শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

প্রযুক্তির ব্যবহারে শঙ্কায় আবিস্কারক ও ব্যবহারকারী

জাফর ইকবাল : প্রযুক্তির উৎকর্ষতা একদিকে যেমন আমাদের সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিতে বেশী আসক্তির কারণে আমাদের বড় ধরণের সমস্যাতেও পড়তে হচ্ছে। অনেক পরিবারেই দেখা যায় যে বড়দের তুলনায় বাচ্চারাই বাবা-মায়ের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহার করছে এমনকি এতে তারা অভিভাবকদের চেয়ে বেশি পারদর্শিতাও অর্জন করে ফেলেছে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এটা রীতিমতো আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিশুরা বাবা-মায়ের ফোন নিয়ে এতবেশি সময় কাটাচ্ছে যে, অনেক অভিভাবকই এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এখন বড় বিনিয়োগকারীরা আইফোন-নির্মাতা এ্যাপলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন- তারা যেন এমন সফটওয়্যার তৈরি করেন, যা বাচ্চারা কতক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারবে তা সীমিত করে দেবে। এমন দুটি বিনিযয়োগ কোম্পানি এই আহ্বান জানিয়েছে যারা এ্যাপলের ২ বিলিয়ন ডলারের শেয়ারের মালিক। জানা পার্টনার্স এবং ক্যালিফোর্নিয়া টিচার্স পেনশন ফান্ড নামে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ্যাপলকে এক ডিজিটাল লক চালু করার আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার যে প্রভাব ফেলছে- তা এ্যাপলকে বিবেচনা করতে হবে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে এ্যাপল যদি এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের ব্যাপারে কিছু না করে তাহলে তাদের সুনাম এবং স্টক মার্কেটে তাদের মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্প্রতি রয়টার্সের একটি রিপোর্টে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক টিনএজার মনে করে যে তাদের মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়ে গেছে। তারা বোধ করে যে তাদের কোন মেসেজ এলে সঙ্গে সঙ্গেই তার জবাব দিতে হবে। যে শিক্ষাবিদরা বাচ্চাদের প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন- তারা একে স্বাগত জানিয়েছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন বলেন, এই আহ্বান শুনে তিনি খুশি হয়েছেন। এ্যাপল এবং অন্য প্রস্তুতকারকদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান যেন স্মার্টফোনে বাচ্চাদের দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পর বিরতি দেয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য তিনি স্মার্টফোনের ব্যাপারে ‘নেশা’ কথাটির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি তোলেন। ‘স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকার ব্যাপারটা ঠিক কিন্তু একে নেশা বলা যায় না’- বলেন তিনি। এ্যাপল এ ব্যাপারে এখনও কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ঘণ্টা ধরে নিজের স্মার্টফোনে ভিডিও গেম খেলার পর আংশিকভাবে অন্ধ হয়ে গিয়েছেন ২১ বছর বয়সী এক চীনা নারী। চীনা দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাম প্রকাশ না করা ওই নারী একজন গেম আসক্ত। তিনি মাল্টিপ্লেয়ার অনলাইন গেম ‘অনার অফ কিংস’ খেলছিলেন। হঠাৎ তিনি তার ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার রেটিনাল আর্টারি অক্লুসান (আরএও) ধরা পড়ে, এটি হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যা সাধারণত বয়স্কদের হয়ে থাকে আর কমবয়সীদের মাঝে খুব কমই দেখা যায়, বলা হয়েছে আইএএনএসের প্রতিবেদনে। চিকিৎসকরা বলেছেন, এতক্ষণ ধরে কোন বিরতি ছাড়া পর্দায় তাকিয়ে থাকার কারণে চোখ ক্লান্ত হয়ে এমনটা হয়েছে। আর্থিক খাতে কর্মরত ওই নারীর ভাষ্যেও ছিল একই সুর। তিনিও বলেছেন, কোন বিরতি ছাড়া একটানা গেম খেলার কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। এই গেম নিয়ে তিনি এতটাই আসক্ত ছিলেন যে কাজের পর আর সাপ্তাহিক ছুটিতে সারাদিন তিনি এটি খেলতে পারতেন বলে জানান। তিনি বলেন, যেদিনগুলোতে আমার কোন কাজ থাকে না, আমি সাধারণত ভোর ছয়টায় উঠি, সকালের নাস্তা খাই আর বিকেল চারটা পর্যন্ত খেলি। তারপর আমি কিছু খাই, একটু ঘুমাই আর উঠে আবার রাত একটা পর্যন্ত খেল। মাঝেমধ্যে আমি গেমটিতে এতটাই মগ্ন থাকতাম যে আমি কিছু খেতে ভুলে যেতাম আর আমার মা-বাবা যখন রাতের খাবারের সময় হলে আমাকে ডাকতেন তা শুনতামও না। এই নারী এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকরা তার দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় চেষ্টা করছেন। শুধু চীনেই ২০ কোটি মানুষ যুদ্ধভিত্তিক গেম অনার অফ কিংস খেলে থাকেন। দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি কমাতে অনলাইন গেম খেলার সময় প্রতি আধাঘণ্টা পর পর বিরতি নেয়া উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এখন যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়, আমি মনে করি তা হবে রোগ, দূষণ এবং দরিদ্রতার বিরুদ্ধে, আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে নয়।’ আয়ের দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষ ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান আলিবাবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের জন্য বড় হুমকি হিসেবেই দেখছেন আলিবাবা প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান জ্যাক মা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্যানেল আলোচনায় জ্যাক মা বলেন, ভবিষ্যতে আমদের অনেকেরই জায়গা দখল করবে এআই। ‘এআই, বিগ ডেটা মানুষের জন্য হুমকি। এআই এবং রোবট অনেক চাকরি শেষ করবে, কারণ ভবিষ্যতে এই কাজগুলো করা হবে মেশিন দিয়ে। আমি মনে করি এআইয়ের উচিত মানুষকে সমর্থন করা। প্রযুক্তির সব সময় উচিত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, অক্ষম করা নয়।’ জ্যাক মা’র বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আইএএনএস জানায়, যখন দায়িত্বের ব্যাপার আসে তখন বলতে হবে গুগল, ফেসবুক, এ্যামাজন এবং আলিবাবা শতাব্দীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান প্রতিষ্ঠান। ‘কিন্তু একটি ভাল মন থাকা এবং ভাল কিছু করাটাও আমাদের দায়িত্ব।
এটি নিশ্চিত করুন যে আপনি যা কিছু করছেন তা ভবিষ্যতের জন্য,’ বলেন মা। ‘আমাদের মতো মানুষ যাদের অর্থ ও সম্পদ রয়েছে এবং আমাদের উচিত প্রযুক্তিতে অর্থ ব্যয় করা যা মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে এবং জীবনকে আরও ভাল করবে।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নতুন প্রযুক্তি অনেক সফল মানুষ, আকর্ষণীয় পেশা তৈরি করবে কিন্তু সত্যি বলতে সব নতুন প্রযুক্তি সামাজিক সামাজিক সমস্যা তৈরি করবে। জ্যাক মা বলেন, ‘প্রথম প্রযুক্তি বিপবের কারণে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় প্রযুক্তি বিপবের কারণে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হয়েছে এখন আমাদের সামনে তৃতীয় বিপ্লব।
এখন যদি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হয়, আমি মনে করি তা হবে রোগ, দূষণ এবং দরিদ্রতার বিরুদ্ধে, আমদের নিজেদের বিরুদ্ধে নয়।’ আয়ের দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষ ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান আলিবাবা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ