মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নাঈমের ভাবনা

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর : কুয়াশায় ঢাকা শীতের সকাল। ক্রমেই বেড়ে চলছে শীতের তীব্রতা। মাঠে মাঠে সবুজের সমারোহের আনন্দখেলা। সোনালি ধানের শীষে দোল খাচ্ছে ধানক্ষেত। গ্রামজুড়ে শুরু হয়েছে ধান কাটার উৎসব। পাড়াজুড়ে ধান মাড়াইয়ের আমেজে মেতে উঠেছে কিষাণ-কিষাণীরা। নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত সারাগ্রাম। এমন দিনে কদর বাড়ছে জামাইদের। বিশেষ করে নতুন জামাইদের। গ্রামের অনেকের ঘরেই শুরু হয়েছে বিয়ের উৎসব। শীতের এমন সময়ে পাড়াগাঁয়ে সাধারণত বিয়ের আয়োজন চলে বেশি। বিয়ের ডামাডোলে আনন্দিত পাড়ার শিশুকিশোরেরা। নবান্নের এমন দিনে নানান রকমের বাহারি পিঠার সুগন্ধিতে মুখরিত সারাটি পাড়া-গাঁ। আনন্দের বন্যায় মেতে উঠছে শিশু-কিশোরেরা। এমনই শীতের সকালে দাদার পাশে বসে নাতিদের মুড়ি-মুড়কি খাবার আসর জমেছে বেশ উৎসব করেই। দাদা-নাতির আড্ডায় আনন্দের বন্যা বইছে সারাটি বাড়ি জুড়ে। আনন্দঘন এমনই এক শীতের সকালে খালি পায়ে হেঁটে চলছে নাঈম। শীতের সকালে গাঁয়ের মেঠোপথে খালি পায়ে হাঁটার মজাই আলাদা। পথে হাঁটতেই নাঈমের সাথে দেখা হয় গ্রামের মোড়ল দাদা মোকছেদ আলীর। দাদা মোকছেদ আলী আর নাঈমদের বাড়ি একই গ্রামে। পাশাপাশি। এবাড়ি ওবাড়ি। নাঈম দাদাকে সালাম জানায়--

 : আস্সালামু আলাইকুম।

  : ওয়া আলাইকুম সালাম। জবাব দেন দাদা মোকছেদ আলী। 

  : কেমন আছেন দাদা? 

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। তুমি কেমন আছ দাদা ভাই?

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। আপনাদের দোয়ার বরকতে আমিও অনেক ভালো আছি। বাসার সবাই কেমন আছেন দাদা?

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। সবাই ভালো আছেন। তোমাদের বাসার সবাই কেমন আছেন?

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। সবাই ভালো আছেন।

  : কোথায় যাচ্ছ নাঈম?

  : একটু হাঁটছি দাদা।

  : চল বাড়িতে যাই। 

  : চলুন। 

দাদা নাতির কথোপকথন শেষে দুজনেই বাড়িতে ফিরলেন। বাসায় বেশ লোকজনের সমাগম দেখা যাচ্ছে। জামাইদের আগমনে বাড়িতে বেশ আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। ছোট-বড় সকলের মাঝেই এক প্রকার ফূর্তি ফূর্তি মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সময় দাদা-নাতি বাড়িতে প্রবেশ করেন। দাদাকে দেখে নাতিন জামাইদের একজন এগিয়ে এসে সালাম জানালেন। দাদাও বেশ আনন্দের সাথে সালাম গ্রহণ করে জানতে চাইলেন--

  : কেমন আছো দাদা ভাই?

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। আপনি?

  : আল্হামদুলিল্লাহ্। তোমরা সবাই এসেছো নিশ্চয়ই।

  : জি। আমরা সবাই এসেছি। চলুন ঘরে গিয়ে বসি।

  : চল, যাই।

দাদা এবং নাতিন জামাই বাহির ঘরে গিয়ে বসে। অন্য নাতিন জামাইয়েরাও সেখানে আড্ডা দিচ্ছেন। দাদাকে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে সালাম জানালেন। দাদাও আনন্দের সাথে সকলের সালাম গ্রহণ করলেন। এবার সবাই একসাথে বসে পড়লেন মাদুর পাতা বিছানায়। শীতের পিঠাপুলিতে ভরপুর জামাইদের থালা-প্লেট। মুড়ি-মুড়কিও আছে সবার পাতেই। কেউ কেউ একটু আধটু করে মুখে পুড়ছে। কেউবা গল্প গুজবে মত্ত রয়েছেন। অনেকেই আবার দাদার আগমনের প্রত্যাশা করছেন। এমনই সময়ে দাদার আগমনে সবাই আনন্দিত বটেই। আবারো দাদার সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু করলেন গল্প। কেউবা হাসির গল্প বলছেন। কেউবা দ্বীনের আলোচনা শুরু করেছেন। এমনই এক পরিবেশে নাঈমের আগমন ঘটে। এই গ্রামেরই ছেলে নাঈম। বয়সে এখনও সে কিশোর। নবম শ্রেণীর ছাত্র নাঈম। একটি আদর্শ শিক্ষালয়ে পড়াশোনা করে সে। বরাবরই সে ভালো রেজাল্ট করে আসছে ছাত্রজীবনে। এ কারণে গ্রামের সবাই বেশ আদর করে ওকে। সকলেরই ভালোবাসার পাত্র নাঈম। দাদা মোকছেদ আলীও ওকে বেশ স্নেহ করেন। অন্যান্য আপন নাতিদের মতোই পাশে রাখার চেষ্টা করেন দাদা। ওর আগমনে দাদা যারপরনাই আনন্দিত। ওকে কাছে ডেকে পাশাপাশি বসান দাদা। ছাত্র হিসেবে অনেক ভালো হলেও আর্থিকভাবে ওরা স্বচ্ছল নয়। দিন আনে দিন খায় অবস্থায় চলে ওদের পারিবারিক সংসার জীবন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে নাঈম সবার বড়। দরিদ্র পিতা আইয়ুব আলী একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই ওদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে সারাটি সময়। তবুও ওর বাবা মানুষ করতে চায় নাঈমকে। সত্যিকারের আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান ওকে। নাঈম নিজেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রাণান্তকরণে।

সালাম জানিয়ে দাদার নির্দেশে দাদার পাশেই বসে পড়ে নাঈম। আবারো শুরু হয় নতুন করে গল্পের আড্ডা। সবাই দাদার সাথে গল্পে শামিল হয় একান্ত আপনার করে। জীবনের নানান বিষয় নিয়ে চলতে থাকে ওদের গল্প বলা। গল্পের এক সময় বড় নাতি জামাই আব্দুল আজিজ নাঈমকে কাছে ডাকেন। নাঈম তার পাশে এলে আদরের সুরে প্রশ্ন করেন--

  : তোমার নাম কি?

  : নাঈম।

  : কোথায় পড়াশোনা কর?

  : গাইবান্ধার আদর্শ শিক্ষালয়ে।

  : কোন শ্রেণীতে পড়?

  : নবম শ্রেণীতে।

  : তোমার রোল কত?

  : এক।

  : অষ্টম শ্রেণীতে রোল কত ছিলো?

  : এক।

  : পিএসসিতে রেজাল্ট কেমন ছিলো?

  : গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ।

  : কোন বিভাগের ছাত্র তুমি?

  : বাণিজ্য বিভাগের।

  : বিজ্ঞান বিভাগ নাওনি যে! 

  : ভালো একজন হিসাব কর্মকর্তা হতে চাই।

  : কেন?

অর্থনৈতিক লেনদেনে এখন চরম দুর্নীতি চলছে। হাজারো অসহায় পরিবার আজ দুর্নীতির কবলে নিমজ্জিত। বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারবারে চলছে হ-য-ব-র-ল পরিবেশ। এমতাবস্থায় সাধারণ জনগণ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ এবং জাতি। তাই অর্থনীতির লেনদেনের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের আদর্শ এবং চরিত্রবান হওয়া দরকার। আমি এক্ষেত্রে আদর্শ দিয়ে যতসামান্য হলেও ভূমিকা রাখতে চাই।

বেশ। তোমার প্রচেষ্টা সফল হোক। বললেন দাদা মোকছেদ আলী। দাদার দোয়ার সাথে আর বাকি চারজন একমত পোষন করলেন। তবে জাহিদ সাহেব একটু দ্বিমত পোষণ করে বললেন--

ক্ষমতা না থাকলে শুধু নৈতিকতা দিয়েই সবকিছু করা যায় না। সততার সাথে সক্ষমতারও দরকার আছে।

তার এ কথা শুনে এবার বাকিরাও একটু নড়েচড়ে বসলেন। কামাল সাহেব জাহিদ সাহেবের মতোই আগ বাড়িয়ে বললেন--

নৈতিকতায় বলিয়ান অনেক শক্তিশালী ব্যক্তিরাও অর্থের কাছে ধরাসায়ী হয়েছে। তাই আমি মনে করি এ বিষয় না নিয়ে অন্য কোন বিষয়ের ওপর দক্ষতা অর্জন করাই ভালো হবে। বিশেষ করে প্রশাসনিক ক্যাডারে সৎ, চরিত্রবান এবং যোগ্য লোকের দরকার খুব বেশি। তাই এ দিকটিতেও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। নাঈম এদিকে নজর দিতে পারে।

এবার কামাল সাহেবের সাথেও দ্বিমত পোষণ করলেন ইদ্রিস সাহেব। তিনি নিজের মতামত ব্যক্ত করে বললেন--

আইন ও বিচার বিভাগে আরো বেশি আদর্শবান লোকের দরকার। মেধাবী ও দূরদর্শী আইনজ্ঞ দরকার। দরকার ন্যায় বিচারক। সৎ, যোগ্য এবং সাহসী আইনজীবী দরকার। কারণ একজন আইনজীবীর যুক্তি তর্কের ওপর অনেক সময় বিচারকের রায় নির্ভর করে। যা ন্যায় বিচারের জন্য জরুরি এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমার মতে আইন বিভাগে পড়াশোনা করা ভালো হবে। আশা করি নাঈম বিষয়টিকে নিয়ে ভাবতে পারে।

অনেকের ন্যায় এবার ইদ্রিস সাহেবের মতের সাথেও দ্বিমত পোষন করলেন জুবায়ের সাহেব। তার মতে আদর্শবান শিক্ষকের এখন মারাত্মক আকাল চলছে। আদর্শ শিক্ষাগুরু না থাকার কারনে শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক জ্ঞান অর্জন হচ্ছে না। রক্ষক শিক্ষকেরা এখন ভক্ষকের ভুমিকা পালন করছেন। দুর্ঘটনা ঘটছে শিক্ষকের দ্বারা। তাই আদর্শবান শিক্ষকের দরকার। দরকার সৎ 'যোগ্য এবং মেধাবী শিক্ষকের। জাতিগঠনে যা অত্যন্ত জরুরি হয়েছে পড়েছে। তাই আমাদের সন্তানদেরকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য শিক্ষা ক্যাডারে পড়াশোনা করা দরকার। এ সেক্টরে ভালো এবং সৎ ও চরিত্রবান লোক প্রয়োজন। পারলে নাঈম এ বিষয়ের প্রতি নজর দিতে পারে। মানুষ গড়ার কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক সমাজ। এটাই আমার মত।

বরাবরের মতোই জুবায়ের সাহেবের সাথেও একমত হতে পারলেন না আমিন সাহেব। তার মতে আদর্শবান চিকিৎসক দরকার। দরকার সৎ, যোগ্য এবং মেধাবী চিকিৎসকের। বেশি সংখ্যক চিকিৎসকেরা এখন সেবাদানের পরিবর্তে রক্তচোষার ভুমিকা পালন করছেন। সেবার নামে রোগীদের চুষে খাচ্ছেন তারা। কেউবা ভুল চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে ভালো চিকিৎসা পান না গরিবেরা। সময়মতো সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক দরিদ্র অসহায় লোকজন অকালে মৃত্যুবরণ করছেন। তাই আদর্শবান চিকিৎসক দরকার। মেধাবী নাঈম এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। আমরা নাঈমদের মতো এমন সৎ চিন্তাশীল ছেলেদের কাছ থেকে এমনটাই আশা করি। এভাবে সবাই যার যার মতো করে মতামত পেশ করলেন। সকলের কথাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো নাঈম। কারো কথার কোন প্রতিউত্তর করেনি সে। একান্ত আপনার করে শুনে যাচ্ছিল নাঈম। এবার নাঈম বিদায় চাইছে বাড়িতে যাবে বলে। ওকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে যাওয়া দরকার। ওর হাতে সময় খুবই কম। ওর বাড়িতে যাবার কথা শুনে দাদা ভাই একটু ধমকের শুরে বললেন--

আমাদের এসব কথা তোমার ভালো লাগছেনা বুঝি নাঈম? 

  : না। তা নয় দাদা ভাই।

  : তবে কি তাহলে? বললেন দাদা।

  : বাড়িতে জরুরি কাজ আছে তাই। বলল নাঈম।

  : কি কাজ। জানতে চাইলেন দাদা।

নাঈম বলতে শুরু করল--

এখন শীতকাল। তাই শীতের লেপ তোষক নেয়ার জন্য বাড়িতে এসেছি। আগামীকাল আবার আমাকে চলে যেতে হবে স্কুলে। তাই প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। এছাড়া আর তেমন কিছু নয় দাদা ভাই।

  : ও, আচ্ছা। ঠিক আছে। তাহলে আমাদের সাথে নাস্তা খেয়ে তুমি চলে যেও। বললেন দাদা।

দাদার কথামতো নাস্তা খাবার পালা শেষ করা হলো। সবাই এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। নাঈমও নিজের করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

এখন চলে যাবার পালা নাঈমের। সবার সাথে কুশল বিনিময় করে বাড়ি ফিরছে নাঈম। ক্রমাগত বাড়ির পানে এগিয়ে চলছে সে। নাঈম ভাবছে একান্ত আপনার করে। ভাবছে বড়দের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। সময়ের দাবির আলোকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দেশ ও জাতির চাহিদা নিয়ে। নাঈম এখন আর বুঝতে পারছে না তাকে কি করতে হবে। নাঈম সিদ্ধান্ত নিতে হিমসিম খাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না তাকে কোন যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি। নাঈম ভাবছে একান্ত আপন করে। ভাবনার নীল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে নাঈম। নাঈম হৃদয়ের একান্ত অনুভূতি দিয়ে এসব ভাবছে। নাঈমের এ ভাবনা হোক দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য। ওর সিদ্ধান্ত হোক মানবতার মুক্তির জন্য। সুন্দর একটি সমাজ বিনির্মাণে নাঈম এগিয়ে যাক ক্রমাগত সামনে। বিজয়ের মঞ্জিল পানে। সফলতার দ্বারপ্রান্তে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ