বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

মুন সিনেমা হলের মালিক  পাবেন ৯৯ কোটি ২০ লাখ টাকা

 

স্টাফ রিপোর্টার : জমির মালিকানা পেতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা পুরান ঢাকার মুন সিনেমা হলের মালিককে ৯৯ কোটি ২০ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এই অর্থ তিনটি ভাগে পরিশোধ করতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এই জমির মালিকানাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা রিট আবেদনে হাইকোর্ট সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছিল। ২০১০ সালে আপিলে এবং ২০১১ সালের রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর সরকার পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় কার্যকর করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে ওই বছরে। কিন্তু মুন সিনেমা হলের মালিককে তার জমির মালিকা পেতে দীর্ঘ ৭ বছর অপেক্ষা করতে হলো। 

গতকাল বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে মুন সিনেমা হলের মালিক ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজ। অন্যদিকে সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

আদালতের আদেশ অনুসারে, মুন সিনেমা হলের মালিককে প্রথম দুই মাসের মধ্যে ২৫ কোটি, দ্বিতীয় দুই মাসের মধ্যে ২৫ কোটি এবং ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বাকি অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

আদেশের পর আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজ বলেন, আদালত কর্তৃক কোনো বিষয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষিত হলে কোনো সময়েই তা অতীত বিবেচনায় মার্জনা পেতে পারে না। সাংবিধানিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিন কিস্তিতে ওই অর্থ ইটালিয়ান মার্বেলকে পরিশোধ করতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গত বছর ১৭ জানুয়ারি আপিল বিভাগ জমি ফিরে পেতে ইতালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের করা আদালত অবমাননা মামলায় মুন সিনেমা হলের জমি এবং যে স্থাপনা ছিল, তার মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একজন প্রকৌশলী দিয়ে এই মূল্য নির্ধারণ করে ছয় সপ্তাহের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে সরকারের এটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয়া হয়। এই নির্দেশের আলোকে নির্ধারিত জমির মূল্য হিসেবে ৯৯ কোটি টাকা পরিশোধ করতে আদঅলত নির্দেশ দিলেন।

২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটি এম ফজলে কবির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে ৯০ দিনের মধ্যে মুন সিনেমা হল মূল মালিককে ফেরত দেয়ার নির্দেশনা দেয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখেন। পাশাপাশি মুন সিনেমা হল ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডকে ফেরত দিতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন। ২০১১ সালের মার্চ মাসে এ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায় সরকার। ওই রায়ে মুন সিনেমা হল ফেরতে সরকারকে তিন মাস সময় দেয়া হয়। রায়ের পর পরই এর আলোকে ২০১১ সালের জুন মাসে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। কিন্তু রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও মুন সিনেমা হল বুঝে পানিন মালিক। 

জানা গেছে, পুরাতন ঢাকার ওয়াইজঘাটের মুন সিনেমা হলের জায়গায় তৈরি হয়েছে মুন কমপ্লেক্স। 

২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে মাকসুদুল আলম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন। এতে বলা হয়, আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই সম্পত্তি হস্তাস্তরে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন বিবাদীরা। ওই সম্পত্তির বর্তমান ভোগদখলকারীদের সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর পেছনে খোঁড়া সব যুক্তি উপস্থাপন করেছেন বিবাদীরা, যা গুরুতর আদালত অবমাননার শামিল। ফলে রিটকারী সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার ফল ভোগ করতে পারছেন না। 

জানা যায়, ১৯৬৪ সালে ১১, ওয়াইজঘাট ঠিকানায় মুন সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর আইনি দর্বলতা এবং আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে কিছু লোক ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ওই সিনেমা হলের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির এক আদেশ অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ওই সম্পত্তিটি দখলে নিয়ে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সরকার সম্পত্তিটি মুক্তিযোদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে হস্তান্তর করে। এই মুন সিনেমা হল ফেরতের দাবিতে হাইকোর্টে প্রথম রিট হয় ১৯৭৬ সালে।

হাইকোর্ট ১৯৭৭ সালের ১৫ জুন মুন সিনেমা হলকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে জারি করা প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সিনেমা হলটি ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলে ১৯৯৭ সালের ৭ অক্টোবর মার্শাল ল’ রেগুলেশন জারির মাধ্যমে পরিত্যক্ত সম্পত্তির সম্পূরক বিধান জারি করা হয়। ওই বিধানে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল করা হয়। এরপর বেশ কয়েকবার মুন সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ তার সম্পত্তি ফেরত চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু মার্শাল ল’ রেগুলেশনের সম্পূরক বিধানের কারণে ব্যর্থ হয়।

পরে মার্শাল ল’ রেগুলেশন প্রত্যাহারের দাবিতে কোম্পানিটি ১৯৯৪ সালে হাইকোর্টে আবারও রিট মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৪ সালের ৭ জুন হাইকোর্ট এই আবেদনটি খারিজ করে রায় দেন। পরে ২০০০ সালে ৫ম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং মুন সিনেমা হল ফেরতের দাবিতে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করা হয়। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট মুন সিনেমা হলের জায়গায় মুন কমপ্লেক্স তৈরির জন্য ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কন্সট্রাকশন লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী বাবুলী কন্সট্রাকশন লিমিটেড ৭ তলা ভবন নির্মাণের পর তা সেলামি মূল্যে বিক্রির পর ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর ট্রাস্ট সেখান থেকে ভাড়া আদায় করবে। চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭ তলা ভবনের বিশাল কমপ্লেক্স তৈরি করেছে। এই কমপ্লেক্সে প্রায় ১১শ দোকান রয়েছে। 

২০০৫ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিএনপি সরকার আপিল করলেও ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, আইনজীবী মুন্সী আহসানুল করিমসহ কয়েকজন মিলে তিনটি পৃথক আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ২০১০ সালে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ২০১১ সালে ওই রায় সরকার পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালে কিছুটা সংশোধনসাপেক্ষে আপিল বিভাগ তা বহাল রাখেন এবং মুন সিনেমা হল ফেরত দিতে তিন মাস সময় বেঁধে দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ