বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গণতন্ত্রের কালো দিবস

আজ ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের যে দিনটিতে দশম সংসদ নির্বাচনের নামে আওয়ামী লীগ সরকার প্রহসনের আয়োজন করেছিল। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার দোহাই দেয়া হলেও ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দলই ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ ও তার জোটের তিন-চারটি দলের প্রার্থীদের মধ্যে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার ধুম পড়ে গিয়েছিল। ৩০০ আসনের সংসদে ১৫৩ জনই কোনো নির্বাচন ছাড়া ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। বাকি ১৪৭টি আসনে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে প্রহসন দেখেছিল জনগণ। সেদিনও পাঁচ থেকে সাত শতাংশের বেশি ভোটার ভোট কেন্দ্রের ধারেকাছে যাওয়ার এবং ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৯৪ শতাংশ ভোটারকে ভোট দেয়ার সুযোগ ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন ক্ষমতাসীনরা।

বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগে যথার্থই বলা হয়েছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আড়ালে ক্ষমতাসীনরা আসলে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসার নীল নকশার বাস্তবায়ন করেছিলেন। গণতন্ত্রবিরোধী সমগ্র সে কর্মকান্ডে ‘স্বাধীন’ নির্বাচন কমিশনও ক্ষমতাসীনদের হুকুম তামিল করতে মাঠে নেমেছিল। ওদিকে দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের সর্বাত্মক বিরোধিতা উপেক্ষা করে আয়োজিত হয়েছিল বলে দশম নামের জাতীয় সংসদ  শুরু থেকেই বিতর্কিত, নিন্দিত এবং জনগণের পর্যায়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে। 

৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।  নির্বাচনেরও আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান যুক্ত করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে সংকটের শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় তথা বিরোধী দলগুলো প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনও করেছে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সমঝোতার স্বার্থে ছাড় দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া একথাও বলেছিলেন যে, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং শেখ হাসিনা ওই সরকারের প্রধান হতে পারবেন না। জাতিসংঘের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং গণচীনও সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহবান জানিয়েছিল। এজন্য প্রধান দুটি দলকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছিল। অন্যদিকে সংলাপের নামে বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করাসহ একের পর এক নাটক সাজিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। ফলে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনের নামে প্রহসন করা থেকে পিছিয়ে যাননি।

একতরফা সে নির্বাচনের আগে থেকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর প্রচন্ড দমন-নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্বাচনের পর তা আরো বৃদ্ধি পায়। বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। এখনো দেয়া হচ্ছে না। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হেনস্থা করা হয়েছে এমনকি বেগম খালেদা জিয়াকেও। সাম্প্রতিক সময়ে দু’-চারদিন পরপরই তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এভাবে সব মিলিয়েই সরকার দেশ থেকে গণতন্ত্রকে বিতাড়িত করেছে। একই কারণে ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস এবং গণতন্ত্রের জন্য কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিরোধী দলগুলো। 

আজকের দিনটিকে সেভাবেই পালন করা হচ্ছে। সেই সাথে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষে প্রধান জাতীয় নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকারকে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এ উদ্দেশ্যে বর্তমান সংসদকে ভেঙে দেয়ার এবং প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে অবশ্যই  নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় হতে হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা ও একদলীয় নির্বাচন করতে দেয়া হবে না বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি। বলেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই এর অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। জামায়াতে ইসলামীসহ দেশপ্রেমিক অন্য সকল দলও বেগম খালেদা জিয়ার দাবি ও বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। 

আমরা মনে করি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নামের প্রহসনের মাধ্যমে নির্বাসিত গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে। আবারও ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চিন্তা পরিত্যাগ করে সরকারের উচিত জনমতের প্রতি সম্মান দেখানো এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া, যে নির্বাচনে সকল দলই অংশ নিতে পারবে। যে নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই হবে অংশগ্রহণমূলক।  বলা বাহুল্য, এজন্য বর্তমান সংসদকে ভেঙে দিতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে সরকারকেও। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকার গঠনেরও পদক্ষেপ নিতে হবে, যে সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে পরবর্তী সংসদের জন্য নির্বাচন। আমরা আশা করতে চাই, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার এবং জনগণের ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আর কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়া হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ