শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পদ্মাবত ছবির মুক্তিকে ঘিরে ভারতজুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদিদের সহিংস প্রতিবাদ 

 

২৫, জানুয়ারি, আন্দবাজার, হিন্দুস্তান টাইমস, এনডিটিভি : ভারতের কয়েকটি রাজ্যজুড়ে বলিউডের চলচ্চিত্র ‘পদ্মাবত’ এর মুক্তির বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিবাদ জানিয়েছে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর শত শত সমর্থক।

গত বুধবার ভারতের রাজধানী দিল্লি সংলগ্ন গুরগাঁও এর পাশাপাশি হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও জম্মু ও কাশ্মিরে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে ঐতিহাসিক কাহিনী নির্ভর বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ছবি ‘পদ্মাবত’।

রাজপুত রানি পদ্মীনির কাহিনীকে ভিত্তি করে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, রূপবতী রানি পদ্মীনিকে পাওয়ার জন্য সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি রাজস্থানের চিতোর দুর্গ জয় করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকবার সামরিক অভিযান চালান। শেষে খিলজি পদ্মীনিকে ধরার চেষ্টা করলে সম্মান বাঁচাতে পদ্মীনি চিতোর দুর্গের একটি অগ্নিকু-ে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন।

প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, চলচ্চিত্রটিতে রানি পদ্মীনির সঙ্গে খিলজির প্রেম দেখানো হয়েছে; এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন চলচ্চিত্রটির নির্মাণকারীরা। কিন্তু তাতেও ছবিটিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সহিংসতা থামেনি।

গুরগাঁওয়ে প্রতিবাদিরা হরিয়ানার একটি সরকারি বাসে আগুন দেওয়ার পর ওই সড়ক ধরে যাওয়া স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীদের একটি বাসে হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধদের নিক্ষিপ্ত পাথরে স্কুল বাসটির অধিকাংশ জানালার কাঁচ ভেঙে যায়, আতঙ্কিত শিশুদের চিৎকার সত্ত্বেও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা হয়নি।

 মোবাইলে ধারণ করা এই ঘটনার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

‘‘পুলিশ সামনেই ছিল, কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তাদের পাত্তাই দিচ্ছিল না,” বলে জানিয়েছেন এক শিক্ষক। 

হরিয়ানার আরেকটি এলাকায় একটি বাস পুড়িয়ে দেয় তারা। হরিয়ানা ও রাজস্থানের বিভিন্ন অংশে রাস্তা অবরোধ করে রাখে।

উত্তর প্রদেশে জোর করে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। গুজরাটে যানবাহনে হামলা করে।

মধ্যপ্রদেশ এবং জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যেও সহিংস প্রতিবাদ হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

 কোনো সিনেমা হলে ছবিটি যেন চলতে না পারে তা নিশ্চিত করতে নিজেদের সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছে রাজপুত সংগঠন করনি সেনা। গোলযোগের আশঙ্কায় গুরগাঁওয়ের বেশ কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 গোলযোগ এড়াতে গুরগাঁওয়ে সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিনেমা হলের ২০০ মিটারের মধ্যে প্রতিবাদকারীদের আসতে দেওয়া হবে না।

তারপরও শহরটির প্রায় ৪০টি সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ ছবিটি না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আনন্দবাজার জানিয়েছে, সহিংসতার জেরে চারটি রাজ্যে ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘মাল্টিপ্লেক্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া’। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দীপক আশ জানিয়েছেন, রাজস্থান, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ ও গোয়ার মাল্টিপ্লেক্সগুলিতে মুক্তি পাবে না ছবিটি। বৃহস্পতিবার ছবিটি মুক্তি পেলে ভারতের প্রতিটি সিনেমা হলের সামনে ‘জনতার কার্ফু’ জারি হবে বলে হুমকি দিয়েছেন করনি সেনার সভাপতি। এই ছবির মুক্তি রুখতে ‘সর্বশক্তি’ প্রয়োগ করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। প্রতিবাদাকারীরা সব চেয়ে বেশি তা-ব চালিয়েছে গুজরাটে। গুজরাটের আহমদাবাদ থেকে পুলিশ ৫০ জন প্রতিবাদকারীকে আটক করেছে। প্রতিবাদকারীরা এখানে ৩০টি মোটরসাইকেল পুড়িয়েছে। রাজস্থানে ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে না এমন খবরের পরও জয়পুরে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়। মুম্বই, লখনউ, ভোপাল, মথুরাতেও গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। মুম্বই থেকে ৫০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, বিজেপি বিদ্বেষ ও সহিংসতাকে ব্যবহার করে গোটা দেশে আগুন জ্বালাচ্ছে। গত বুধবার রাত ১১ টা নাগাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার বার্তায় ওই মন্তব্য করেছেন। ভারতে ‘পদ্মাবত’ ছায়াছবি মুক্তি ও প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'শ্রী রাজপুত করনি সেনা'র যে তা-ব ও সহিংস বিক্ষোভ চলছে রাহুল গান্ধী তার তীব্র সমালোচনা করে ওই মন্তব্য করেছেন। 'সহিংসতা ও বিদ্বেষ দুর্বলদের অস্ত্র' বলেও তিনি বলেন। 

আম আদমি পার্টির প্রধান ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, যদি কেন্দ্রীয় সরকার, সমস্ত রাজ্য সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট মিলেও একটি ছবি মুক্তির ব্যবস্থা করতে না পারে এবং নিরাপদে তা চলার ব্যবস্থা করতে না পারে তাহলে দেশে বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? এফডিআইকে ভুলে যান, এখানে তো স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করতে সঙ্কোচ করবেন।

‘পদ্মাবত’ ছায়াছবি নিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে তা-বের তীব্র নিন্দা করে পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের সাবেক অধ্যাপক ও ‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’র সম্পাদক ড. ইমানুল হক গতকাল বৃহস্পতিবার রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘ দেশে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার চলছে। এখানে ১৯৩৩ সালের জার্মানিকে ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের দেশ এখন গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছে। তা হলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত সঙ্কট, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্কট। ‘করনি সেনা’র নামে যা ঘটছে তার সম্পূর্ণটাই হচ্ছে বিজেপি ও আরএসএসের মদদে।’ 

তিনি বলেন, ‘যদি ‘করনি সেনা’র বদলে 'কাশ্মির সেনা' বা অন্য কোনো সেনা হতো তাহলে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে নিষিদ্ধ করা হতো এবং এ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হতো। দেশে যখন সেনাবাহিনী আছে তখন সেনা নামে আর কিছু থাকবে কী না, হিন্দু সেনা, করনি সেনা, রণবীর সেনা এগুলো কী দেশদ্রোহিতা নয়? বিজেপি সরকার এগুলো দেখতে পায় না? আরএসএস এগুলো দেখতে পায় না? ওরা ইচ্ছে করেই এসব দেখছে না। যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো বিজেপিশাসিত রাজ্যে ঘটছে ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটানোর চেষ্টায়। ওরা আসলে হিন্দু ধর্মের অপমান করছেন। কারণ ভারত হলো সহিষ্ণুতার দেশ, তাকে তারা ভাঙতে চাচ্ছে।’ 

ড. ইমানুল হক বলেন, ‘যার ইচ্ছে সে ছবিটা দেখবে, যার ইচ্ছে হয় সে ছবিটা দেখবে না। কারো তা পছন্দ বা অপছন্দ হতে পারে। এখানে কোথাও রাম পূজিত হন, কোথাও রাবন পূজিত হন এই হচ্ছে আমাদের দেশ। সুতরাং রামের পুজোর যেমন অধিকার আছে, তেমনি রাবন পুজোরও অধিকার আছে। যেকোনো মানুষের অন্যের অনুভূতিকে আঘাত না করে ছবি তৈরি করার অধিকার আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ