বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গেই কাজ করবে

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমবার সাংবাদিকদের সামনে এসে সতর্কতার সঙ্গে সব পক্ষের জন্য বার্তা দিতে চেয়েছেন নতুন আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। ভোটের বছরের শুরুতে পুলিশের শীর্ষ পদে আসা এই কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচন করা নির্বাচন কমিশনের কাজ। আর পুলিশের কাজ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তা পুলিশ আইনের মধ্যে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গেই করবে। সবার সহযোগিতা পেলে ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মত’ মাদক নির্মূলেও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলার কথা বলেছেন তিনি। গত সাত বছর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা জাবেদ পাটোয়ারী বুধবার বিদায়ী আইজিপি একেএম শহীদুল হকের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পুলিশ সদরদপ্তরে তিনি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, “সবাইকে পাশে পেলে জঙ্গিবাদকে যেভাবে নির্মূল করেছি, মাদকও নির্মূল করব। মাদক নির্মূলে পুলিশের নীতি হবে ‘জিরো টলারেন্স’।”

জাবেদ পাটোয়ারীর ভাষায়, মাদকের যতদিন চাহিদা থাকবে, ততদিন এর যোগান থাকবে। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। “এর সাথে অনেক কিছু জড়িত আছে। সবাইকে নিয়ে কাজ করলে মাদক নির্মূল করা যাবে।”

তিন দশকের বেশি সময় পুলিশ বিভাগের চাকরিতে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পুলিশ জনগণের সেবা দিয়ে থাকে। পুলিশের কোনো কর্মঘণ্টা নেই। তবে কখনও কখনও কিছু পুলিশ সদস্যের কিছু কাজে বিব্রত হতে হয়; মাদকের কারবারেও পুলিশের জড়ানোর অভিযোগ কখনও কখনও এসেছে।

বাহিনীর সদস্যদের জন্য নতুন আইজিপির বার্তা- “পুলিশের কোনো সদস্যের অপরাধের দায় পুলিশ নেবে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে অপরাধী হিসাবে দেখে প্রচলিত নিয়ম নীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।”

আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী চান, তার বাহিনী হবে ‘নারীবান্ধব, জনবান্ধব, শিশুবান্ধব এবং প্রগতীবান্ধব’।

পুলিশ মহা পরিদর্শক হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের এক দিন আগে ঢাকার হাইকোর্ট মোড়ে পুলিশের ওপর বিএনপি কর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি একটি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় ঘিরেও রাজনৈতিক উত্তেজেনা ক্রমশ বাড়ছে। তাছাড়া বছরের শেষভাগে ভোটের সূচি থাকায় মাস গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন,“নির্বাচন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের কাজ। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের করণীয় আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করে যাব।” ‘জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব দিয়েছে।

এছাড়া সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং থানায় সেবার মান বাড়াতে উদ্যোগ নেয়ার কথাও তিনি বলেন।

আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশের অনেক অর্জন। তবে কতিপয় সদস্যের কিছু ঘটনা সামনে চলে আসে। অপেশাদার ওই সব আচরণের জন্য আমরা বিব্রত বোধ করি। ব্যক্তির অপরাধের দায় পুলিশ নেবে না। এ বিষয়ে নীতি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে সে অপরাধী বলে গণ্য হবে। প্রচলিত নিয়মনীতির মধ্যে থেকে বিষয়টি দেখা হবে।’

জঙ্গি ও মাদক হলো পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বুধবারও যখন প্রধানমন্ত্রী র‌্যাংক ব্যাচ পরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখনো আইজিপি মাদক নির্মূলের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশের নীতি জিরো টলারেন্স। এটি কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়, এটি সবার দায়িত্ব।

জাবেদ পাটোয়ারী মনে করেন, পুলিশ সদস্যরা যোগদানের পর থেকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে থাকে। তার মন্তব্য, ‘প্রতিটি দিনই আমাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্যের অধিকাংশই সেবাব্রতী। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা দেশ ও মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছেন।’ জঙ্গি নির্মূলে বাংলাদেশী মিডিয়া পুলিশকে যেভাবে সহায়তা করেছে, মাদক নির্মূলসহ অন্য বিষয়েও সবাই মিলে এভাবে কাজ করতে পারলে সাফল্য আসতে পারে।’ দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন নবনিযুক্ত আইজিপি। তার কথায়, ‘জঙ্গি দমনে পুলিশ বাহিনীর আন্তরিক সদস্য ও গোয়েন্দা বিভাগের মেধাবীরা অবদান রাখছেন। তাদের কাছে আসা অগ্রিম তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে অনেক শীর্ষ জঙ্গি আটক হয়ে বর্তমানে বিচারাধীন আছে। আবার অনেকে অভিযান চলাকালে নিহত হয়েছে। আমরা আমাদের জঙ্গি বিরোধী কার্যক্রম চলমান রাখবো এবং আরও জোরদার করবো।’

নতুন আইজিপি বলেন, এ দেশ আমাদের সবার। মাদকের ছোবল থেকে তরুণদের সুরক্ষার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবো। আমি বিশ্বাস করি, জঙ্গিবাদ নির্মূলে সাংবাদিকরা যেভাবে আমাদের পাশে থেকে কাজ করেছেন সেভাবে কাজ করতে পারলে সাফল্য আসবে।’

২০১৮ সালকে চ্যালেঞ্জ মনে করছি না

নির্বাচনের বছর ২০১৮ সালকে পুলিশ বাহিনী কোনও চ্যালেঞ্জ মনে করছে না বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ বাহিনী জন্ম থেকেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জীবন দিয়েছেন। ২০১৩, ১৪, ১৫ সালে পুলিশ বাহিনী জীবন দিয়ে আগুন সন্ত্রাস মোকাবিলা করেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমাদের সাহসী পুলিশ সদস্যরা শহীদ হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরাই জয়ী হয়েছি। তাই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ বাহিনী কাজ করবে।’

গতকাল দুপুরে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

আইজিপি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সমার্থক। যদি বাংলাদেশ বলতে হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধুকেও বলতে হবে। তিনি আজীবন সংগ্রাম করে এ দেশটাকে স্বাধীন করেছেন। দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। আমি সে দ্বায়িত্ব আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করে যাবো।’

এর আগে বেলা ১২টায় হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় আসেন আইজিপি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান ও র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুর ইসলাম, ডিআইজি (সিটি) মনিরুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন, মো. আবু কালাম সিদ্দিকী, গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খানসহ খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে আইজিপি বঙ্গবন্ধু ভবনে যান এবং সেখানে রাখা মন্তব্য বইতে মন্তব্য লেখেন। এছাড়া এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চৌধুরী এমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খান, যুগ্ম-সাধারণ সালাউদ্দিন পান্না, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র কাজী লিয়াকত আলী লেকু, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিটু, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তাফা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সোলায়মান বিশ্বাস, টুঙ্গিপাড়া পৌর মেয়র শেখ আহম্মেদ হোসেন মীর্জা, সাবেক পৌর মেয়র সরদার ইলিয়াস হোসেনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ