বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ফাইনালে হতাশার গল্প শেষ হবে কি?

মোহাম্মদ সুমন বাকী : মুরলিধরন। শ্রীলংকা ক্রিকেট দলের আক্রমনাত্মক স্পিন বোলার। জয় পাবার ক্ষেত্রে নৈপুণ্য প্রদর্শনে সে ছিলো খুবই চমৎকার। তাই বিশ্ব ক্রিকেট ভুবনে প্রশংসা ছড়ায় তার। প্রতিপক্ষ টিমের উইকেট বধে তুলনা নেই যার। সে জন্য আইসিসি কর্তৃক মর্যাদা পান বিশ্বসেরা অফস্পিনার। মুত্তিয়া মুরলিধরনের সময়ে বিশ্ব ক্রিকেট এর ওয়ানডে ঘরানায় শাসনের আসনে দ্বীপ দেশ শ্রীলংকার হয় আবিষ্কার। এককথায় সেটা ছিলো দারুণ উপহার। বল হাতে বার বার আক্রমণে তাকে দেখা গেছে ভয়ংকর হতে। তা জানা আছে সবার। কিন্তু ব্যাট হাতে? অনায়াসে বলা যায় আশানুরূপ নয়। ক্রিকেট পন্ডিতদের এই ধরনের মন্তব্যে সব সময় ঘিরে থাকতো তার ভয়। বোলিংয়ের নায়কের উল্টো চরিত্রে ব্যাটিং স্বর্গ রাজ্যে মুরালি নিঃসন্দেহে ভিলেন। মাঠের লড়াইয়ে তার এমন চেহারা হঠাৎ বদলে যায়। সেটা একেবারে ধারনার বাইরে। তা বিন্দু পরিমানে কেউ ভাবেননি। এ অবস্থায় মুত্তিয়া মুরলিধরন ব্যাট হাতে আতংকিত হয়ে উঠে। অন্য কোনো দল নয় তিনি বেছে নেন স্বাগতিক বাংলাদেশকে। সেটা ২০০৯ সালের কথা। তখন লাল-সবুজ পতাকা টিম অভিজ্ঞ নয় ততটা। যারা থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। ধাপে ধাপে আপসেট ঘটায়। ব্যস, এর বৃত্তে সীমাবদ্ধ। তবে আপসেট ঘটাবার তালিকা উল্লেখ করার মতো। তা চমকে দেয় সারা বিশ্বকে। বাংলাদেশ দল প্রথম অঘটন ঘটায় শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে। সে দৃশ্য ফুটে উঠে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে। নান্নু, আকরাম খান, ফারুক, আতাহার আলী, বুলবুল, সাইফুলরা সহজ পথে হারিয়ে দেয় ওয়াসিম আকরাম, সাইদ আনোয়ার, ইজাজ, সোহেল, শোয়েব আকতার, রাজ্জাক, সাকলাইন মুসতাক, শহীদ আফ্রিদি, মুসতাক আহমেদদেরকে। সকলে তা অবাক হয়ে দেখে। এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আলোকিত করে। টাইগার তকমা লাগানো দলটির মধু মাখা প্রশংসা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কারন পাকিস্তান টেস্ট ঘরনার অভিজ্ঞতায় ভরপুর অন্যতম সেরা টিম। এর তুলনায় আকরাম খানরা শিশু। তাই নন টেস্ট দল (১৯৯৯) বাংলাদেশের এই জয় আলোকিত করে আইসিসি সহ মিডিয়ার গোল টেবিলের আলোচনাকে। এমন পরিস্থিতিতে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া হয়নি। উল্টো চিত্রে শোভা পায় টাইগারদের চুপসে যাওয়ার গল্প। যার ফলে প্রতিপক্ষ টিমের কাছে একের পর এক ম্যাচে বিশাল ব্যবধানে পরাজয় ঘটে। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তিটাও বিতর্কিত হয়ে পড়ে। সেটা হাবারামের ধারায় স্থায়ী পাত্র হয়ে স্থান পায় সর্বমহলে। টেস্ট এবং ওয়ানডে ঘরনায় লাল-সবুজ পতাকা টিমের অবস্থা হয় এমন। যা সবার বোধগম্য। ২০০০ হতে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চরমভাবে ব্যর্থ তারা। তাই তাদেরকে নিয়ে সমালোচনার ঝর বইয়ে গিয়েছিলো চারদিকে। টেস্ট মর্যাদা বাদ করে দেবার প্রশ্ন উঠে! এর পাল্টা জবাব পায় সেই সমালোচকের দল। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথমে স্বাগতিক জিম্বাবুয়েকে বধ! বছরের শেষ দিকে ভারতকে পরাজিত করে!! ধাপে ধাপে বাংলাদেশ বধের তালিকায় নাম লেখায় শ্রীলংকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ার মতো ওয়ার্ল্ড সুপার ডুপার দল। এ পুঁজি টাইগারদের সাহস বাড়িয়ে দেয় অনেক। এমন পথে হাঁটার ধারা বজায় রাখে তারা। ২০০৯ সাল অন্যতম উদাহরণ। চলতি বছরের শুরুতে তিন জাতি টুর্নামেন্টে অংশ নেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ, শক্তিশালী টিম শ্রীলংকা, ক্রিকেট ভুবনে আবার কামব্যাক করা জিম্বাবুয়ে। তখন লড়াই হয়েছিলো দারুন। এ অবস্থায় উত্তেজনায় ঘেরা শেষ মুহুর্তে জিম্বাবুয়েকে পিছনে ফেলে ফাইনালে উঠে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ। বিশ্লেষনের ধারায় যা স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত লড়াইটা হয় আকর্ষণে ভরা। সেটা এক বাক্যে অভিহিত করা যায় অসাধারন শব্দটি কলমের কালিতে তুলে ধরে। বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করে। আড়াইশত রানের নীচে ইনিংস গড়ে। এই পরিস্থিতিতে লংকানরা জয়ের জন্য লক্ষ্য পায় সহজ পন্থাতে। কিন্তু ফাইনালের শেষ ইনিংসে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বাংলাদেশের আক্রমনাত্মক বোলিং। সেটা অসম লড়াইকে নিয়ে আসে কাছাকাছি দৃশ্যটি ছিলো ফাটাফাটি। দুইশত থেকে অনেক দূরে শ্রীলংকা টিমের ৮ উইকেট আউটের খাতায় নাম লিখিয়ে প্যাভিলিয়নে স্থান পায়। জয় পাওয়াটা সময়ের মাত্র হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান বোলার হিসেবে বিখ্যাত এবং ব্যাটসম্যান পরিচয়ে অখ্যাত মুরালিধরন। যার বেধড়ক পিটুনিতে টাইগারদের স্বপ্ন হাওয়ায় উড়ে। রানার্স আপ ট্রফি সান্ত¦না ঘিরে রাখে। এর ফলে নতুন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে যারা নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকাকে বধ করে। তা দৃশ্যমান হয় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। এমন ধারা বজায় থাকে ভবিষ্যতে। বাংলাদেশ আবার ফাইনালে উঠে। যা দেখা গেছে ২০১২ ওয়ানডে এশিয়া কাপে। শক্ত প্রতিপক্ষ শ্রীলংকা, ভারতকে পিছনে রেখে। টাইগাররা পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় ফাইনালে। দুঃখ ভরা এ ম্যাচে ২ রানে হারে এবং রানার্স আপ ট্রফি ঘরে তুলে। শিরোপা নিয়ে পাকিস্তান দেশে ফিরে। এই দু’টি ফাইনাল বাংলাদেশের জন্য দুঃখ ভরা ট্র্যাজেডি হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষী হয়ে আছে। হতাশা কাটিয়ে সাফল্য পাবার পথে পা বাড়িয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে তা পেয়েছে। ২০১৬ প্রথম টি-টুয়েন্টি এশিয়া কাপে স্বাগতিক বাংলাদেশ ইতিহাস হয়ে থাকে। সেটা আয়োজক এবং ফাইনালিস্ট হিসেবে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তানকে পরাজিত করে। শুধু গ্রুপ পর্বে জয় পায়নি ভারতের বিপক্ষ ম্যাচে। এ দুই দল ফাইনালে উঠে ইতিহাস হয়ে। অতিথিদের কাছে পাত্তা পায়নি স্বাগতিকরা। টি-টুয়েন্টি এশিয়া কাপের প্রথম শিরোপা ঘরে তুলে এম এস ধনির টিম ইন্ডিয়া। আবার রানার্সআপ! যা মাশরাফিদেরকে ঘিরে রাখে!! এক বছর গ্যাপ মাঝখানে। যেখানে ২০১৭ সাল বিদায় নিয়েছে। টুর্নামেন্ট খেলেছে উঠেনি ফাইনালে। ইতিমধ্যে ২০১৮ সালের পদার্পন ঘটে। বিসিবি কর্তৃক মিরপুর শের ই বাংলা স্টেডিয়ামে তিন জাতি টুর্নামেন্ট গড়ায় মাঠে। অংশ নেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও জিম্বাবুয়ে। মাশরাফির দল প্রথম তিন ম্যাচে অগ্নিরূপ ধারন করে। গ্রুপ পর্বের এ লড়াইয়ে তারা জিম্বাবুয়ে, শ্রীলংকাকে পাত্তা না দিয়ে ফাইনালে উঠে। শেষ ম্যাচে ছন্ন ছাড়া! ব্যাটিং নৈপূন্য প্রদর্শনে একি দশা!! মাত্র ৮২ রানে অল আউট!!! এমন মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগায় শ্রীলংকা খেলায় জিতে ১০ উইকেটের ব্যবধানে। এর ফলে করুন পরিস্থিতি টপকিয়ে ফাইনালে পা রাখে। শিরোপা কোন দল পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে অতিথিদের ইনিংসটা মজবুত হয়নি প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে। ২২১ রানে অল আউট বাংলাদেশ টিমের রুবেলের বোলিং তান্ডবে। কাজ হয়নি তাতে। রিয়াদের হাফ সেঞ্চুরি যায় বিফলে। বাংলাদেশ অল আউট হয় ১৪২ রানে। সন্তুষ্ট থাকে রানার্স-আপ হয়ে। এখন প্রশ্ন জাগে, সেটা সবার মনে! ফাইনালে হতাশার গল্প শেষ হবে কি? এর উত্তর সময়ই বলে দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ