বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজনীতির জোট জোটের রাজনীতি

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : গণতান্ত্রিক রাজনীতির ময়দানে ক্ষমতার পালাবদলের হাতিয়ার হিসেবে জোটের রাজনীতি বা রাজনীতিতে জোটবদ্ধ হওয়া আজ কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও এমনটি দেখা যায়। তবে দীর্ঘদিন যাবত চলে আসা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে জোটের রাজনীতি যেমন আলোচনার শীর্ষে, তেমনি এ ব্যবস্থা আজ মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। একটি আদর্শিক, গঠনমূলক ও দেশপ্রেমিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর জন্য এ জোট ব্যবস্থা একটি মারাত্মক বিপদ হিসেবেই আবির্ভূত হয়। আজ সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে যে, জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে যে লাভবান হয়েছে তার চেয়ে বেশি লাভবান হতে পারতো একলা চলো নীতিতে চললে। মরহুম জামায়াত আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন যখন থেকে জামায়াত বিএনপি’র সাথে জোট করেছে এরপর থেকেই জামায়াতের প্রতি আওয়ামী লীগের চরম শত্রুতা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ দেখেছে বিএনপি-জামায়াত একত্রিতভাবে নির্বাচন করলে জাতীয় ও স্থানীয় কোন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারে না।” মরহুম নেতার উপযুক্ত বক্তব্য চরম সত্য ও সময়োপযোগীই বটে। তিনি আরো বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের জোট ভাঙার জন্য আওয়ামী লীগ সব ধরনের চেষ্টা করছে। মরহুম নেতার কথার সত্যতা আমরা দেখতে পেয়েছি। জামায়াতের সকল শীর্ষ নেতাকে কেবলই রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছে। জেলখানায় আর সেফ হোমে তাদের উপর যত মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে তা কেবলই বিএনপি থেকে সরে আসার জন্য। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল যে, তিনি যেন জামায়াত ছেড়ে অন্য একটি দল করেন তবেই তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। তিনি সিংহের মতো বলে দিয়েছেন আমি আমার বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। অন্যসব মহান নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে চলে গিয়েছেন। বাতিলের ফাঁসীর মঞ্চটাকে খেলার মাঠ মনে করে তুচ্ছভাবে গ্রহণ করেছেন। লাখ লাখ নেতাকর্মীকে কাঁদিয়ে তারা চলে গেলেন তাদের মহান পরওয়ার দিগারের নিকট। বড়ই ব্যথা-বেদনা আর ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আজকের এ লেখা লিখতে বসেছি। একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জামায়াতকর্মী ইঞ্জিনিয়ার আহমদ আলী সুমন আমাকে বললেন আমরা বড়ই ব্যথিত, জামায়াত কেন বিএনপি’র সাথে জোটে থেকে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় না। কিসের হীনমন্যতা, কিসের দুর্বলতা। এত ত্যাগ স্বীকার করার পরও কেবল ভোটের ময়দানে বিএনপি’র ভোটবাক্স ভরে দিতে হবে? বিএনপি কি করেছে জামায়াতের জন্য? এসব কথা থেকেই আজ আমার এ লেখা, প্রকৃত পক্ষেই জামায়াত নেতৃবৃন্দকে আজ ভাবতে হবে বিএনপি যে সিদ্ধান্ত নিবে কেবল তাই মাথা পেতে নিতে হবে, এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে আমাদের মতো সাধারণ সমর্থক আজ জামায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কারণ বিএনপি যেভাবে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে তা আপত্তিকর। যেমন রংপুর সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বাছাই ছিলো একটি অদক্ষতার প্রমাণ। আজ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাবিত আউয়ালের মতো অরাজনৈতিক ও কাঁচা মাল নিয়ে বৈতরণী পার হতে চায়। এখানে জামায়াতের যে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে তিনি জামায়াতের কেবল শীর্ষ নেতাই নন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন এবং মাঠ কাঁপানো লড়াকু সৈনিক ছিলেন। অত্যন্ত দক্ষ, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তাশীল ও রাজনীতিবদ জনাব মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তাকে প্রার্থী ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং ঢাকা শহরে যে নির্বাচনী উৎসব দেখা যাচ্ছে এতে বোঝা যায় নিঃসন্দেহে তাবিত আওয়াল থেকে জনাব সেলিম উদ্দিন বেশি ভোট পাবেন তাতে সন্দেহের অবাকশ নেই। যদি জামায়াত এ পথ থেকে ফিরে আসে বা জোট রক্ষা করতে গিয়ে সেলিম উদ্দিনের মতো লোককে উঠিয়ে নেয় তা হবে নিতান্তই আত্মঘাতী। সকল নেতাকর্মীর মনে একটি প্রশ্নÑ কেন আমরা এতটা ছাড় দেব? আমাদের হারানোর তো কিছুই নেই। সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আরেক সংগ্রামী নেতা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের তিনিও মেয়র প্রার্থী এবং সিলেটের একজন অতীব জনপ্রিয় নেতা। তার সামনে রাজনীতি করার মতো নেতার অভাব। তবে কেন এ সব দিগি¦জয়ী নেতাকে বাদ দিয়ে বিএনপি’র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে?
এটাই মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের জন্য জনাব সিদ্দিকুর রহমানকে বাছাই করা হয়েছে এবং তিনিও কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছেন। শোনা যায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী গাজীপুর মহানগরীরর জামায়াতে আমীর প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রিন্সিপাল মাওলানা এসএম সানাহউল্লাহ্র প্রার্থিতাও চূড়ান্ত। হাস্যোজ্জ্বল ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের সাথে ভোটযুদ্ধে ময়দানে টিকতে হলে যে মানের নেতা দরকার বিএনপিতে তা লক্ষ্য করা যায় না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয় ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত নেতাকর্মীদের উপর যেভাবে নির্যাতন শুরু হয় ঠিক সে সময়ই গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী জনাব হোসেন আলী প্রায় ৪০ হাজার ভোট পান যখন তার পক্ষে প্রকাশ্যে কোন প্রচারণা চালানো যায়নি। এরপর আজ পর্যন্ত একটি যুগ পেরিয়ে যাওয়ার পর জামায়াতের কাজ যে কি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। টঙ্গী থানার জামায়াত নেতা জনাব নজরুল ইসলামের সাথে আলাপ হলে তিনি বলেন নির্যাতন আর রাজনৈতিক হয়রানির মধ্যেও আমাদের কাজ বৃদ্ধি  পেয়েছে জ্যামিতিক হারে অতএব গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আমরা খুবই ভালো ফলাফল করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। তাই বলা যায় আজ দেশের সর্বত্র সাধারণ মানুষ জামায়াতের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত কেবল একটু পরিবেশ দরকার। কি সরকার কি বিএনপির মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কিছু প্রতিক্রিয়াশীল নেতা যাদের মূল্যায়নে জামায়াত মঙ্গল গ্রহে নির্বাসিত। তাদের উদ্দেশ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেল স্টার জলসায় একটি নাটকের সংলাপের অংশ তুলে ধরতে চাই। ‘রাজ পরিবারে মেঝো বউ অত্যন্ত মেধাবী ও সৎ হওয়ায় সকলেই বুঝতে পেরেছে এ নারীর গর্ভের সন্তানই হবে পরবর্তী রাজা। তাই সকল বউ মিলে তাকে হিংসা করা শুরু করে দিলো এবং স্বর্ণচুরির অপবাদ দিয়ে রাজ পরিবার থেকে বের করে দিলো। যাওয়ার সময় সে নারী বললো আমাকে নিয়ে আমি ভাবছিনে এবং আমি অপমানিতও বোধ করছিনে, আমি বরং ভাবছি সত্যটা যখন প্রমাণিত হবে তখন আপনারা আমার সামনে মুখ দেখাবেন কিভাবে। প্রিয় পাঠক মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যারা ধর্ষণকারী বলে নির্লজ্জের মতো বেহায়ার মতো- বুলি আওড়িয়ে গিয়েছে তাদের অবস্থা কি হবে সেটাই ভাবছি। মনে হয় বর্তমানে জামায়াত নেতৃবৃন্দ জনগণের সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারছেন না। প্রকৃতপক্ষে আজ জনগণের মধ্যে জামায়াত প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান সাহেবদের প্রতি যে ভালবাসা ছিলো সাধারণ মানুষ তা প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত। আর এটা যখন প্রমাণিত হবে তখন চাকা উল্টো দিকে ঘুরা শুরু করবে। ঠিক তখনই চক্রান্তকারী আর ভীনদেশীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীদের আসল চেহারা ফুটে উঠবে।
তখন যে ঐ সব পরগাছারা কিভাবে জনগণের সামনে মুখ দেখাবে তাই ভাববার বিষয়। মনে রাখতে হবে একটি সত্যনিষ্ঠ ও আদর্শিক সংগঠনকে কখনই চক্রান্ত করে ধ্বংস করা যায় না কেবল হয়রানি করা যায় মাত্র। রাজনীতিবিদগণ অত্যন্ত পরিকল্পিত ও চিন্তাশীলতার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। তবে সব সময় যে সব সিদ্ধান্ত সঠিক হয় এমনটিও নয়। জনগণের মনের কথা অনেক সময় বুঝা যায় না। তাই জামায়াতকে আজ ভাবতে হবে বিএনপির সাথে থাকলে কি আর না থাকলেই বা কি? বিগত দিনে জোটের কারণে লাভ হয়েছে বিএনপির। কারণ কোথাও প্রার্থী ঘোষণা করলে জামায়াত নেতাকর্মীরা শতভাগ চেষ্টা করে বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করেছে আর বিএনপির একজন বিদ্রোহী দাঁড়িয়ে গেছে জামায়াত এর বিপক্ষে। কেবল তাই নয় যেখানে জামায়াত প্রার্থী জোটের প্রার্থী হয়েছে সেখানে বিএনপির প্রার্থী জামায়াত নেতার মৃত্যু কামনা করে দোয়া করেছে। কেন জামায়াতের এত হিনম্মন্যতা তা আমরা বুঝতে পারি না। এবার যে যোগ্য ও উদয়মান নেতাদেরকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্ধারণ করেছে জামায়াত এটা একটা সময়োপযোগী কাজ হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করি জামায়াত সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে এবং সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। জোট রক্ষা করার জন্য চাঁপাই নবাবগঞ্জের অতীব জনপ্রিয় নেতা জনাব লতিফুর রহমান যার রায় ছিনিয়ে নেয়ার পর জনগণের প্রতিবাদের মুখে আবার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এক সময়ের ভোট কাটায় চ্যাম্পিয়ন জনাব এরশাদ সাহেব। সেই লতিফুর রহমানের মতো ক্যারিশমাটিক নেতাকেও বলি দিতে হয়েছে, কেবলই জোট রক্ষার জন্য। সেলিম উদ্দিনদের মতো সিংহ পুরুষদের বেলায় যেনো এমনটি না ঘটে তাই নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা। এমনটি যেনো না ঘটে সুদর্শন নেতা এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের-এর বেলায়ও এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ