সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

পনের বছর

জাহাঙ্গীর আলম অরণ্য : যে স্থানগুলোয় মোটা মোটা চিমনি দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কালো ধোঁয়ার ফিনকি ছুটে আকাশের অনেকখানি জায়গা সব সময় বিবর্ণ করে রাখে, আর প্রশস্ত নর্দমা দিয়ে ঝাঁঝালো দুর্গন্ধের বিষাক্ত ময়লা পানি নদীর দিকে ছুটে; সেই স্থানগুলোতে আবিদ সাহেবের মর্মের ভেতর থেকে মস্ত একখানা জাল ছড়িয়ে সূক্ষ¥ভাবে জড়িয়ে যায়। জালের গোছাটা মস্তিস্কের সাথে লটকে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ¯œায়ুর সব অলিগলির সব কোষ ধীরে ধীরে যখন ছন্দ হারিয়ে ফেলে; জালের গোছাটা তখন আলগা হয়ে আসে। নিঃশ্বাসের সাথে একটা বায়বীয় দমক বেরিয়ে আসে, ‘আর কোটি চারেক টাকা হলেই হতো!’

তারপর পা দুখানি ভাড়া বাসার দিকে গতি নিতে থাকে। আলগা জালটা শত-সহস্্র্রগুণে প্রসারিত হয়ে হালকাভাবে ছড়িয়ে পড়ে এলাকাময়। জালের শেষ প্রান্তে আবির্ভাব হয় মোঘল বাদশাহদের স্বর্ণখচিত রাজপ্রাসাদের সমতুল্য আবিদপ্রাসাদের নিজস্ব নকশা।

আবিদ সাহেব কর্মজীবনের শুরুতে যে ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন, বিশ বছর পরে বেশ মোটাসোটা হয়ে এখন সেটা অস্বাভাবিক গতিতে হাঁস-ফাঁস করছে। তার উদরে আরো চাই, আরো চাই, আরো চাই। হোক সেটা সোজা পথে, হোক সেটা ঘুরপ্যাঁচ পথে অথবা অন্ধকারের চাদরের নিচ হয়ে; তবেই সে বড়দের কাতারে মাথাটা গলিয়ে দিতে পারে।

আবিদ সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরান। লিকলিকে ধোঁয়া উড়তে উড়তে আর ছাই ঝরতে ঝরতে সিগারেট ছোট হয়ে আসে। ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছানোর খেয়াল থাকে না। বি. কম পাশ করে একটা কোম্পানির মার্কেটিং সেকশনে চাকরি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন আবিদ সাহেব। লঘু দোষে গুরুতরভাবে একদিন ঝেড়েছিলেন বস; প্রতিশোধস্বরূপ নাগালের সব টাকা নিয়ে কেটে পড়েছিলেন আবিদ সাহেব। এরপর ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরে বাপের কিছু টাকা, শ্বশুরের দেওয়া কিছু টাকা এবং আরো পরে ব্যাংক ঋণের টাকা নিয়ে ব্যবসায় গতি আনেন। সেদিনের অবৈধ প্রাথমিক মূলধন আবিদ সাহেবের আত্মায় বহুদিন ধরে হাতুরি-পেটা করেছিলো। কিন্তু বিপরীতমুখি জাতীয় মন্দ-বাতাসের প্রতি-আক্রমণে ধীরে ধীরে হাতুড়ির আঘাত সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে এবং একপর্যায়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন পুরো দেশটা মানিব্যাগের মধ্যে পুরলেও কোনও বাধা আত্মার আশেপাশেও ঘেঁষতে পারে না। মস্তিষ্কের চারদিকটা তার এখন সপ্নিল ধনতন্ত্রের দুর্ভেদ্য দেয়ালে ঘেরা।

মসজিদের ইমামের একটি বয়ান একবার তার কানে ভালোভাবেই বেজে উঠেছিলো, ‘এক জীবনে কতো টাকা লাগে!’ 

‘হ্যাঁ, তাই তো! এতো টাকা দিয়ে কী হয়!’ সারাজীবন শুধু অর্থ-শ্রমিক হয়ে আর অর্থের পাহারাদার সেজে অর্থের গোলাম হয়ে যাওয়া। কিন্তু ভোগে লাগে যৎসামান্যই। 

কিন্তু টাকার রূপালি অস্তিত্ব যখন চোখের সামনে ডানা মেলে পাক খেয়ে খেয়ে উড়ে, মসজিদ-মন্দির তখন সেই ডানার আড়ালে ঝাপসা হয়ে যায়। আত্মার সর্বশেষ নিয়ন্ত্রক মন তখন হাঁক দেয়, ‘টাকাই জীবনের একমাত্র সার্থকতা। মদ আর নারীও টাকার সামনে ঝাপসা। কারণ,  টাকা দিয়ে পৃথিবীর সব ধরনের সুখ কেনা যায়; মর্যাদা, প্রতিপত্তি, আরাম-আয়েশ, নেতৃত্ব, মানুষ, ভালোবাসা, বাড়ি, গাড়ি, নারী এমনকি নারীর মন।’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো নেশাখোর সে, যে টাকার নেশায় আসক্ত। এই নেশা একবার পেয়ে বসলে এখান থেকে আর বের হওয়া যায় না।

নিজেকে বিশিষ্টজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আবিদ সাহেবের প্রচেষ্টার অন্ত নেই।  প্রতিষ্ঠিত হতে হলে মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে হয়। সব সময় নিজেকে ফিট রাখতে হয়। আর তাই তো তিনি একদিন পরপর আরাম করে সেলুনে বসেন; দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করেন, চুলের স্টাইল ঠিক রাখেন।

ব্যবসায়িক সমিতির সদস্য হওয়ায় মাঝেমধ্যে সভায় অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক আইডিয়া নিয়ে আলোচনা হয় সেখানে। অপেক্ষাকৃত তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আহ্বান থাকে। আবিদ সাহেব তরুণদের দলেও নিজেকে ভাবেন। এখনও যে তার অনেক পথ হাঁটার বাকি।

এই পথচলাতেই তার আনন্দ। অন্যের সাধারণ কাজ করতেও ক্লান্তি অনুভূত হয়। কিন্তু নিজের জটিল সব কাজেও ধৈর্যচ্যুতি হয় না। আর এই চলতে চলতেই তার দিন কেটে যায় নেশার ঘোরে।

আজকাল দু-একটা অসুস্থ সাদা চুল হঠাৎ হঠাৎই বেশ নির্লজ্জভাবেই সতেজ চুলের পাড়ায় আত্মপ্রকাশ করছে। আবিদ সাহেব কঠোর হাতে এদের দমন করেন। কোনো চুলে পাক ধরলেই বড়ো মেয়ে পিংকিকে দিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলেন। বাপের চুল ছিঁড়তে মেয়ের কোনোই ধৈর্যচ্যুতি হয় না। কিন্তু গোটাকয়েক চুল তোলার পর বলে, ‘বাবা আর কতো চুল তুলবো, অনেক চুলই তো পেকে গেছে! বাবা তুমি তো বুড়ো হয়ে গেছো!’

আবিদ সাহেব হাসেন, ‘শোনো মেয়ের কথা, অল্প-স্বল্প চুল পাকা ধর্তব্যের কোনো বিষয় নাকি! স্কুল-কলেজের ছেলেদের চুলও তো পাকে, যাকে বলে ইচড়ে পাকা; বয়সের বাচবিচার নেই, কার মাথা তার ঠিক-ঠিকানা নেই; চাইলো আর পেকে উঠলো। এর সাথে বুড়ো হবার কী সম্পর্ক! সেদিনের ছোকরা আমি! এই তো সেদিনও হাফপ্যান্ট খুলে চাচাতো ভাইদের সাথে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছি!’

পিংকি মুখ টিপে হাসে, ‘সেদিন আর এদিন; জীবনটা এতোটুকুই বাবা। আশি-নব্বই বছর বাঁচে ভাগ্যবানরা। তবে মানুষ যতোদিনই বাঁচুক, সত্তর বছরের পরের বাঁচাটা জীবন নয়; অর্থহীন প্রাণধারণ শুধু। এ বয়সটাই হলো মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। অতএব জীবনকালের সময়টা কিন্তু বড়োই অল্প।’

মেয়ের নাক টেনে ধরে বাবা বলেন, ‘মেয়ে তো দেখছি আমার মা হয়ে গেছে, এবার বিয়েটা তাহলে সত্যি সত্যি দিয়েই ফেলি!’

হ্যাঁ, এ পর্যন্ত বিয়ের কয়েকটা প্রস্তাবের মধ্যে একটা প্রস্তাব বেশ ঘটা করেই এসেছিলো। প্রস্তাবটা এনেছিলো পিংকির মা জোহরার ছোট বোনের ছোট ননদীর ছোট খালা শ্বাশুড়ি। আবিদ সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন এই হাফ-বুড়িটার দিকে, ‘কত্তোবড়ো আক্কেল এই হাফ-বুড়ির! এইটুকু বাচ্চা মেয়ে আমার। সবে ইউনিভার্সিটিতে পা দিলো। সেদিনও যাকে হাত ধরে স্কুলে দিয়ে এলাম। ছেলের অঢেল সম্পদ; তাতে কী! ইন্ডাস্ট্রিটা ভালোভাবে একবার দাঁড় করাতে পারলে রাজপুত্ররা আসবে আমার মেয়েদের জন্য।’

তবে হ্যাঁ, মেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হওয়ার আগেই ধারাবাহিক নতুন এ স্বপ্নের একদম কেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে। গত দুবছরে তার সম্পদের পরিমাণ বেড়ে গেছে হু হু করে। তাই কর অফিস আবার ঝামেলা শুরু করেছে। উপরি দিয়ে অবশ্য কর অফিসের দৌরাত্ম্য কমানো গেছে। আর এ ঝামেলায় গত কদিন ধরে তাকে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। 

তিন দিনের একটানা ব্যস্ততার পর আজ আবিদ সাহেব বাইরে আর বেরুলেন না। ক্লান্তির শিথিলতায় শরীরটা তার অবসন্ন। দাড়ি সেভ করা দরকার। কিন্তু বাইরের কড়া রোদে ক্লান্ত শরীরটাকে ঘামে সিদ্ধ করে অতোদূরের সেলুনে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। তারচেয়ে বরং কাজটা নিজে করাই ভালো।

আবিদ সাহেব আঙুলে ক্রিম নিয়ে মুখের দুইপাশে লেপ্টে দিলেন। বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা ব্রাশের পোঁচ দিবেন কিন্তু হাতটা হঠাৎ করেই হাত থেমে গেলো, ‘এ কী! দাড়ি কেনো সাদা! পা..ক ধরেছে...!’

হাত থেকে ব্রাশটা খসে পড়ে গেলো। চলন্ত ট্রাকের চাকা পাঙ্ক্চার হওয়ার মতো বোধশক্তিটা হঠাৎ ধসে গেলো। দৃষ্টি হয়ে এলো ঝাপসা। আবিদ সাহেব বোধহীন পায়ে কয়েক পা হেঁটে শরীরটাকে বিছানায় ছেড়ে দিলেন।

মিনিট দুয়েক পরে জোহরা এসে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন, ‘মুখে ক্রিম লাগিয়ে শুয়ে পড়লে যে! শরীর বেশি খারাপ করছে!’

আবিদ সাহেব মুখ খুললেন খানিকটা সময় পরে, ‘আমার বয়স কতো চলছে?’  

‘এটা আবার কেমন প্রশ্ন হলো! গেলো মাসের এক তারিখে তোমার পঞ্চান্নতম জন্মদিন পালন করলাম, মনে নেই!’

‘সত্তর হতে আর কতো বাকি?’

‘কেনো, পনেরো!’

পনেরো শব্দটা ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো ছটফট করতে করতে ঘরের প্রতিটি কোণায় কোণায় ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুললো। অন্তরের কাঁপন শরীরকে কাঁপিয়ে তুললো। শরীরের কাঁপনে শুকনো খড়ের খসখসানির শব্দে আবিদ সাহেবের মুখ থেকে বিক্ষিপ্তভাবে বেরিয়ে পড়লো, ‘আর মাত্র পনেরো বছর!’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ