শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সমস্যার মুখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম সমস্যার মুখে তো পড়েছেই, বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তারও সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিডোতে দু’দেশের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন তিনশ’ জন রোহিঙ্গাকে ফেরৎ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কথা ছিল, ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা হবে। গণহত্যা, গণধর্ষণ, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া এবং ভূমি থেকে উৎখাতসহ নানামুখী ভয়ংকর নির্যাতনের মুখে এই রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। গত বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের আসা শুরু হওয়ার পর ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে আসে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘও তৎপর হয়ে ওঠে। মূলত চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগের হুমকির কারণে জাতিসংঘের উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসতে এবং চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক না হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমার যথারীতি কালক্ষেপণের কৌশল নিয়ে এগিয়ে চলেছে। একটি শর্তে দেশটি বলেছে, ব্যক্তি হিসেবে নয় বরং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে পরিবার হিসেবে। এই শর্তের কারণে শুরুতেই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যতো তালিকা করেছে সে সব তালিকায় ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার চাচ্ছে পরিবারের তালিকা। এটা করতে হলে বাংলাদেশকে নতুন করে তালিকা তৈরি করতে হবে, যা সকল বিচারেই অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু সব জেনেবুঝেও মিয়ানমার তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে রাজি হয়নি। মিয়ানমার বলেছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো রোহিঙ্গাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রথমে রাখাইনের মংড়ুর লা পো খুংয়েতে স্থাপন করা দুটি অস্থায়ী অভ্যর্থনা শিবিরে নেয়া হবে। মংডুর অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে আরো এক দফা যাচাই-বাছাই করে কাগজপত্র সন্তোষজনক মনে হলে রোহিঙ্গাদের চিনিয়ে দেয়া স্থানগুলোতে সরকারি খরচে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
শুনতে সহজ মনে হলেও মিয়ানমারের শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া এবং রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানোর জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। আর সে কারণেই ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হতে পারেনি। সম্ভাবনা সম্পর্কে জানার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী আগেরদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি দেশগুলোর প্রতি মিয়ানমারের ওপর প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চাপ অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়েছেন। এর অর্থ, চুক্তি স্বাক্ষর করলেও সরকার মিয়ানমারকে আস্থায় নিতে পারছে না। কারণ, যে কোনো সময় দেশটি কথার বরখেলাপ করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও একই আশংকা প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মিয়ানমারের অতীত রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ এবং সে কারণে দেশটি অনির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করে গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ থেকে ফেরৎ পাঠানোর পর রোহিঙ্গারা নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার পাশাপশি প্রচন্ড খাদ্যাভাবেও পড়তে পারে। এমন ধারণা ও মন্তব্যের কারণ জানাতে গিয়ে ২০১২ সালে জাতিগত নিধনের শিকার হওয়া এক লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বর্তমান অবস্থার কথা উল্লেখ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি বলেছে, ২০১২ সাল থেকে এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে রাখাইন প্রদেশের বিভিন্ন অস্থায়ী শিবিরে রাখা হয়েছে। তাদের না দেয়া হয়েছে স্থায়ী কোনো আবাস, না তারা জীবিকার জন্য কোনো চাকরি বা কাজ পেয়েছে।
অতীতের এই মন্দ ও অমানবিক রেকর্ডের কারণেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, নিরাপত্তা ও চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা পাওয়ার আগে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠানোর কার্যক্রম উল্টো বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। যারা প্রত্যাবাসিত হবে তারা কোথায় থাকবে, তাদের জীবিকার জন্য কোন ধরনের ব্যবস্থা করা হবে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির সঙ্গে জীবনের বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তার আয়োজন করা হবে কি না- এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় ব্যবস্থা না নিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানো হলে মিয়ানমারে যাওয়ার পর তারা বন্দী শিবিরের অধিবাসী হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তা ব্যাড অ্যাডামস বিবিসিকে বলেছেন, অতীত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নতুন চুক্তিসহ সব লক্ষণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মিয়ানমার যেসব আশ্রয় শিবিরের পরিকল্পনা করেছে সেগুলো হবে রোহিঙ্গাদের জন্য খোলা আকাশের নিচে কারাগার। এ ধরনের প্রায় নিশ্চিত ভীতি ও আশংকার কারণেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম স্থগিত করা।
সময়ক্ষেপণের জন্য শর্তের পর শর্ত চাপানোসহ মিয়ানমারের নানা ধরনের কূটকৌশলের কারণে আমরাও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণ, মন্তব্য ও পরামর্শকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বিভিন্ন অজুহাত উপস্থিত করে মিয়ানমার যেহেতু নেপিডো চুক্তি অনুসারে ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হতে দেয়নি, সেহেতু বাংলাদেশেরও সমগ্র বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১২ সাল থেকে আশ্রয় শিবিরে থাকা এক লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে যে তথ্যের উল্লেখ করেছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে। সব মিলিয়েই সরকারের উচিত প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের সঙ্গে বিশেষ করে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনকে যুক্ত রাখা এবং এর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করা। এজন্য প্রয়োজনে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে, কিন্তু প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে কোনোক্রমেই আশ্রয় শিবিরের নামে খোলা আকাশের নিচে তৈরি করা কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ