সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

৫৪৬০০ টাকায় সরকারি বিএসসি  ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি

খুলনা অফিস : সরকারি চাকরি এখন আর সোনার হরিণ নয় বা চাকরির জন্য লাখ লাখ টাকা উৎকোচ দিতে হবে না শুধু কোচিংয়ে ভর্তি হলেই নিশ্চিত সরকারি চাকরি! স্ট্যাম্পে চুক্তি করে এভাবেই কোচিং এ ছাত্র ভর্তি করা হচ্ছে। সরকারি চাকরি না হলে বা ছাত্র ফেল করলেও সমুদয় অর্থ ফেরত দেবার অঙ্গীকারও করা হচ্ছে। প্যানা দিয়ে আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে টাকার বিনিময়ে সরকারি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে। শুনলে চমকে ওঠার কথা কিন্তু বাস্তবে এধরনের ব্যানার লটকিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করছে খুলনার কোচিং সেন্টারে।

মহানগরীর খালিশপুর জংশন এলাকায় খুলনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অবস্থিত। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার। একই ভাবে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকের সামনের বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের আকর্ষণীয় ব্যানার, প্যানায় ছেয়ে গেছে। এর মধ্যে শাহিন কোচিং এর একটি ব্যানার ছাত্র-ছাত্রীদের আকর্ষণ করেছে। রঙিন এই ব্যানারে লেখা হয়েছে-‘ডুয়েট ভর্তি ও ডিপ্লোমা জব কোচিং ভর্তির সময় স্ট্যাম্পে লিখিত দেয়া হবে, সরকারি চাকরি না পাইলে সকল টাকা ফেরত! বিঃদ্রঃ একাডেমিক কোচিং এ গ্যারান্টি ব্যাচ ফেল করিলে টাকা ফেরত! এপ্লাস পেতে চাইলে শাহিন কোচিং এ আসুন। শাহিন কোচিং থেকে খুলনা বিভাগের সেরা সাফল্য ৩. ৯৮। যোগাযোগ শাহিন কোচিং বা শাহিন বুক সেন্টার, সরকারি পলিটেকনিক কলেজের মোড়, খুলনা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, দুটি কক্ষ নিয়ে এ সব কোচিং সেন্টার। তবে অফিস কক্ষের চেয়ে আয়তনে কয়েকগুণ বড় সে প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। আর এই সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া শাহিন কোচিং অফিস শাহিন বুক হাউজেই। তবে ভেতরে যাই হোক সবারই চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়েছে।

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করা শাহিন কোচিং এর মালিক শেখ শহিনুর রহমান সরকারি চাকরি দেবার কথা স্বীকার করেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে কোচিং করা দশ জন ছাত্র যদি সরকারি চাকরিতে আবেদন করে তবে কমপক্ষে পাঁচ জন চাকরি পাবে। তখন তিনি বাকি পাঁচ জনের টাকা ফিরিয়ে দেবেন। এখানে প্রতারণার কিছু নেই। তিনি জানান, এই সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া ব্যানার দেবার পর অনেক ছাত্রই এসেছে। তিনি একবার বলেন, তার ব্যাচ শুরু হয়েছে আবার পরক্ষণেই বলেন ব্যাচে ভর্তি চলছে কিছুদিন পর থেকে কোচিং শুরু হবে। কোচিং সেন্টারের নীচে শাহিন বুক হাউজ তার কোচিংয়ের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোচিংয়ে তিনি প্রশিক্ষক এবং তিনিই কোচিং এর মালিক। তার নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হতে ডিপ্লোমা করা বলে দাবি করেন। যেখানে সাধারণ মানুষ লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সরকারি চাকরি পাচ্ছেন না সেখানে তিনি কিভাবে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। এমন প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান, বলেন সব কোচিংই তাই করছে। তিনি এই সময় অন্য একটি কোচিং এর পোস্টার এনে দেখান। সরকারি কোন পদে চাকরি দেবেন সে ব্যাপারেও তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তিনি জানান, ৬ মাসের কোচিং এর জন্য তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি দশ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।

আবার এই শাহিন কোচিং এর পাশেই বিশাল আকারে সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে-‘শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সরকারি কোর্সে ভর্তি চলছে’। মনে হবে কোর্সের নামই ‘সরকারি’। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির নাম কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড। কিন্তু সাইনবোর্ড দেখে মনে হবে সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের এমডি মেহেদী হাসান তার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি সরকারি কোর্সকে তার প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুমোদনকে উল্লেখ করেন। তার নিজের ভিজিটিং কার্ড বের করে দেখান যেখানে সরকারি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব সাইটকে নিজের প্রতিষ্ঠান দাবি করা হয়েছে। তিনি জানান, ৬ মাস এবং ৩ মাসের দুটি কোর্সে এখানে ছাত্র ভর্তি করা হচ্ছে। যার মাসিক চার্জ ৬ হাজার এবং ৪ হাজার টাকা করে।

একই স্থানে প্যানা দিয়ে জানান, দিয়ে মাত্র ৫৪ হাজার ৬০০ টাকার বিনিময়ে অবিশ্বাস্যভাবে সরকারি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেবার ঘোষণা দিয়েছে খুলনা অগওঊ সেন্টার। তাদের প্যানায় বলা হয়েছে, এখন আর ৩-৪ লাখ টাকা নয় তারা মাত্র ৫৪ হাজার ৬শ’ টাকার বিনিমিয়ে সরকারি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন তারা। 

এ ব্যাপারে বিজ্ঞাপনের দেয়া মুঠোফোনে কল করে ভর্তি হতে চাইলে পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রেজিস্ট্রেশন ৬ হাজার ৫শ’ আর একাডেমিক ফি ৯ হাজার দিয়ে ভর্তি হতে হবে। তারপর বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট যে কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়া যাবে। বলেন, যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাটিফিকেট চান সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দেয়া যাবে। তিনি জানান, তিনি প্রতিষ্ঠানে না থাকলেও তার ম্যানেজারের কাছে টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।

খুলনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর অধ্যক্ষ ড. মো নূরুজ্জামান প্রামাণিক জানান, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে বিভিন্ন বেসরকারি পলিটেকনিক বা কোচিং সেন্টারের ওপর তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি স্বীকার করেন চটকদারি বিজ্ঞাপনে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতারিত হচ্ছে। খুলনা জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান এই ব্যানার আর সাইনবোর্ড দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলাকালে কোন অবস্থাতেই কোচিং চালু করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার কোচিং বন্ধর জন্য আইন তৈরি করছে। আগামীতে আর কাউকে কোচিং করতে হবে না। প্রতিটি স্কুলের শ্রেণিতে এমনভাবে শিক্ষাদান করা হবে যাতে আর কাউকে কোচিংয়ে যেতে হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ