বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রগতির ট্রেনটা ঠিক পথে চলছে কী?

একটি দেশের রাজধানী তো সবদিক থেকে উন্নত ও আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। কিন্তু এ কেমন রাজধানী? রাজধানী নিয়ে পত্রিকায় শিরোনাম হয়, ‘সমস্যার বেড়াজালে রাজধানী।’ ২০ জানুয়ারি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, হাজারো সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকার জনগণ। ওয়াসার পানির পাইপ দিয়ে বের হয় ময়লা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি। জার আর বোতলের পানিতে ভেসে বেড়ায় মলের জীবাণু। দিনভর গ্যাসের তীব্র সংকটে জ্বলছে না রান্নার চুলা। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর উন্নয়ন কাজে ধূলিময় বাতাসে অন্ধকার চারপাশ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তীব্র হচ্ছে যানজটের মাত্রা। ধূলিময় বাতাস আর কালো ধোঁয়ায় বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। সমস্যার বেড়াজালে জড়িয়ে গেছে রাজধানীবাসীর জীবন ও জীবিকা।
এমন প্রতিবেদনে রাজধানীবাসীর জন্য কোনো সুখবর নেই। যে সব দুর্ভোগের মধ্যে এখন রাজধানীবাসীর বসবাস, তাতে তাদের জন্য প্রয়োজন অনেক অনেক সুখবর। কিন্তু তেমন কোনো আলামত তো দেখা যাচ্ছে না।  জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাবে নাগরিকদের মনে আশাবাদের বদলে বরং হতাশার মাত্রাই বাড়ছে। প্রশ্নজাগে, রাজধানীবাসীর সমস্যাগুলোর সমাধান কি কোনো অসম্ভব বিষয়? এই প্রসঙ্গে নগরবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। ঢাকার চারপাশের চারটি নদীকে দূষিত করে এখন সেই পানি আবার পরিশোধন করা হচ্ছে। ঢাকাসহ পুরো দেশকে নিয়ে মহাপরিকল্পনা করতে হবে।
এমন বক্তব্যের সাথে একমত হওয়া যায়। তবে প্রশ্ন জাগে, রাজধানীবাসীর দুর্ভোগের বিষয়গুলোর সাথে তো জড়িয়ে আছে বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তারা। কিন্তু তাদের কর্মক্ষম করা যাচ্ছে না কেন? কিছু সমস্যা প্রসঙ্গে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, অহেতুক জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু কাজ করলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে। এগুলোতে তেমন বিনিয়োগ লাগে না, শুধু ইচ্ছার প্রয়োজন। এমন বক্তব্যে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের জন্য বার্তা রয়েছে। এই ‘ইচ্ছা’ শুধু ব্যক্তির মর্জির ইচ্ছা নয়, এর সাথে জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রের সংবিধান, দায়িত্বের শর্ত, শপথ ও নৈতিকতার বিষয়গুলোও।
বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রাই শুধু বাড়ছে না, আমাদের মনোজগতের দূষণও ভয়ংকর। সমাজে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে সাথে সামাজিক দায়িত্ব ও সৌজন্যতাবোধও যেন লুপ্ত হতে চলেছে। এ কারণেই হয়তো বিকট শব্দে গান বাজাতে নিষেধ করায় এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করার কাজটি সম্পন্ন হতে পারলো এই সমাজে। গত ২০ জানুয়ারি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, রাজধানীর ওয়ারিতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে বিকট শব্দে গান বাজাতে নিষেধ করায় নাজিমুল হক (৬৫) নামে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে ওয়ারির ৪৪ নং রামকৃষ্ণ মিশন রোডের সি-৮ নম্বর বাসায় এই হত্যাকা- ঘটে। ময়না তদন্তের জন্য বৃদ্ধের লাশ মিটফোর্ড হাসপাতালে মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহতের ছেলে নাসিমুল হক জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের ভবনের ছাদে পাশের ফ্ল্যাটের মালিক এবং এপার্টমেন্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন তার এক আত্মীয়ের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করছিলেন। এপার্টমেন্ট সমিতির নিয়ম অনুযায়ী রাত ১২টার পর অনুষ্ঠান করা নিষেধ। অথচ সেদিন রাত ১টায়ও উচ্চশব্দে গান বাজানো হচ্ছিল। নিহত নাজিমুল হক হার্ট ও কিডনি রোগে আক্রান্ত থাকায় ছাদে গিয়ে গান বন্ধ করতে বলেন। তখন গান বন্ধ করে কিছু লোক নাজিমুল হকের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এরপর শুক্রবার সকাল ১১টায় ভবনের কেয়ারটেকার দিয়ে আলতাফ হোসেন বৃদ্ধ নাজিমুল হক ও তার স্ত্রীকে ডেকে পাঠান। তারা নিচে গেলে আলতাফ হোসেন, হৃদয়, সজিব ও ৩ নারীসহ সাতজন নাজিমুল হককে মারধর করে। পরে গুরুতর অবস্থায় আজগর আলী হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওয়ারি থানার এসআই হারুন-অর-রশিদ জানান, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আর অভিযোগ পাওয়ার পর পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আশা করছি হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এপার্টমেন্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনের প্রহারে নিহত হলেন এপার্টমেন্টের এক বৃদ্ধ বাসিন্দা। এ কেমন সমাজ আমাদের? সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বতো সমিতির নিয়ম-কানুন রক্ষা করা, সদস্যদের নিরাপদ রাখা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেল উল্টো চিত্র। সাধারণ সম্পাদক শুধু যে নিয়ম লঙ্ঘন করলেন তা নয়, তিনি স্বয়ং মাস্তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মানুষ হত্যা করলেন। নিষ্ঠুর এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি সমাজের মানুষের কাম্য।
সমাজের বহু মানুষের কা-জ্ঞান যেন লোপ পেতে বসেছে। শুধু গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে নয়; এলাকাভিত্তিক ক্লাবের নানা অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে, এমনকি ওয়াজ মাহফিলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতি উচ্চশব্দে মাইক বাজানো হয়। ‘শব্দদূষণ’ নামক শব্দটি যেন তাদের অবগতির মধ্যে নেই। অথচ নাগরিকদের তো জানা থাকার কথা যে, আবাসিক এলাকায় উচ্চস্বরে গান বা মাইক বাজানো যায় না। আর শব্দদূষণের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করা তো বড় ধরনের অপরাধ। এ বিষয়কে যারা অবজ্ঞা করে বেপরোয়া মনোভাব প্রদর্শন করবে তাদেরতো আইনের আওতায় আনা উচিত। যারা উৎসব করবে, অনুষ্ঠান করবে তাদের এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে যে, সমাজের অন্য মানুষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকতে পারে, অনেকে অসুস্থ থাকতে পারেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা শব্দদূষণ কীভাবে সহ্য করবেন? আর ওরা মাইকের বদলে সীমিত সাউন্ডবক্স ব্যবহার করলেও তো পারেন। সমাজের মানুষদের তো পরিমিতি বোধের পরিচয় দিতে হয়। আমরা কি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবো?
ভুলের দৌরাত্ম্য শুধু রাজনীতি, প্রশাসন ও সমাজেই চলছেনা; বিজ্ঞানের জগতেও লক্ষ্য করা যায় বড় বড় ভুল।  প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস রবার্ট ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল বলে দাবি করেছেন ভারতের এক মন্ত্রী। ২১ জানুয়ারি ভারতের এনডিটিভি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, স্কুল ও কলেজের টেক্সটবুক থেকে এই তত্ত্বটি সরানো দরকার বলে মন্তব্য করেছেন জুনিয়র শিক্ষামন্ত্রী সত্যপাল সিং। তিনি আরো বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা কোথাও উল্লেখ করেননি যে, তারা একটি বনমানুষকে (শিম্পাঞ্জি) মনুষ্য সন্তানে রূপান্তরিত হতে দেখেছেন। পৃথিবীতে মানুষ আসার পর থেকে তারা সবসময় মানুষই ছিল।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, একথা কিন্তু মন্ত্রী সত্যপাল সিং প্রথম বলেননি। বহু আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা তার এই তত্ত্বকে নিছক কল্পনা হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে আমরা Lauis pasteur, Alexander oparin, Jeffrey Bada, Fred Hoyle Ges william Philip, Christian Anfinsen, Charles Townes, Weghner, Alexander Flemming সহ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বহু বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করতে পারি- যারা ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে ভুল মনে করতেন। ডারউইন নিজেও তার মূল থিসিসে বর্ণনা করে গেছেন যে, যদি কোনো Intermediate Fossil না পাওয়া যায়, তবে তার তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হবে। তিনি ধারণা করতেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীরা তার ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করতে পারবে। পরবর্তীতে বিবর্তনবাদীরা প্রায় ১৪০ বছর ধরে Geological Layers-এ অনুসন্ধান চালান। কিন্তু তারা Intermediate Fossil আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। বরং তারা দেখতে পান ‘Missing Fossil’ অর্থাৎ তারা Link খুঁজে পাননি। ফলে ডারউইন বিবর্তনের ধারায় এককোষী প্রাণী থেকে শিম্পাঞ্জি হয়ে মানব অস্তিত্বের যে তত্ত্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়টি এখন কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আমরা মনে করি, ভারতের মন্ত্রী টেক্সটবুক থেকে বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি বাদ দেয়ার যে প্রস্তাব করেছেন তা যথার্থ হয়েছে। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগুলোতে তো প্রথম মানুষ হিসেবে হযরত আদম (আ:)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর তিনি তো কোনো এককোষী প্রাণী বা শিম্পাঞ্জি থেকে উদ্ভূত হননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ