শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জয়নাবের বাবাই ধরিয়ে দেন খুনিকে

২৬ জানুয়ারি, ডন/স্কাই নিউজ/এক্সপ্রেস ট্রিবিউন : পাকিস্তানে আট বছর বয়সী শিশু জয়নাব আমিন ধর্ষণ ও হত্যার মূল সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরিয়ে দেওয়ার পরও পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জয়নাবের বাবা মুহাম্মদ আমিন এ দাবি করেন। 

গত মঙ্গলবার পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জয়নাবের হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতায় খুনিকে ধরা সম্ভব হয়। ২৩ বছর বয়সী ওই হত্যাকারী ও ধর্ষকের নাম ইমরান আলী। শাহবাজ শরিফ এ জন্য পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদও জানান।

তবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জয়নাবের বাবা জানান, তিনি ও তাঁর আত্মীয়রা মিলে ইমরানকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তাঁর দাবির সপক্ষে তিনি একটি ছবিও দেখান। ছবিটি ইমরানের ভাইয়ের বাসায় তোলা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ইমরান একটি খাটিয়ায় বসে আছেন। জয়নাবের বাবা মুহাম্মদ আমিন বলেন, ‘আমরা ওকে (ইমরান) ধরে পুলিশে দিই।’

৪ জানুয়ারি কাসুরে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয় জয়নাব। কয়েক দিন পর একটি ময়লার স্তূপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

জয়নাবের বাবা বলেন, ঘটনার পর দুবার তাঁরা ইমরানকে ধরে পুলিশে দেন। কিন্তু পুলিশ দুবারই তাঁকে ছেড়ে দেয়। পরে তাঁরা বিষয়টি পাঞ্জাবের পুলিশপ্রধানকে জানান।

এদিকে পাকিস্তানে সাত বছর বয়সী শিশু জয়নাবকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আটক মোহাম্মদ ইমরান আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সঙ্গে জড়িত কিনা তা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির আদালত। পাকিস্তানের টিভি উপস্থাপক ড. শহিদ মাসুদের অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালত পাঞ্জাব পুলিশকে এ আদেশ দেয়।  ড. শহিদের দাবি অনুযায়ী জয়নাব হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন ইমরান পাকিস্তানের একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী এক গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট। ছড়িয়ে পড়া এক হোয়াট'স অ্যাপ মেসেজেও দাবি করা হচ্ছে, স্থানীয় একজন পার্লামেন্ট সদস্য কাসুর পর্ন ইন্ডাস্ট্রির মূল হোতা। ড. শহিদের আশঙ্কা, পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই ইমরানকে হত্যা করা হতে পারে। বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) আদালত ইমরানের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করারও নির্দেশ দিয়েছে। 

গত ৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) কোরআন ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে পাঞ্জাবের কাসুর শহর থেকে সাত বছরের শিশু জয়নাবকে অপহরণ করা হয়। ওই সময় বাবা-মা ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে থাকায় খালার কাছে ছিল সে। পরে ৯ জানুয়ারি এক পুলিশ সদস্য শাহবাজ খান রোডে আবর্জনার স্তূপ থেকে জয়নাবের লাশ উদ্ধার করেন। জয়নাব কাসুরে এক বছরের মধ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার ১২তম শিশু। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা ও তার আগে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার ভিত্তিতে ২৩ জানুয়ারি তার সন্দেহভাজন হত্যাকারী মোহাম্মদ ইমরানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ২৪ বছর বয়সী ওই সন্দেহভাজন সিরিয়াল কিলার এরইমধ্যে জয়নাব এবং আরও ৭ জন মেয়ে শিশুকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তবে সন্দেহভাজন ইমরানের সঙ্গে শিশু নিপীড়নকারী চক্রের সংযোগ থাকার ধারণাটি সামনে আসে পাকিস্তানের একটি টিভি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের টিভি উপস্থাপক ড. শহিদ মাসুদ তার অনুষ্ঠানে দাবি করেন, জয়নাবের সন্দেহভাজন হত্যাকারী একটি আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং তার ৩৭টি ফরেন কারেন্সি একাউন্ট রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) শহিদ মাসুদের বক্তব্যটিকে আমলে নেয় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি মিঞা সাকিব নিসারের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ পাঞ্জাব পুলিশকে এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দেয়। ইমরান আসলেই শিশু নিপীড়নে জড়িত আন্তর্জাতিক চক্রের হয়ে কাজ করছে কিনা, শিশুদের যৌন নিপীড়নের ভিডিও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের হাতে তুলে দিচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে  দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কাসুরের শিশু জয়নাবকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শুরু থেকেই পাঞ্জাব সরকার এবং সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দুই দফায় লাহোর হাইকোর্ট এবং সবশেষ সর্বোচ্চ আদালত থেকে আসামি গ্রেফতারে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া ৩ দিনের সময়সীমা পার হওয়ার একদিন আগে ইমরানকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে জয়নাবের বাবা-মাসহ সেখানকার অভিভাবকদের আস্থার অভাব রয়েছে।

বৃহস্পতিবার শুনানির সময় টিভি উপস্থাপক ড. মাসুদও বিচারপতিদের ওই বেঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অপ্রত্যাশিতভাবে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের মাতাল আর হতাশাগ্রস্ত মানুষ ইন্টারনেটে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের চিত্র দেখে বিকৃত আনন্দ পায়।’ তাদের জন্য শিশু পর্নোগ্রাফি নির্মাণ করা হয়। ইমরানের দাবি, অভিযুক্ত ইমরান মানসিকভাবে অসুস্থ নয়, সে একটি চক্রের সদস্য। একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী লোকজন সন্দেহভাজন ইমরানকে সমর্থন যুগিয়ে গেছে। আদালত মাসুদের কাছে এ অপরাধে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম জানতে চায়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নামগুলো গোপন রাখা হবে বলেও জানায় আদালত। মাসুদ আদালতের কাছে অন্য সন্দেহভাজনদের নামের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছেন। অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে ‘চরম পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে যারা মাসুদকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তাদেরই নাম উপস্থাপন করা হয়েছে। ইমরানকে পুলিশি হেফাজতে হত্যা করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন মাসুদ।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘টিভি উপস্থাপকের দাবি সত্য হলে মূল সন্দেহভাজনের নিরাপত্তাও একটি উদ্বেগের বিষয়।’ নিরাপত্তা হেফাজতে সন্দেহভাজনের নিরাপত্তা রক্ষার দায় পাঞ্জাবের আইজির। আদালত জানায়, হেফাজতে থাকা অবস্থায় সন্দেহভাজনের কোনও ধরনের ক্ষতি হলে এজন্য পাঞ্জাব পুলিশকে দায়ী করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ