শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ফেলানীর সেই লাশ রক্তাক্ত সীমান্তের জ্বলন্ত সাক্ষ্য ॥ বিচার কতদূর.....

# বাবার দাবি ‘অমিয় ঘোষের ফাঁসি’
# নেপালে গোবিন্দ পেলো শহীদের মর্যাদা ॥ ফেলানী শুধুই স্মৃতি?
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর মৃতদেহের ছবিটা এখনো সীমান্ত হত্যার প্রতীক। এ ঘটনার পর সারা দেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তখন ভারতের পক্ষ থেকে এ ঘটনার ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে গত সাত বছরেও ফেলানী হত্যাকারীর শাস্তি হয়নি। এখন উচ্চ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার চলছে , তবে তা প্রলম্বিত। ফেলানী হত্যার পরে সীমান্তে হত্যা বন্ধ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনেক আলোচনা হলেও সীমান্তে হত্যা বন্ধ হয়নি।
 ফেলানী হত্যাকান্ডের পর গত বছর ফেলানীকে উৎসর্গ করে কোন এক কবি একটি কবিতা লিখেন , যার শিরোনাম ছিল : “কাঁটাতারে ঝুলে থাকে বাংলাদেশ”
কিশোরী তোমার নীল আসমান
লুট হয়ে যায় শেষমেশ,
সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকে
ফেলানী নামের বাংলাদেশ।
বুকের রক্তে এঁকে মানচিত্র
বুঝালে আমাদের তুমি,
মানুষ কিংবা মানবতা বড় নয়
বড় শুধু তোমাদের রাষ্ট্রভূমি।
বাংলাদেশ মানে ফেলানী
আর ফেলানী মানেই বাংলাদেশ।
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা এক কিশোরীর লাশের ছবি দেশবিদেশের মিডিয়ায় উঠে আসার পর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেঁপে ওঠে বিশ্ব বিবেক। মতামত দেয়া শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তারা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে ‘মৃত্যুর দেয়াল’ ও ‘দক্ষিণ এশিয়ার বার্লিন প্রাচীর’ আখ্যা দেয়। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের বর্বরতার নিন্দা জানায়। বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়া ঝুলন্ত কিশোরীর নাম ‘ফেলানী’। আজ তার মর্মন্তুদ মৃত্যুবার্ষিকী।
আজ ৭ জানুয়ারি। দুঃসহ ফেলানী হত্যাকান্ডের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। ৭ বছর আগে ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের বর্বরতম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলো নিরীহ কিশোরী ফেলানী। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় পাঁচ ঘণ্টা ফেলানীর লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে বিএসএফ সদস্যরা ফেলানীর দুই হাত ও পায়ের ফাঁকে বাঁশ ঢুকিয়ে তাকে বহন করে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবাসী এই নির্মম ও করুণ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ফেলেছে। ফেলানীর সেই লাশ ছিল অরক্ষিত, বিপন্ন, রক্তাক্ত সীমান্তের জ্বলন্ত সাক্ষ্য।
স্বাধীনতার এতটি দিনেও বাংলাদেশীরা নিরাপদ নয় প্রতিবেশী দেশ ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত সীমান্তে।
 ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পারিবারিকভাবে আয়োজন করা হয়েছে মিলাদ মাহফিল ও কাঙ্গালি ভোজের।
ঘটনার পর সমবেদনা জানাতে ফেলানীর বাড়িতে আসেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, পুলিশের আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান, পুলিশ সুপার মাহাবুবার রহমান ও তৎকালীন ২৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আব্দুর রাজ্জাক তরফদার। তখন নুরুল ইসলামের হাতে তিন লাখ টাকা তুলে দেন এডভোকেট সাহারা খাতুন। ঘটনার দুই মাস পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান আসেন ফেলানীদের বাড়িতে। এরপর খোঁজ নেয়নি কেউ।
পিতার ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যরা খুব কাছ থেকে তার চোখের সামনেই মেয়ে ফেলানীকে গুলী চালিয়ে হত্যা করে। বিএসএফ তাদেরকে সতর্ক করা ছাড়াই গুলী করে। ওরা থামতে বললেই ফেলানী বেঁচে যেত। পাঁচ ঘণ্টা পর কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মৃতদেহ নামানো হয়। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩০ ঘণ্টা পর ফেলানীর লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। ফেলানীর বাবা বলেন, ওরা নিহত ফেলানীর অলঙ্কারগুলো পর্যন্ত রেখে দিয়েছে।
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর লাশের ছবি মিডিয়ায় প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতে বিএসএফের নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেঁপে ওঠে বিশ্ব বিবেক। মতামত দেয়া শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তারা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে ‘মৃত্যুর দেয়াল’ ও ‘দক্ষিণ এশিয়ার বার্লিন প্রাচীর’ আখ্যা দেয়। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের বর্বরতার নিন্দা জানায়।
পরে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ঢাকা সফরে এসে ঘোষণা দেন, ‘বিএসএফ এখন থেকে নিরস্ত্র মানুষকে কোনো অবস্থায়ই হত্যা করবে না।’ কিন্তু চিদাম্বরমের ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়নি। ঘোষণা ঘোষণার পর্যায়েই রয়ে গেছে।
হতাশ স্বজনরা
 ফেলানীর বাবা নূর- ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম জানান, ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় আছি আমরা। বিএসএফ অমিয় ঘোষের শাস্তি হলে আমাদের মেয়ের আত্মা শান্তি পেত। আমরাও মনকে শান্তনা দিতে পারতাম।  
এ নির্মম হত্যার ন্যায় বিচার নিয়ে সন্দিহান ফেলানীর স্বজনরা। ফেলানীর ছোট বোন মালেকাবানু জানায়, ফেলানী আমার বড় বোন ছোটবেলা অনেক সুখের স্মৃতি এখন ম্লান। তার হত্যার সুষ্ঠুবিচার আমি চাই।
 ফেলানী হত্যা মামলার ফেলানীর বাবাকে সহয়তাকারী আইনজীবী এবং কুড়িগ্রামের  পাবলিক প্রসিকিউটর এ্যাড. এস,এম, আব্রাহাম লিংকন জানান, ভারতের সর্বচ্চ আদালতে ফেলানী হত্যার বিষয়ে দুটি রীটপিটিশন শুনানী চলমান রয়েছে। আগামী ১৮জানুয়ারি দু’টি রীটেরই শুনানীর দিন ধার্য রয়েছে। যেহুতু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত শুনানী শেষে রীট আমলে নিয়ে শুনানীর কার্যক্রম শুরু করেছে সেহেতু ফেলানীর পরিবার ন্যায় বিচার পাবেন বলে বলে আমি মনে করি।
বিচার প্রক্রিয়া
২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন ভারতের কোচবিহারের সোনালী ছাউনিতে স্থাপিত বিএসএফের বিশেষ আদালত। পরে বিজিবি-বিএসএফের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ফেলানী হত্যার পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু করে বিএসএফ। ওই বছরের ১৭ নবেম্বর ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম বিএসএফের বিশেষ আদালতে অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে পুনরায় সাক্ষ্য দেন এবং অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
২০১৪ সালের ২০ নবেম্বর বিচারিক কাজ চলার সময় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ৪ মাসের জন্য বিশেষ আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়। ২০১৫ সালের ০২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামী অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রীম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬ সালে দুইবার শুনানি পিছিয়ে যায়।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ৯ নং আদালতে বিচারপতি রামায়ন ও বিচাপতি অমিতাভ রায়ের যৌথ বেঞ্চে  তালিকার ২৪ নম্বরে থাকা মামলাটি গেল বছর (২০১৭) ৮ সেপ্টেম্বর ফেলানী হত্যা রীট পিটিশনের শুনানির দিন ধার্য থাকলেও তা পেছায় ২৫ অক্টোবরে। ২৫ অক্টোবরের শুনানি আবারও ধার্য করা হয় চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারী। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচার না পেয়ে হতাশ ফেলানীর পরিবার-স্বজনরা ।
পরিবারের দাবি , ভারতের সুপ্রীম কোর্টের বেঞ্চ ভেঙে নতুন বেঞ্চ গঠিত হবার পর সেখানেই ফেলানী হত্যার মামলার শুনানি বা নিষ্পত্তি হবে। তাই এবার ফেলানীর পরিবার ন্যায় বিচার পাবেন বলে প্রত্যাশা তার।
পরিবারের বর্তমান দিনকাল
প্রতিবেশি বিশ্বজিত রায় জানান, হাতে মেহেদী রাঙাতে যে কিশোরী মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন তার মা, সেই ফেলানী বিএসএফের গুলীতে চির বিদায় নিয়ে শুয়ে আছে সাত বছর ধরে। কবরের পাশে বসে মা জাহানারা বেগম আর বাবা নুর ইসলাম নুরু হাহাকার ছাড়া করার আর কিছুই যেন করার নেই। রামখানা ইউনিয়ন বাড়ির একটি ঘরে কোনোরকমে মাথা গুঁজেছে ফেলানীর বাবা-মা ও ভাই-বোনরা। ওই ঘরটির সামনের অংশে একটি ছোট মুদি দোকান দিয়েছেন মা জাহানারা।
নাখারগঞ্জ বাজারে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিজিবির দেয়া অপর দোকানটি চালাচ্ছেন বাবা নুর ইসলাম। কিন্তু পাঁচ সন্তানদের পড়াশুনা আর সংসারের অতিরিক্ত খরচের চাপে ধীরে ধীরে মালামাল কমে গেছে। যা লাভ হয় তা দিয়ে সন্তানদের লেখাপাড়া ও সংসার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফেলানীর হত্যার ন্যায় বিচার না পেয়ে ফেলানীর পরিবার ও গ্রামবাসীরা হতাশা প্রকাশ করেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাহারা খাতুন অনেক প্রতিশ্রুতির মধ্যে শুধুমাত্র ফেলানীর কবরটি পাকাকরণ ছাড়া আজ পর্যন্ত অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
 গোবিন্দ পেলো শহীদের মর্যাদা ॥ ফেলানী শুধুই স্মৃতি ?
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত সীমন্তের কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে পড়ে ১৫ বছর ফেলানী যখন ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছিলো তখন ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী- বিএসএফ তাকে গুলী করে হত্যা করে। তার কোন দোষ ছিলো না। বাবা নুরুল ইসলামের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলো সে, তখনই ঘাতকের বুলেট তার জীবন কেড়ে নেয়। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলতে থাকা ফেলানীর নিথর দেহের ছবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সমালোচনা ঝড় তোলে। এরপর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের স্মৃতিপটে ওই ছবি এখনো জীবন্ত। তবে, ওই পর্যন্তই।
২০১৭ সালের  ৯ মার্চ কাঞ্চনপুরের পুনারবাস সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা গুলী করে গোবিন্দ গৌতম নামে এক নেপালী নাগরিককে হত্যা করে। গোবিন্দকে ‘শহীদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে নেপালের সরকার। নিহতের পরিবারকে ১০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। যথাযথ মর্যাদায় তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং তার সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও রাষ্ট্র বহন করছে।
 নেপাল সরকার এই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির উপ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই ঘটনার ব্যাপারে তার সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। তিনি জানান, মোদি’র জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল প্রধামন্ত্রী পুষ্প কমল দহলকে টেলিফেন করে এই ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নিরপরাধ নাগরিকদের বিএসএফ যখন একের পর এক গুলী করে হত্যা করে তখন বাংলাদেশ সরকারকে চুপ করে থাকতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে পতাকা বৈঠক করে দায়সারা গোছের প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু এতে কিছুতেই কমছে না হত্যাকান্ড।
 গোবিন্দ গৌতম হত্যাকান্ড নিয়ে নেপাল সরকারের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল তাহলে ফেলানীকে কেন শহীদ ঘোষণা করা হবে না ? সীমান্ত এলাকায় প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতা তুলে ধরবে তার আত্মদান। একই সঙ্গে তা ভবিষ্যতে এমন হত্যকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকের ভূমিকাও পালন করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ