বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আইসিটি-২০১৮ মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় রাজাদের ফরমানের মত

৫৭ ধারা থেকে ৩২ ধারা। প্রথম পাঠেই মনে হয় ধারা বুঝি কমানো হলো। বাস্তবে কি তাই! আইনটি নিয়ে, আইনবিদ রাজনৈতিকবিদ সাংবাদিক সকল মহল থেকেই আপত্তি তোলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত সোমবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করলেও নতুন আইনে ৫৭ ধারার বিষয়গুলো চারটি ধারায় ভাগ করে আলাদা আলাদা শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইসিটি আইনে ৫৭ ধারায় মানহানি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টসহ আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো সংক্রান্ত বিষয়গুলো একত্রে ছিল।  বর্তমান আইনে একই জিনিসকে আলাদা আলাদাভাবে ভাগ করে জনগণের চক্ষুধোলাই করা হচ্ছে। বলা যায় “নতুন বোতলে পুরান মদ” আর কি।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনীভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত, কমপিউটার ডিজিটাল যন্ত্র, কমপিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কমপিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বৎসরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হবে। শুধু তাই নয় কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার কিংবা বার বার করেন, তাহলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড ভোগ করতে হবে।

আইনের উদ্দেশ্য বরাবরই মহৎ। কাউকে শাস্তি দেয়া আইনের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়। আইনের লক্ষ্য হবে অপরাধীর সংশোধন। আইনের উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা জাগানো নয়। এর আগে আমরা জানতাম যাবজ্জীবন মানে ১৪ বৎসর। তারপর বিভিন্ন কনসেসন বা মওকুফ মিলিয়ে তা বাস্তবে ৯ বৎসর জেলে খাটতে হতো। এই আইনে দেখা যায় ১৪ বৎসরের পর যাবজ্জীবন সাজার বিধান চালু হয়েছে। অর্থাৎ একটা অপরাধই যথেষ্ট তারপর ঘর সংসার ফেলে সারা জীবন জেল খাটেন। প্রতিহিংসা বা জিঘাংসাই যেন এই আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তবে এই আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শুধু জিঘাংসাই নয় সুরক্ষাও। কিসের সুরক্ষা দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা। পোড় যাওয়া সিনিয়ার রাজনীতিবিদ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ কোন প্রকার রাখ ঢাক না করে একেবারে খোলাখুলি বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এমপিদের মান ইজ্জত রক্ষা করবে। তাদের ইজ্জতের কথা চিন্তা করেই এই আইন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের তোফায়েল আহমদ বলেন, গণমাধ্যমে যেভাবে এমপিদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট হয়, তাতে এমপিদের মান ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুণœ হয়, তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই এইগুলো ঠেকাতেই এই আইন করা হয়েছে।

তোফায়েল আহমদ আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনেক চিন্তা ভাবনা করেই করা হয়েছে। ৫৭ ধারাটি যে বিতর্কিত ছিল এই আইনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করে সাইবার  অপরাধের  শাস্তি  ও  জেল  জরিমানার বিধান রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই আইন পাস হলে হ্যাকিং, ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে বা ভয়ভীতি সৃষ্টির জন্য কমপিউটার বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্ককে প্রতিবন্ধক তা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল উপায়ে গুপ্তচরবৃত্তির মত অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে এই আইন করা হয়েছে বলে দাবি করে তোফায়েল আহমদ বলেন, আগের আইসিটি আইনটি বিএনরি সময়ে করা ছিল। সেই আইনে অনেক বিষয় অস্পষ্ট ছিল। বর্তমানে সেই বিষয়গুলো স্পষ্ট ও কঠোর করা হয়েছে।

তোফায়েল আহমদ সাংবাদিকদের নসিহত করে যা বলেছেন তাতে বুঝতে কষ্ট হয় না এই আইনটি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে। অর্থাৎ সাংবাদিকদের পেশায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্যই এই আইনটি করা হয়েছে। তিনি অকপটে বলেছেন এমপিরা জনপ্রতিনিধি তাদের মান ইজ্জত রক্ষার জন্যই নাকি এই আইন করা হয়েছে। এই কথা বলেই তোফায়েল আবার বলেছেন আমার বিশ্বাস আপনাদের ঠেকানো যাবে না। প্রকৃত সাংবাদিকদের ঠেকানো যায় না। তোফায়েল সাহেব ঠিকই বুঝতে পেরেছেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন এখানে বিভিন্ন ধরনের বাক স্বাধীনতাকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে। এ সম্পর্কে কোন বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না,প্রশ্ন করা যবে না সমালোচনা করা যবেনা। সমালোচনা করলেই ১৪ বৎসর কারাদ-। আমেরিকার সংবিধানের কথা উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, ১৯৭১ সালে আমেরিকার সংবিধানে বলা হয়েছে সংসদ বাক স্বাধীনতা খর্ব করে কোনো আইন পাস করতে পারবে না। দুইশতের বেশী বৎসর পার হয়েছে। আমরা আরও সভ্য হবো। এই আইন দ্বারা প্রমাণিত হলো আমরা আজও সভ্যতার স্তরে পৌঁছতে পারিনি। ১৫০০, ১৬০০, ১৭০০ সালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানীতে বড় বড় রাজারা এই ধরনের ফরমান জারী করতেন। তারা তখন আইন করতেন রাজার সুরক্ষার জন্য, তাদের পুত্র কন্যা, তাদের ড্রেস ও মুকুটের সুরক্ষার ব্যাপারে কোন বিরূপ মন্তব্য করলে শূলে চড়ানোর বিধান জারী করা হতো। হাজার হাজার লোককে মধ্যযুগে শূলে চড়ানো হয়েছে। শাহদিন মালিক বলেন এটা মধ্যযুগে ফিরে যাওয়ার আইন। গণতন্ত্র মানে কথা বলার স্বাধীনতা। যে আইন কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। সেটা গণতান্ত্রিক আইন নয়। সেটা মধ্য যুগে ফিরে যাওয়ার আইন। আইনের পরিসর বা মাত্রা যাই হোক ৫৭ ধারায় দায়ের করা মামলাগুলো বহাল রাখার অর্থ উদ্দেশ্য মহৎ নয়। অসৎ উদ্দেশ্যেই আইনটি করা হয়েছে।  তোফায়েল আহমদ বলেছেন এই আইন নাকি এমপিদের,জনপ্রতিনিধিদের মান-ইজ্জত রক্ষা করবে। ৬৯ এর গণঅভু্যূত্থানের সময় ্আমরা দেখেছি, জনপ্রতিনিধিরা গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। তখনকার জনপ্রতিনিধিরা কম বেশী নির্বাচিত ছিলেন নিদেনপক্ষে জনপ্রতিনিধি বিডি মেম্বারদের দ্বারা। বর্তমান এমপিরাও তো সেই চরিত্রেরও নয়, সম্পূর্ণ ভোটারবিহীন। যাদের এলাকায় যেতে বা থাকতে হয় সশস্ত্র রক্ষীদের নিয়ে। তারাতো গণধিক্কারের শিকার। তোফায়েল আহমদ যথার্থই বলেছেন এমপিদের জন্য এই আইন সত্যিকার অর্থেই দরকার ছিল। যারা সত্যিকার এমপি তারা স্বরক্ষিত তাদের সুরক্ষার দরকার হয় না। জনগণই তাদের সুরক্ষা।

তবে হ্যাঁ আইন দ্বারা কাউকে গণধিক্কার থেকে রক্ষা করা যায় না। এটা ইতিহাসের অমোঘবাণী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ