বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

গণতন্ত্রের বিশ্ব সূচকে দেশের অবস্থান

গণতন্ত্রের আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯২তম। অথচ এর এক বছর আগেও এই অবস্থান ছিল ৮৪তম। সে হিসাবে বাংলাদেশ আট ধাপ পিছিয়েছে। তথ্যটি জানা গেছে লন্ডনভিত্তিক অর্থনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্ট-এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিভাগ প্রকাশিত গণতান্ত্রিক সূচকÑ২০১৭ থেকে। সাময়িকীটি দু’ বছর পরপর এই সূচক প্রকাশ করে থাকে। সূচক তৈরি করা হয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পাঁচটি পৃথক বিষয়ের মূল্যায়নের ভিত্তিতে। নির্বাচন প্রক্রিয়া ও বহুপক্ষের অংশগ্রহণ, নাগরিক স্বাধীনতা, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিÑ এ পাঁচটি বিষয়ের সঙ্গে এবারের সূচকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। সূচকও এসবের ভিত্তিতেই তৈরি করেছে সাময়িকীটি।  

সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে। এই ১০ পয়েন্টের মধ্যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৫ দশমিক ৭৩। কিন্তু মাত্র দু’ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্জন ৫ দশমিক ৪৩-এ নেমে এসেছে। এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত পেয়েছে ৪২তম অবস্থান। অন্যদিকে পাকিস্তান নেমে গেছে ১১১তম অবস্থানে। সূচকে এবারও শীর্ষস্থানটি পেয়েছে নরওয়ে। নরওয়ের পর রয়েছে আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। অন্যদিকে সূচকের সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটি ১০ পয়েন্টের মধ্যে স্কোর করেছে মাত্র ১ দশমিক ০৮। দ্য ইকনোমিস্ট-এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিভাগ প্রকাশিত গণতন্ত্রের সূচকে সাত মহাদেশের মধ্যে সার্বিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে এশিয়া। ২০১৭ সালে এশিয়ার গড় স্কোর ৫ দশমিক ৬৩। এই স্কোর অবশ্য বিশ্বের গড় অর্জন ৫ দশমিক ৪৮-এর তুলনায় সামান্য হলেও বেশি।

গণতন্ত্রের সূচক সংক্রান্ত রিপোর্টে বাংলাদেশ সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ক্রমশ ‘হাইব্রিড শাসন’ ক্যাটাগরির দিকে ধাবমান। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পেছনে। ১০ পয়েন্টের মধ্যে ৭ স্কোর করলেও সূচকে বাংলাদেশ পেয়েছে ৪৯তম স্থান। রিপোর্টে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে ‘আংশিক স্বাধীন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার তথ্য উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, এতদিন উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল একটি অভিন্ন জায়গা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে ২০১৭ সালে এসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের মাত্র ৩০টি দেশের গণমাধ্যম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছে। জনসংখ্যার দিক থেকে বিভিন্ন দেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ এই স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। ৪৭টি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবাধ ছিল না। অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কিছুটা ভালো বলা হয়েছে বলে মনে হলেও গণতন্ত্রের সূচক রিপোর্টে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আবার একথারও উল্লেখ রয়েছে যে, পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ছিল ‘আংশিক স্বাধীন’। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্ট-এর স্বতন্ত্র বিভাগ ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রকাশিত গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা যে কোনো বিচারে নৈরাশ্যজনক। সরকার তথা ক্ষমতাসীনরা যখন গণতন্ত্রের জয়গান গাইতে ব্যস্ত তেমন এক সময়ে সাময়িকীটির প্রাসঙ্গিক মন্তব্য নিঃসন্দেহে গভীর আশংকার সৃষ্টি করবে। কারণ, সূচক রিপোর্টে বলা হয়েছে, নামে গণতন্ত্র থাকলেও বাংলাদেশ ক্রমশ ‘হাইব্রিড শাসন’ ক্যাটাগরির দিকে ধাবমান। ‘হাইব্রিড শাসন’ ক্যাটাগরি বলতে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে সে কথার ব্যাখ্যা দেয়ার সম্ভবত দরকার পড়ে না। শুধু একটি তথ্যের উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং বহুপক্ষের অংশগ্রহণ ও নাগরিক স্বাধীনতাসহ সূচকের কোনো মানদন্ডেই বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ রাখা হয়নি। 

সংসদ নির্বাচনের নামে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীনরা যে কর্মকান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাকে কোনোক্রমেই গণতন্ত্রসম্মত বলা যায় না। ওই কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনশ’ আসনের জাতীয় সংসদে ১৫৪ জনকেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ করা হয়েছিল, বাকি ১৪৬ জনকেও ভোটার জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। সব মিলিয়ে সেবার সাত শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনদের লজ্জিত হতে দেখা যায়নি। তারা বরং সমগ্র সে কর্মকান্ডকেই গণতন্ত্র বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছেন। এখনো, চার বছর অতিক্রান্ত হলেও ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গী ও সমর্থকদের মধ্যে নীতি ও চিন্তার দিক থেকে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এই সময়ে তারা আবারও নতুন একটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। বড় কথা, পরিকল্পিত সে নির্বাচনে যাতে প্রধান কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল অবাধে অংশ নিতে না পারে সে ব্যাপারেই বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীনদের। 

বলা বাহুল্য, সত্যিই তেমন আয়োজন করা হলে বাংলাদেশ আবারও দ্য ইকনোমিস্ট-এর মানদন্ড অনুযায়ী পিছিয়ে পড়বে। কারণ, সাময়িকীটি বহুপক্ষের অংশগ্রহণকে প্রধান একটি মানদন্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বলা দরকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ অন্য সকল দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে একই ক্ষমতাসীনদের কারণে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ‘আংশিক স্বাধীন’ কথাটাও নিশ্চয়ই প্রমাণ করে না যে, বর্তমান সরকারের অধীনে গণতন্ত্র নিরাপদ এবং দেশে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটছে। আমরা মনে করি, বিসয়টিকে দ্য ইকনোমিস্ট তথা একটি মাত্র সাময়িকীর রিপোর্ট হিসেবে দেখার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের উচিত একথা অনুধাবন করা যে, তাদের নীতি-কৌশল ও দমনমূলক কর্মকান্ডের কারণে সারা বিশ্বই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ব্যাপারে একই মনোভাব পোষণ করে। সে জন্যই ক্ষমতাসীনদের উচিত পরিকল্পিত সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা, যাতে আর কোনো সাময়িকী বা সংস্থার সূচকে বাংলাদেশকে পিছিয়ে পড়তে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ