শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বৃটেনে একাকিত্ব বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা প্রসঙ্গে

সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি খবর সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। খবরটি চমকপ্রদ। এতে বলা হয়েছে যে, বৃটেন তথা যুক্তরাজ্যে একাকিত্ব এক গুরুতর সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে খ্যাতনামা এই ম্যাগানিজে বলা হয় যে, দেশটির প্রায় এক কোটি মানুষ নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। জনদুর্ভোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশটির সরকার এক্ষেত্রে জনগণকে সহায়তা করার জন্য একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করেছেন। টাইম সাময়িকীর রিপোর্টে বলা হয় যে, গত ১৭ জানুয়ারী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নতুন এই মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বহু মানুষের ক্ষেত্রেই আধুনিক জীবনের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো নিঃসঙ্গতা। এই চ্যালেঞ্জ আমি চিহ্নিত করে মোকাবিলা করতে চাই।” তিনি জানান, তার সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া ও নাগরিক সমাজ বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ট্রেসি ক্রোচকে নবগঠিত একাকিত্ব বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাজ্যের জো কক্স কমিশন অন লোননিনেস-এর ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, দেশটির ৯০ লাখের বেশি মানুষ হয় সব সময় নতুবা প্রায়ই নিঃসঙ্গতা বোধ করে। আবার দেশটির সরকার পরিচালিত এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী সেখানে দুই লক্ষাধিক প্রাপ্ত বয়স্ক আছেন যাদের বন্ধু বা স্বজন থাকলেও এক মাস/দুই মাসেও তাদের সাথে একবার কথা হয় না। যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংগঠন Age UK-এর মুখ্য কর্মকর্তা মার্ক রবিনসনের মতে, একাকিত্ব এমন একটি সমস্যা যা মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। খবরটি অত্যন্ত ছোট্ট কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক বড়। থেরেসা মে এর নেতৃত্বাধীন যুক্তরাজ্য সরকার সে দেশের জনগণের একাংশের একটি মনস্তাত্মিক সমস্যা সমাধানের জন্য এত উদগ্রীব যে, বিষয়টি দেখাশোনার জন্য তারা পূর্ণাঙ্গ একটি মন্ত্রণালয়ই গঠন করে ফেলেছেন। ৯০ লাখ বা এক কোটি লোক সে দেশের মোট জনসংখ্যার ১২/১৩ পার্সেন্ট মাত্র। জনগণের এই ক্ষুদ্র অংশের একাকিত্ব দূর করার জন্য সরকার কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা আমি জানিনা তবে বিষয়টি যে তাদের তথা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তারা তাদের সাহায্য করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, এ জন্য থেরেসা মে’র সরকার ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। তারা প্রমাণ করেছেন যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, জনগণের সমস্যাবলী চিহ্নিত করে তা দূর করার চেষ্টা করা এবং তাদের জীবনে সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা। আধুনিক সভ্যতার পথিকৃত যুক্তরাজ্য একটি শিল্পোন্নত দেশ। দুনিয়াকে তারা শিল্প বিপ্লবের পথও দেখিয়েছে। দেশটি দুনিয়ার অন্যতম প্রতাপশালী এবং শক্তিধর দেশও। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বহু দেশ বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্য বা বৃটেনের উপনিবেশ ছিল। শিল্প বিপ্লবের অন্যতম অবদান ফ্যাক্টরী সিস্টেম তাদেরই উদ্ভাবন। কথিত আছে যে, এক সময় ছিল যখন দুনিয়াব্যাপী বৃটিশ সাম্রাজ্যের এত ব্যাপ্তি ছিল যে, এই সাম্রাজ্যে সূর্যাস্ত হতো না। আধুনিক বিশ্বের যত আবিষ্কার ও উদ্ভাবন তার বহুলাংশের কৃতিত্বই বৃটিশদের। অবশ্য গত ৫০ বছরে বৃটিশরা অনেক পিছিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে খ্যাতনামা কোনও বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, কবি, ঐতিহাসিক অথবা আবিষ্কারক আর চোখে পড়ে না, বৃটেনসহ পাশ্চাত্য জগত বস্তুগত উন্নতির শিখরে উঠলেও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান পিছিয়ে গেছে। পার্থিব উন্নতির সাথে আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় না থাকায় তাদের মধ্যে এমন এক আত্মকেন্দ্রিকতার জন্ম হয়েছে, যা পরিবারকে ভেঙে টুকরা টুকরা করে দিয়েছে এবং এর ফলে সামাজিক বন্ধনও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে শুধু বৃটিশরা নয়, ইউরোপের উন্নত সবগুলো দেশ কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোও এখন মহাবিপদে আছে। সব আছে, নেই সাথী-কথা বলার, সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করার লোক। একাকিত্বের এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে তারা বেঁচে আছে। দিনের বেলা অফিস আদালত কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি নিয়ে ব্যস্ত, সন্ধ্যা রাতে বারেও পাবে নাচ-গান এবং গভীর রাতে মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে বাড়ি ফেরা, একাকিত্ব, ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েও নাই ঘুম এই তো জীবন। যে জীবনে সুখ নেই শান্তি নেই প্রশান্তি নেই, বৃদ্ধ বয়সে সম্মানজনক মৃত্যুরও নিশ্চয়তা নেই। সকলের অগোচরে বদ্ধ ঘরে মরে পচে যাবার পর আত্মীয়-পরিজন নয়; দুধ-ওয়ালাই আবিষ্কার করে লোকটি মৃত। এগুলো শুধু সাহিত্যের কথা নয়, বাস্তব। বৃটিশ কাউন্সিল ও সুইডিশ সিডার স্কলার ও ফেলো হিসাবে ইংল্যান্ডের দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়, নড়উইচের ইস্ট এঙ্গলিয়া ও নটিংহাম শায়াবের লাববুরো বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুইডেনের স্টকহোমে বেশ কয়েক বছর আমি কাটিয়েছি এবং অত্যন্ত কাছে থেকে পাশ্চাত্যের জীবন ব্যবস্থা অবলোকন করার সুযোগ পেয়েছি। তাদের মধ্যে প্রাচুর্য আমি দেখেছি কিন্তু প্রাণ দেখিনি। তাদের পরিবারে স্থায়িত্ব নেই। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মতো মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ নিয়ে তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয় না। এই দেশগুলোর প্রত্যেকটিতে জেন্ডার ইকুয়েলিটির নামে ছেলেদের পেছনে মেয়েদের লেলিয়ে দেয়ার ফলে জেন্ডার ইকুয়েলিটির পরিবর্তে একটা জিঘাংসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আবার অবাধ মেলামেশার প্রথা বিদ্যমান থাকায় কার বউ কার মেয়ে কার সাথে যায় তা বলাও মুস্কিল। নারী স্বাধীনতার নামে তারা এমন এক সমাজ ব্যবস্থা পেয়েছে যাতে নারীদের স্বাধীনতাও নেই, মর্যাদাও নেই। মা হিসেবে তারা প্রকৃত সম্মানও পায় না। সেখানে নারীদের যৌন স্বাধীনতা, বিবস্ত্র হবার স্বাধীনতা, বারে পাবে পুষের সেবাদাসী হওয়ার কিংবা ঘর-সংসার ছেড়ে নিজের ইচ্ছানুয়ায়ী পর পুরুষের কণ্ঠ লগ্ন হওয়া অথবা বহুগামিতায় জড়িয়ে পড়া ও ইচ্ছানুযায়ী পেশা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তারা ভোগ করে। পুরুষরাও এসব ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছে। ফলে স্বামী-স্ত্রীতে কলহ ও মারামারি এসব দেশে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। খুব কম স্ত্রী আছে যারা স্বামীর পিটুনী খাচ্ছে না। প্রতি তিনটি বিয়ের মধ্যে একটি ভেঙ্গে যাচ্চে এবং এই হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মারামারির পরিবেশে ছেলে মেয়েরা বড় হচ্ছে এবং একই ধরনের অভ্যাস তারাও রপ্ত করছে। বিয়ে ভাঙ্গার হার বৃদ্ধির ফলে বিয়ের প্রতি তাদের আগ্রহও সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে এবং তারা লিভ টুগেদার এ আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। স্বামী-স্ত্রীও আছে, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড দ্বিপক্ষীয় ত্রিপক্ষীয় মারামারিও আছে। ইউনিসেপ দুর্দশাগ্রস্ত ছেলে মেয়েদের উপর পরিচালিত এক সমীক্ষার রিপোর্টে বলেছে যে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে বউ পিটানোর হার আমাদের মত দেশগুলোর তুলনায় শতকরা ৮৮ ভাগ বেশি। এই দেশগুলোর পরিবেশে স্বামীর উপর স্ত্রীর এবং স্ত্রীর উপর স্বামীর কোনও আস্থা নেই। অনেকের শয্যাসঙ্গী এখন কুকুর। শুধু কি তাই। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৪ শতাংশ মহিলা তাদের স্বামীর তুলনায় কুকুরকে বেশি ভালবাসে। বৃটেনের কোটি মানুষ আজ একাকী কেন? এর কারণ পরিবারের ভাঙ্গন এবং সামাজিক বন্ধনের ত্রুটি। তাদের স্বামী বা স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের কাছে দিল খুলে কথা বলতে পারে না, নিজের অনুভুতি, সুখ-দুঃখ শেয়ার করতে পারে না। ঝগড়াঝাটি না থাকলেও তারা নিজেদের নিয়ে কাজকর্ম নিয়ে এত ব্যস্ত যে পরস্পর পরস্পরকে সময় দিতে পারে না। আজ থেকে বছর পনেরো আগে সুইডিশ কৃষি সমবায় ফেডারেশনের (SACF) আমন্ত্রণে সুইডেন গিয়েছিলাম। ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন রিচার্ড কার্লসন, বয়স সত্তর পেরিয়েছে। তিনি একজন খামারী, দুধের খামারের মালিক। তার জীবনের অনুভুতি সম্পর্কে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছিলেন তার সব থেকেও কিছু নেই। একাকিত্ব তার সব কেড়ে নিয়ে গেছে। স্ত্রী আছে কিন্তু তার সঙ্গে তার যখন রাতে দেখা হয় তখন ক্লান্তিতে তার কথা বলার ইচ্ছে থাকে না। তার স্ত্রী ভেড়ার খামারের মালিক। তিনি খামার দেখাশোনা, মাংস রফতানি, লোম সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ এ উল ফ্যাক্টরি নিয়ে এত ব্যস্থ যে স্বামীর জন্য তার সময় আর থাকে না। তার এক ছেলে আফ্রিকাতে আরেক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়। ২৫ বছরের মধ্যে তাদের সাথে দেখাশোনা হয়নি। মাসে হয়ত দু’একবার টেলিফোনে কথা হয়, তার আক্ষেপ, জীবনে অনেক কিছু রোজগার করেছেন কিন্তু খাবে কে? মরে গেলে দেখবেই বা কে? এই তো তাদের জীবন! বৃটেন একাকিত্ব বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় গঠন করে প্রসংশনীয় কাজ করেছে। কিন্তু এতে কি তাদের সমস্যার সমাধান হবে? আমার দৃষ্টিতে তাদের আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। তাদের নৈতিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা দরকার। নারী পুরুষদের পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না করে তারা যদি তাদের পরস্পরের পরিপূরক মনে করেন এবং নারীদের মায়ের ভূমিকা পালনের উপর গুরুত্ব দেন তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। নারীরা ভোগের বস্তু নয়। পাশ্চাত্য তাদের ভোগের বস্তুতে পরিণত করেছে। এই অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে এবং যৌনতা-নগ্নতা পরিহার করে স্নেহ ভালবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ধর্মকে তারা নির্বাসন দিয়েছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া পরিবার ও সমাজ গঠন হয় না। একাকিত্ব বিষয়ক নতুন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তিনি তুলনামূলক ধর্ম অধ্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং আমার বিশ্বাস ইসলামী অনুশাসন ও মূল্যবোধ পরিস্থিতির উন্নয়নে তাকে যথেষ্ঠ সহায়তা করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ