শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

ট্রাম্পের ঘোষণায় শান্তির বার্তা নেই

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের শেষের দিকে ঘোষিত তার এই নিরাপত্তা কৌশলে রয়েছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে সুপার পাওয়ার দেশটির সম্ভাব্য পন্থা কী হবে তার বিস্তারিত বিবরণ। ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে যে আশা করা হয়েছিল তার কোনো কিছুরই প্রতিফলন নেই এতে। বিশেষ করে রক্তাক্ত সংঘাতকবলিত মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে এমন কোনো আশাবাদ নেই নতুন এই কৌশলে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে মার্কিন মিত্রদের সহযোগিতা আর প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার কথাই শুধু বলা হয়েছে। সংকট মোকাবিলা করার জন্য কার্যকরী কোনো উদ্যোগের পরিকল্পনার কথা নেই ৬৮ পৃষ্ঠার এই দলিলে। ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতিকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াকে আমেরিকা-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সামরিক শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নিয়েছেন ট্রাম্প। আর এই পরিকল্পিত দলিলে ২৭ বার কথিত জিহাদি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

ট্রাম্পের নতুন এই নিরাপত্তা কৌশল দলিলে চারটি মূল বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা, দেশটির সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নেয়া, শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে শান্তি স্থাপন ও আমেরিকার প্রভাব বৃদ্ধি করা। যেহেতু নীতিটি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক তাই এর মূল বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইস্যুই আর শুধু তাদের নিজস্ব নয়। গোটা বিশ্বেই যেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মার্কিন স্বার্থ, তেমনি এই পরাশক্তির যেকোনো অভ্যন্তরীণ ইস্যুর সাথেও জড়িয়ে আছে বিশ্বব্যবস্থার অনেক স্বার্থ। তাই বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একটি নীতি প্রণয়ন করবেন, যা দিয়ে আশাবাদী হওয়া যাবে। তৃতীয় পয়েন্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তি স্থাপনের কথা বলেছেন। কিন্তু বিশাল এই নিরাপত্তা কৌশলের পাতায় পাতায় এ বিষয়টি নিয়ে যা লেখা হয়েছে তা পুরোটা পড়লে বোঝা যায়, এটি আসলে কতটা বাস্তবসম্মত। এখনো বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেশি। আরব, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অনেক দিন ধরেই অঞ্চলটি রক্তাক্ত সংঘাতময়। ট্রাম্প তার নতুন নিরাপত্তা কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার কথা বলেছেন, কিন্তু এর পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন আক্রমণাত্মক কৌশল। ইরানকে সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক আখ্যা দিয়ে তাদের মোকাবিলায় মিত্রদের সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এমনিতেই গত এক বছর ধরে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী বক্তব্যে-হুংকারে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বিরাজ করতে শুরু করেছে। সউদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানকে মোকাবিলায় যে বেপরোয়া আচরণ করছেন, তার পেছনেও ট্রাম্পের সমর্থন বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন। অথচ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আসবে বলে অনেকেই মনে করেছিলেন।

ইরান এ অঞ্চলে আধিপত্য শক্তিশালী করছে এটা মিথ্যা নয়। ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, লেবাননের মিলিশিয়া গ্রুপ হিজবুল্লাহ কিংবা সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের প্রভাব অনেকটাই বেড়ে গেছে। ইরান আর উগ্রপন্থীদের উপর সব দোষ চাপিয়ে মানবতাবিরোধী অবৈধ ইসরাইলকে বাঁচানোর উদ্দেশ্য রয়েছ ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশলে। সেখানে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, আমেরিকা মনে করে আঞ্চলিক সংকটের জন্য ইসরাইল দায়ী নয়। অথচ দশকের পর দশক ধরেই ফিলিস্তিনী মুসলমানদের ন্যাৎসি কায়দায় দমন-পীড়ন করে গণহত্যা চালিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ফিলিস্তিনের ভূমি জবরদখল করে সীমানা বাড়িয়ে চলেছে সন্ত্রাসবাদী অপশক্তি ইসরাইল। ট্রাম্প যে দিন তার নতুন নিরাপত্তা নীতি ঘোষণা করেন তার আগের সপ্তাহেও সন্ত্রাসবাদী ইসরাইলী বাহিনীর গুলীতে নিহত হয়েছে ৯ জন ফিলিস্তিনী মুসলমান। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আরব রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদী ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলছে- এ বিষয়টিকে প্রশংসার নজরে দেখা হয়েছে। এতে বোঝাই যাচ্ছে যে, আরব-ইসরাইল দহরম-মহরম বৃদ্ধিতে ভবিষ্যতেও পৃষ্ঠপোষকতা করবে ট্রাম্প প্রশাসন। আর সিরিয়া ইস্যুতে উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেয়ার শর্তে রাজনৈতিক সমাধানের আশাবাদী তারা। সিরিয়ায় বাশার সরকারের পতন ঘটানোর যে অঙ্গীকার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেই চরম লজ্জাজনক ব্যর্র্থতা এর মাধ্যমে তারা একরকম স্বীকার করে নিয়েছে।

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের একই দৃষ্টিভঙ্গি। পাকিস্তানকে সরাসরি আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী করে ভারতের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা তার। আবার ভারতকে দিয়ে মোকাবিলা করতে চান চীনের প্রভাব। পাক-ভারত দ্বন্দ্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সমগ্র বিশ্বের। দু’টি পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে চায় সবাই। ট্রাম্পও দু’টি দেশের বৈরিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এখানেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মতো একই পন্থা অবলম্বন করেছেন। একটি রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং আরেকটি রাষ্ট্রকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কখনো বৈরিতা নিরসন সম্ভব নয়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা হচ্ছে ভারতের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও তাদের নেতৃত্বে ভারত মহাসাগর ও গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা। ভারত অনেকদিন ধরেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘ক্রস-বর্ডার’ সন্ত্রাসবাদের যে অভিযোগ করে আসছে তা ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন নীতিতেও সেটি মোকাবিলা করার কথা দেখা যায়। এর ফলে পাকিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলতে ভারত অনেক বেশি শক্তি পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতের কারণেই পাকিস্তান ও ভারতের পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের মাটিতে উগ্রপন্থীদের আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। তবে এর সমাধানে ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লীকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে পারতো ওয়াশিংটন।

বুঝতে বাকি থাকে না যে, পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে আরো খারাপের দিকেই যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্র পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ধীরে ধীরে শীতল করেছে। এটি হয়তো আরো স্পষ্ট হবে সামনের বছরগুলোতে। ট্রাম্প আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে চান। অপরদিকে কয়েকদিন আগেই খবর প্রকাশ হয়েছে, আফগানিস্তানে নিয়োজিত মার্কিন সেনাবাহিনী আবার সরাসরি যুদ্ধ করবে তালেবান ও আইএস-এর বিরুদ্ধে। কয়েক মাস আগেও দেশটিতে নতুন করে ৪ হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কাজেই সহসাই আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারেও আগের চেয়ে এখন আরো কঠোর অবস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। যৌথবাহিনীর আকার কমিয়ে আনার  যে সিদ্ধান্ত ইতঃপূর্বে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র তা বাতিল করবেন ট্রাম্প। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাহিনীগুলোর শক্তিবৃদ্ধি ও কর্মকা-ের পরিধি বৃদ্ধি করবে। অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকায়নও করা হবে। পারমাণবিক অস্ত্র ও এর নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। ট্রাম্প মনে করেন, ¯œায়ুযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের পারমাণবিক প্রযুিক্তর অনেক কিছুই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও ৩০ বছরের পুরনো। এই জায়গা থেকে বের হয়ে সামরিক আধুনিকায়ন চান ট্রাম্প। বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তির আধিপত্য ধরে রাখতেই এই কৌশল নেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য হারিয়েছে, উল্লেখ করা হয়েছে নতুন নীতিতে। অর্থনৈতিক ইস্যুতে চীন ও রাশিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বী আখ্যা দিলেও দেশ দু’টির সাথে কৌশলগত সম্পর্ক রাখবে ট্রাম্প প্রশাসন। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ ও অভিবাসন নীতিতেও কঠোরতা আসছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ