শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

চলচ্চিত্র শিল্প সংকট ও সম্ভাবনা

নূরুল আনাম মিঠু : নানান তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ সত্ত্বেও একথা পরিষ্কার যে চলচ্চিত্র শিল্প আজ গভীরতর সংকটের মধ্যে রয়েছে। এতেও হয়তো পরিস্থিতির ভয়াবহতার সবটা বোঝানো যাবে না। বলা চলে সংস্কৃতি ক্ষেত্রের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটি গভীর খাদে পড়ে গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে সাম্প্রতিককালে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তনের সেগুলো হলো- যথাক্রমে: (১) বেসরকারি বাণিজ্যিক টিভি চ্যানেলের আত্মপ্রকাশ।
(২) মূলধারার চলচ্চিত্রের গুণগতমানের ক্রমান্বয়িক অবনতি।
(৩) গ্রুপ থিয়েটার ভিত্তিক মঞ্চ নাটকের স্থবিরতা।
(৪) নানাবিধ বৈদেশিক চ্যানেলের উপস্থিতি এবং ডিভিটি/ভিসিডি ফরম্যাটে বিদেশি চলচ্চিত্রের সহজলভ্যতা ও আগ্রাসন। এর সিংহভাগই অবশ্য ভারতীয় এবং তা গ্রাস করেছে মূলত শহুরে শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদেরকে।
(৫) বিকল্প ধারার নির্মাতা হিসাবে পরিচিত দুই-একজনের নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চিত্র ঢাকার দুই/একটা প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রদর্শন।
(৬) নতুন ভিডিও টেকনোলজি, ডিডি প্রযুক্তি বা কম্পিউটার ভিত্তিক সম্পাদনার সহজলভ্যতা।
উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের প্রসার ও বিকাশে কতটা সহায়ক হয়েছে বা কতটাই বা বিকল্প ধারার প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা গভীরভাবে ভেবে দেখাও জরুরি হয়ে উঠেছে। হাল আমলে মুক্ত বাজারের হাত ধরে বাণিজ্যিক বেসকারি টিভি চ্যানেলের আত্মপ্রকাশ একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এর প্রভাব দৃশ্যমান সংস্কৃতিতে বটেই এমনকি বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রেও অনুভূত হচ্ছে। এক সাথে এতগুলো চ্যানেলের আত্মপ্রকাশের কারণে ইতিবাচক যে ঘটনাটি তা হলো উল্লেখযোগ্য তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। যেকোন আর্থ-সাংস্কৃতিক বিচারেই এটি একটি ইতিবাচক দিক। অবশ্য এই চ্যানেলগুলোর বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ কাজে যারা নিয়োজিত তাদের সিংহভাগেরই এক ধরনের কাজের কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। এই প্রয়োজন মেটাতে নতুন চাকুরেদের কর্ম সময়ের পুরোটাই ব্যয় করতে হয়। টিভি চ্যানেলগুলো পুরো ২৪ ঘণ্টাই চলমান। কিন্তু এত কিছুর পরও বিকল্প ধারার কর্মীরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের কর্মকা- বজায় রাখার। অন্যদিকে টিভি কেন্দ্রিক একটি জনপ্রিয় ধারা। স্বাভাবিক নিয়মেই নির্মাতাদের সিংহভাগই এর সাথে যুক্ত। কিন্তু এই নির্মাণ কাজের সাথে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনযাপনের সংগ্রাম, তাদের বেঁচে থাকার ভালোমন্দ, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনের সাথে যুক্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থার বাস্তব চিত্র অনুপস্থিত। তবে একথাও সত্য যে, টিভি কেন্দ্রিক কাজেরও এক ধরনের সুবিধা রয়েছে। যেমন শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে এক ধরনের পরিচিত লাভ কিছুটা হলেও আর্থিক স্বাচ্ছন্দের সম্ভাবনা ইত্যাদি।
যারা এর সাথে যুক্ত হচ্ছেন তারা হয়তো নিশ্চিন্তভাবেই  বিকল্প চলচ্চিত্রের বিকাশের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন। এছাড়াও রয়েছে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণে অস্বচ্ছতা ও মতপার্থক্য। যেহেতু ৩৫ মি.মি. চলচ্চিত্র তৈরি ও প্রদর্শন সম্পূর্ণই আজ মুনাফা শিকারীদের নিয়ন্ত্রণে। সে কারণেই কম ব্যয় সাপেক্ষ ১৬ মি.মি. ফরম্যাটের নির্বাচন এবং এই ফরম্যাটের ছবির প্রদর্শনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে প্রচলিত সিনেমা হলের পরিবর্তে অন্যান্য হল ও মঞ্চকে প্রেক্ষাগৃহ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রদর্শন জরুরী। তবে যে বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো চলচ্চিত্র মাধ্যমটি সম্পর্কে এই আন্দোলনের সাথে যুক্তদের শৈল্পিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি যা এই ধারার কাজকে বাণিজ্যিক ধারা থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
এখানে শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ যেমন লক্ষ্য, ঠিক তেমনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও আবেগ অনভূতির শৈল্পিক প্রকাশও এর সমান লক্ষ্য। সেই সাথে ব্যক্তি মানুষের একান্ত অনুভূতি ও মনঃস্তত্ত্ব¡, মহিলাদের নানাবিধ সমস্যা, ক্ষুদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সমস্যার প্রতিও নজর দেয়া ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রধান লক্ষ্য ও কর্তব্য।
এটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। আর তাহলো (১) চলচ্চিত্র নির্মাণ (২) প্রচলিত সেন্সর ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতির সংশোধন এবং একে জনজীবন ও যুগোপযোগী করে তোলা। (৩) প্রচলিত সিনেমা হলে বিকল্প ও শৈল্পিক মানসম্পন্ন চলচ্চিত্রের প্রদর্শন এবং সেই সাথে এ যাবতকাল ধরে চলা বিকল্প চলচ্চিত্রের প্রদর্শন ব্যবস্থা জোরদার ও বিস্তত করা।
(৪) শুধুমাত্র সরকার ও অনুদানের উপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করা।
(৫) বিদেশি অনুদান নির্ভরতা/যা প্রায়শই সমাজবাদী সম্প্রসারণবাদী প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার (কমিয়ে সমবায়ী নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ।
(৬) শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে দেশব্যাপী নির্মাণ ও প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ