শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনের ফাঁসি একজনের কারাদণ্ড

রূপা হত্যামামলার দুই আসামীকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা : টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ঢাকা আইডিয়াল ‘ল’ কলেজের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনের ফাঁসি অপর একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক ভারপ্রাপ্ত প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়া এ রায় দেন।
পাঁচ আসামীর মধ্যে ছোঁয়া পরিবহনের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫), জাহাঙ্গীর (১৯), চালক হাবিবুর (৪৫) কে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। অপর আসামী ওই পরিবহনের সুপারভাইজার সফর আলী (৫৫) কে সাত বছরের কারাদ-ের আদেশ দেন আদালত। সেই সাথে সফর আলীকে এক লক্ষ টাকা অর্থদ- দেয়া হয়। জরিমানার অর্থ নিহত রূপার পরিবারকে দেয়ারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এদিকে অপরাধ সংঘটনের কাজে ব্যবহৃত ছোঁয়া পরিবহন (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৩৯৬৩) বাসটি ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহতের পরিবারকে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আসামী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীগণের আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া রায়ের এ দিন ধার্য করেছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট নাছিমুল আক্তার নাসিম। তার সহায়তায় ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী এস আকবর খান, মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট এমএ করিম মিয়া ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী এডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ ও এস আকবর খান জানান, মাত্র ১৪ কর্মদিবসে এই মামলার রায় একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এতো অল্প সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের মামলার রায় ইতপূর্বে লক্ষ্য করিনি। যারা ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতায় লিপ্ত তারা এই রায় থেকে শিক্ষা নিবে। এ রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আসামীপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী এডভোকেট শামীম চৌধুরী দয়াল ও এডভোকেট দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যেসব সাক্ষ্য প্রমাণ উত্থাপন করেছে সেখানে দোষী প্রমাণ হয়নি। রূপা ধর্ষণের যে আলামত রাষ্ট্রপক্ষ সংগ্রহ করেছে সেখানেও রূপা ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি। এতে আসামীরা বিজ্ঞ আদালতে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা এ রায়ে উচ্চ আদালতে ন্যায্য বিচারের দাবিতে আপিল করবো।
রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায়ে চারজনের ফাঁসি ও একজনের সাত বছরের কারাদ- হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত ধর্ষিতা রূপার স্বজনরা।
নিহত রূপার ভাই হাফিজুর রহমান এতো অল্প সময়ে রূপা হত্যার বিচার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, রূপাকে হত্যার সুবিচার পেয়েছি। আমরা আর কোন রূপাকে হারাতে চাই না। এ রায়ের মধ্যে দিয়ে দেশে নারী জাতি এখন নিজ নিজ গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছানোর সাহস পাবে। তবে  এ রায় দ্রুত কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গতবছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে জাকিয়া সুলতানা রূপাকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করে পরিবহন শ্রমিকরা। তারা বাসেই তাকে হত্যার পর মধুপুর উপজেলায় পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে রূপার মরদেহ ফেলে রেখে যায়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে রূপার মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে।
পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে তার ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় গিয়ে ছবির ভিত্তিতে তাকে সনাক্ত করেন। গত ১৫ অক্টোবর এ মমলার তদন্তকারী কর্মকর্তা টাঙ্গাইল বিচারিক হাকিম আদালতে ৫ আসামীর বিরূদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্র দাখিলের পর দিন ১৬ অক্টোবর মামলাটি বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বদলি করা হয়। গত ২৫ অক্টোবর আদালত এ অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
২৮ আগস্ট এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ময়মনসিংহ-বগুড়া সড়কের ছোঁয়া পরিবহনের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫), জাহাঙ্গীর (১৯), চালক হাবিবুর (৪৫) ও সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা প্রত্যেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। মামলার আসামীরা প্রত্যেকেই এখন টাঙ্গাইল কারাগারে রয়েছে বলে জানা গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ