বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শিক্ষা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী

আখতার হামিদ খান : সার্থক ও সফল জীবনযাত্রার জন্য যেসব মৌলিক উপাদান প্রয়োজনীয়, শিক্ষা সেগুলোর অন্যতম। এজন্যই শিক্ষা আজ একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। মা-বাবার আর্থিক অবস্থা যেমনই হোকনা কেন প্রত্যেকটি শিশুরই যেমন বাঁচার অধিকার আছে তেমনি রয়েছে শিক্ষালাভের অধিকার।
এখন প্রশ্ন: প্রকৃত শিক্ষা কাকে বলে? শিক্ষা কি নিছক সনদ অর্জন, কেবলই বিদ্বান-বিশেষজ্ঞ হওয়া? এ প্রসঙ্গে শিক্ষা দার্শনিকদের সাফ জবাব ‘না’। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা একদিকে যেমন বিচারবুদ্ধির চর্চা, অন্যদিকে তেমনি দয়া, মায়া, প্রেম প্রভৃতি মৌলিক মানবিক গুণের বিকাশ। শিক্ষার লক্ষ্য ও উপজীব্য ন্যায়, সত্য, সুন্দর প্রভৃতি মহমৎ গুণ অর্জন করা তথা সৎমানুষ ও সুনাগরিক হওয়া। শিক্ষা মানুষের মনকে অযৌক্তিক বিশ্বাসও ও অন্যায় আচরণ থেকে মুক্ত করে, মহৎ জীবনের সন্ধান দেয়। এ পরিপূর্ণ শিক্ষার যাত্রা শুরু আত্মবিশ্লেষণ ও চারিত্রিক পরিশোধনের প্রয়াস থেকে। তার মানে প্রকৃত শিক্ষানীতির ভিত্তি হওয়া চাই চরিত্রনীতি। এ অর্থেই প্রাচ্য সংস্কৃতিতে আমরা দেখি ‘আত্মনং বিদ্ধি’ এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে ‘know thyself (নিজেকে জান)- এই অভিন্ন উপদেশ। এই মহান শিক্ষানীতি থেকে যখনই মানুষ বিচ্যুত হয়, তখনই সমাজে নেমে আসে বিপদ। একথার সত্যতা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- জার্মানীর নাজি, ইতালির ফ্যাসিস্ট এবং আমাদের এ অঞ্চলেরও অনেক স্বৈরশাসক শিক্ষাকে ব্যবহার করেছেন তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার অসৎ উদ্দেশ্যে, দেশও জাতিকে নির্মমভাবে ঠেলে দিয়েছে চরম দুঃখ-ক্লেশ ও যুদ্ধ মৃত্যুর দিকে। খোদ আমাদের দেশেল মাত্র কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা প্রশাসকদেরও আজ এ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। পুরনো প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
শিক্ষকও শিক্ষার্থী: শিক্ষার্থীদের সজ্জন ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলায় মা-বাবার পর শিক্ষকের ভূমিকাই মুখ্য। জ্ঞানতাপস নামে সুপরিচিত এদেশের এক বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শিক্ষকদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : ‘শিক্ষকের কাজ মানুষ চাষ করা- এই লেজ শিংবিহীন পশুকে হৃদয়বান মহৎপ্রাণ মানুষ করা।’ আর তা করতে হলে শিক্ষকদের নিজেদেরই প্রথমে আদর্শচরিত্র মানুষ হতে হবে। তা না হলে আমাদে উপদেশ হবে অনেকটা সন্তানদের উদ্দেশে কাঁকড়ার উপদেশের মতোই অর্থহীন। কাঁকড়া নিজে সোজা হয়ে না হেঁটে যদি তার বাচ্চাদের সোজা হয়ে চলতে বলে, তারা তা শুনবেকি?
প্রথমত, শিক্ষকদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা যে, তারা জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় তৎপর হবেন। অন্যথায় তারা শিক্ষার্থীদের দিশারী হবেন কী করে? তবে এখানে এও বলে রাখা ভাল যে, এজন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা চাই। শিক্ষকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও বাইরের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হতে হবে। তা না হলে, অর্থাৎ স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করা হলে শিক্ষা তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে সমাজক স্থবির করে দেবে।
এখানে অবশ্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার যেমন, বিতর্কিত বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত একপেশে মতামত, বিশেষত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যাপারে, শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অনুচিত, কারণ তাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পক্ষপাতদুষ্ট বলে চিহ্নিত হবেন। কোন শিক্ষক যদি কোমলবতী শিক্ষার্থীদের আস্থা ও সম্মানের সুযোগ নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা পক্ষপাতমূলক শিক্ষা দেন, তা হবে মহান শিক্ষকতা পেশার জন্য অবমাননাকর একটি নৈতিক বিচ্যুতি।
শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত কিনা এ প্রশ্ন নিয়ে ইদানীং ব্যাপক বিতর্ক চলছে। আমার মতে, শিক্ষকরা দেশ ও সমাজের অংশ, সুতরাং সমাজের অন্যান্য সচেতন নাগরিকদের ন্যায় তাদেরও রাজনীতি নিয়ে ভাবার এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। অন্যান্য শুভ চেতনার ন্যায় রাজনৈতিক চেতনাও তাদের সত্তার অংশ। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখনই, যখন মূল দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং সে দলের রাজনীতিকে শিক্ষাঙ্গনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। ফলে এ শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিক অখ-তা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করছি যে, যখন যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তারা শিক্ষকদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সরকারী-আধাসরকারী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও সরকার সমর্থক শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যই বেশি প্রাধান্য পায়। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি দলের শিক্ষকরা তখন বিরোধী দলের সমর্থকদের যৌক্তিক কথাবার্তা ও দাবি-দাওয়াকে আমল না দিয়ে একতরফাভাবে সরকারের হয়ে কাজ করেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ অশুভ ধারা চিরতরে বন্ধ হওয়া দরকার।
শিক্ষকদের নীতিবোধ ও আচার-আচরণ নিয়েও নানা কথা শোনা যায়। যেমন, অভিযোগ করা হয়, শিক্ষকদের কেউ কেউ নৈতিকতার চেয়ে অর্থনৈতিক লাভালাভের বিষয়টিকে বড় করে দেখেন, নিজ প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব যথাযথ পালন না করে অন্যত্র কাজ করে থাকেন। এটা যে শিক্ষকতার মহান পেশার ওপর এক চরম আঘাত তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এমতাবস্থায় কেবল শিক্ষক নয়, আমাদের সব পেশাগোষ্ঠীকেই আজ ভাবতে হবে যে, অর্থ উপার্জনের বিষয়টিকে কিছুমাত্র উপেক্ষা না করে কীভাবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করা যায়, কী করে তাদের নিজ নিজ পেশাকে স্বার্থবাদী মহলের অশুভ আধিপত্য থেকে মুক্ত করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত করা যায়।
শিক্ষার্থীদের করণীয়: এদেশের তরুণ সমাজের সামাজিক ও নৈতিক ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। ভাষা, শিক্ষা, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদের দেশপ্রেমিক ছাত্র সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে আজ নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস এই যে, বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা সবাই মিলে যে অহংকারের ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিলাম, স্বাধীনতা লাভের পর আমরা সে ঐতিহ্যকে তিলে তিলে ম্লান করে দিয়েছি। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ইতিমধ্যে অনেকটা দূষিত হয়েছে, প্রকৃত শিক্ষার গতি ক্রমেই স্থবির হতে চলেছে, বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির বিষয়টি আজ বহুল আলোচিত। এখানে আবার ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রসঙ্গটি এসে যায়। তার মতে, আমাদের মত একটি দরিদ্র দেশে, যেখানে শিক্ষিতের হার এতো কম, সেখানে অন্যান্য বিষয় শিক্ষার পাশাপাশি রাজনীতি শিক্ষাও অতি প্রয়োজনীয়। এতে প্রয়োজনীয় যে দরকার হলে চাই তাদের (ছাত্রদের) সব পড়াশোনা ছেড়ে দেশের জন্য কোমর বেঁধে লেগে যেতে হবে। কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনি ছাত্রজীবনে দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিরোধী। কারণ, ‘ছাত্রজীবনে রাজনীতি শিক্ষা এক কথা, আর রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেয়া আরেক কথা।’ এ কথার সপক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন ড. শহীদুল্লাহ নিজেই। যেমন তিনি বলেন, প্রত্যেক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ‘এমন একটা নেশা আছে যে, তাতে মাতলে আর সব ভুল হয়ে যায়। ছাত্রদের পক্ষে সেটা মস্ত ক্ষতি, দেশেল পক্ষেও সেটা মস্ত ক্ষতি।’
অবশ্য পরে ছাত্রদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘মনে রেখো ছাত্ররা রাজনীতিতে হাতে কলমে যোগদানের জন্য সমস্ত জীবন পড়ে আছে, কিন্তু পড়াশুনার জন্য বেশি সময় নেই।’ বিস্তারিত বিশ্লেষণে না গিয়েও একটু নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ড. শহীদুল্লাহর এই বাণী ছিল একজন ক্রান্তদর্শী মনীষীর বাস্তবধর্মী অভিমত এবংতা আমাদের শিক্ষাঙ্গনের সর্ব সাম্প্রতিক দূরবস্থা এবং ছাত্র-রাজনীতির দলীয় মেরুকরণ ও চরম নৈতিক অধঃপতন রোধে অত্যন্ত সময়োপযোগী।
আমি নিজেও মনে করি রাজনীতি যদি সচেতন নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার হয়ে থাকে তাহলে, ছাত্রদের মধ্যেও তা থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক দলেল অঙ্গসংগঠন হিসেবে নয়।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি অবশ্যই শিক্ষাঙ্গনে অব্যাহত জ্ঞানচর্চা প্রত্যাশা করি, কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে চাই শিক্ষার্থীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা, তাদের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র গঠনের যাবতীয় আয়োজন। মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং পরমত সহিষ্ণুতার মানসিকতা সৃষ্টি তথা সুষ্ঠু মানিবক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করবে আমাদের শিক্ষাঙ্গন। আর তাই যদি করতে হয়, তাহলে একদিকে যেমন প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্যা, নন্দনতত্ত্বসহ মানববিদ্যার বিভিন্ন শাখার ওপর আরোপ করতে হবে সমান গুরুত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ