণও সচেতন হয়ে উঠল। তাদের কণ্ঠেও অনুরণন তুলল কবিয়াল রমেশ শীলের গান। গানের রচয়িতা, সুরকার ও শিল্পী তিনি নিজে এবং তার দল। তিনি মূল গান গেয়ে মুখে এলে ধুয়া ধরেন তার দলের দোহাররা। একুশে ফেব্রুয়রিকে স্মরণ করে তিনি লিখলেন অনেক গান। সেসব গান গেয়ে উজ্জীবনী বাণী শোনালেন দেশের মানুষকে। ভাষার জন্য প্রাণ বলি দিয়ে যারা অমর হয়ে রইলেন তাদের কথা বললেন তার লেখা ‘ভাষার জন্য জীবন হারালি’ গানে-“ভাষার জন্য জীবন হারালি,/বাঙালি ভাইরে, রমনার মাটি রক্তে ভাসালি;/(বাঙালি ভাইরে) বাঙালিদের বাংলা ভাষা জীবনে মরণে/মুখের ভাষা না থাকিলে জীবন রাখি কেনে।”
১৯৪৮-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের প্রথম পর্ব থেকে ভাষার গান রচনা শুরু হয়। সর্বপ্রথম গানটি রচনা করেন কবি ও গীতিকার অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী। এতে সুরারোপ করেন প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী শেখ লুৎফর রহমান। গানটির একাংশ এমন: ‘শোনেন হুজুররা/ বাঘের জাত এই বাঙালেরা/ জান দিতে ডরায় না তারা,/ তাদের দাবি বাংলা ভাষা/ আদায় করে নেবে তাই’। তিনি পরবর্তীকালে আরও গান রচনা করেন। যার পটভূমি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। দুটি গানের কয়েকটি চরণ: ১. ‘বাংলার বুকের রক্তে রাঙানো আটই ফাল্গুন/ ভুলতে কি পারি শিমুলে পলাশে হেরি লালে লাল খুন’, ২. ‘বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা যখন একই নামের সুতোয় বাঁধা’।
বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গান রচনায় ব্যাপৃত হয়েছিলেন দেশের কবি ও গীতিকাররা। তাদের রচনার সম্ভারে বাংলা ভাষার গান সাহিত্য ভুবনে পৃথক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। তাদের গানের মধ্যে চিরজীবী হয়ে রইলেন ভাষার জন্য শহীদেরা এবং অমর হয়ে রইল তাদের জীবন বলিদান। ভাষার গান রচয়িতার মধ্যে আরো রয়েছেন জসীমউদদীন, আল মাহমুদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফজল-এ-খোদা, সৈয়দ শামসুল হুদা, আলিমুজ্জামান চৌধুরী, আনিসুল হক চৌধুরী, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, তোফাজ্জল হোসেন, নাজিম মাহমুদ, সত্যেন সেন, ফজলে আজিম, জাহেদুর রহমান, শেখ লুৎফর রহমান, নিজামুল হক, কে জি মোস্তফা, নরেন বিশ্বাস প্রমুখ।
ভাষা-আন্দোলন শুধু রাজধানী বা দেশের প্রধান প্রধান শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। অমর একুশে মর্মান্তিক ঘটনা দেশের প্রধান প্রধান কবি ও গীতিকারদের যেভাবে আলোড়িত করেছিল, একইভাবে আলোড়িত করেছিল দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আউল-বাউল, স্বভাবকবি, গ্রামীণ বয়াতি ও কবিয়ালদের। শামসুদ্দিন আহমদ, রমেশ শীল, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, শাহ আবদুল করিম, মহিন শাহ, আবদুল হালিম বয়াতি, মাতু মিয়া, কবিয়াল ফণী বড়ুয়া প্রমুখের রচনা একুশের গানকে ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেছে। তারা শুধু গান রচনা করেই থেমে থাকেননি, গ্রামেগঞ্জে, হাট-বাজারে গেয়ে বেড়িয়েছেন। একুশের গান গাওয়ার জন্য তাদের অনেকেই নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাদের রচিত আরো কয়েকটি গান : ১.‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি/ তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি।’ (শামসুদ্দিন আহমদ) ২. ‘বাংলা আমার মায়ের ভাষা এমন ভাষা আর যে নাই/ এ ভাষাতে মা-কে ডাকি ডেকেছে মোর সালাম ভাই।’ (মোহাম্মদ মাতু মিয়া) ৩. সালাম আমার শহীদ স্মরণে/ দেশের দাবি নিয়া দেশপ্রেমে মজিয়া/ প্রাণ দিলেন যেসব বীর সন্তানে’ (শাহ আবদুল করিম) ৪. ‘বাংলাদেশের মানুষ, ফেব্রুয়ারি একুশে ভুলিতে পারবে না জীবনে/ ভাষা আন্দোলনের জন্য জনসমাজ হল বিপন্ন কুখ্যাত সরকারের শাসনে।’ (বিজয় সরকার) ৫. ‘শোন দেশের ভাই-ভগিনী/ শোন আচানক কাহিনী/ কান্দে বাংলা জননী ঢাকার শহরে’ (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) ৬. ‘কাইন্দ না মা কাইন্দ না আর বঙ্গজননী/ তুমি যে বীর প্রসবিনী গো তুমি শহীদ জননী।’ (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) ৭. ‘বাঙালিদের বাংলা ভাষার রাখি ইজ্জত মান/ হাসিমুখে সফিক বরকত করে জীবন দান।’ (ফণী বড়ুয়া) ৮. ‘এদিক-ওদিক বলতে আমার অনেক হবে দেরি/ মন দিয়া শোনেন ভাষা আন্দোলনের জারি...’ (আবদুল হালিম বয়াতি)।
একুশের প্রথম তিনটি সংকলনে প্রমথ নন্দী সম্পাদিত ওরা প্রাণ দিল (সেপ্টেম্বর ১৯৫২), হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী (মার্চ ১৯৫৩) এবং ডি এ রশীদ ও মহিউদ্দীন আহমদ সম্পাদিত একুশের সংকলন (১৯৫৬) একুশের গানের স্বল্পতা বিস্মিতকর। কারণ, সংকলনগুলো প্রকাশকালের মধ্যেই একুশের বিখ্যাত বেশ কয়েকটি গান রচিত হয়েছিল। প্রথম সংকলনটিতে দুটি, দ্বিতীয়টির প্রথম মুদ্রণে দুটি ও তৃতীয়টিতে মাত্র একটি গান সংকলিত হয়েছে। হাসান হাফিজুর রহমানের একুশে ফেব্রুয়ারীর দ্বিতীয় সংস্করণে জসীমউদ্দীন ও আবদুল লতিফের একটি করে ও তৃতীয় সংস্করণে ইন্দু সাহার একটি গান যুক্ত হয়। এ ধারাটি একুশে ফেব্রুয়ারির চতুর্থ সংস্করণে আর অব্যাহত থাকেনি।
অমর একুশের প্রায় সাড়ে ছয় দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও আজ অবধি একুশের গানের উল্লেখযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য কোনো সংকলন প্রকাশিত হয়নি। যার ফলে একুশের গানের অধিকাংশই রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে-পত্রপত্রিকা ও সংকলনের পাতায়। গানগুলো সংগ্রহের বিষয়ে উদ্যোগী না হলে অনেক গানই হারিয়ে যাবে কালের অতলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ