শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

সিটি নির্বাচন স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে জল্পনা-কল্পনা চলছিল উচ্চ আদালতের রায়ে সেটাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত বুধবার দু’জন মাননীয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ তিন মাসের জন্য এই উপনির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে স্থগিত হয়ে গেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়া নতুন ৩৬টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের জন্য পরিকল্পিত নির্বাচনও। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি মেয়র পদে উপনির্বাচনসহ এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং মাঠের দুই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিল। প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা ও নির্বাচনী কার্যক্রমও শুরু করেছিলেন। 

কিন্তু বাধা হিসেবে সামনে এসেছিল দুটি পৃথক রিট আবেদন। রাজধানীর ভাটারা ও বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পরিকল্পিত নির্বাচনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন,  জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের এবং ইউপি সদস্যদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু এসব জনপ্রতিনিধির বিষয়ে মীমাংসা না করেই নির্বাচন কমিশন নতুন যুক্ত সকল ওয়ার্ডে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তফসিল ঘোষণা করেছে। তাছাড়া ওয়ার্ডগুলোতে ভোটার তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়নি। এমন অবস্থায় কোনো নির্বাচন বা উপনির্বাচনই বৈধ হতে পারে না। পৃথক রিট দুটির শুনানি শেষে হাই কোর্টের বেঞ্চ ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় মেয়র পদের উপনির্বাচনসহ নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত সকল আসনের নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। 

হাই কোর্ট বেঞ্চের রায় ঘোষিত হওয়ার পর মুহূর্ত থেকেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তথ্যাভিজ্ঞ বিভিন্ন মহলও তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে সরকারের ইঙ্গিতে। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মির্জা আলমগীর বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা সুনির্দিষ্টভাবেই জানতেন, নির্বাচনে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটবে। এজন্যই তারা একদিকে  রিট করিয়েছেন, অন্যদিকে স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়েছেন। কমিশনও তার দায়িত্ব পালন না করে সরকারের হুকুম বরদারের ভূমিকাই পালন করেছে। এজন্যই অনেক ফাঁক রেখে এবং করণীয় সম্পন্ন না করেই কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছিল। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুমও অনেকাংশে অভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, হাইকোর্ট বেঞ্চের রায়ে জাতির সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, এটা সরকারের একটি ষড়যন্ত্র। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতির সামনে একথাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বর্তমান সরকার এবং আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞ ও তথ্যাভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরাও তাদের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তারাও সরকারের পাশাপাশি বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তীব্র সমালোচনা করে নতুন যুক্ত ৩৬টি ওয়ার্ডের সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনেছেন। এসবের সঙ্গে রয়েছে নতুন যুক্ত করা ওয়ার্ডগুলোতে বিদ্যমান ইউনিয়ন পরিষদসমূহ। কারণ, ইউপিগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের কার্যকালেরও এখনো অবসান হয়নি। সুতরাং এমন অবস্থায় সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচিত ইউপি প্রতিনিধিদের অবস্থান, করণীয়, কার্যকাল ও মর্যাদা নিয়ে সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হবে। বিষয়গুলো সম্পর্কে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞ থাকার কথা নয়।

আমরা অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো ক্ষমতাসীনদের লাভক্ষতির হিসাব কষতে আগ্রহী নই। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং সে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য ভূমিকাই বর্তমান পর্যায়ে আমাদের উদ্বেগের আসল কারণ। কেননা, ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয়েছে, আইনগত ফাঁক ও ত্রুটি সম্পর্কে সব জেনে-বুঝেই ইসি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছিল। এর মধ্য দিয়ে আরো একবার পরিষ্কার হয়েছে, এই কমিশনকে দিয়ে অন্তত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ