শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

মেয়েদের হাতেই ফুটবলের মশাল

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : দেশের ছেলেদের ফুটবল এখন আর আগের জায়গায় নেই। জাতীয় দলের জন্য খেলা নেই পনের মাসেরও বেশি সময় ধরে। সে কারণে এখন প্রত্যাশাটা ঘুড়ে জায়গা নিয়েছে মেয়েরা। এখন যেন অনেকটাই দুই মেরুতে অবস্থান করছে বাংলাদেশের ছেলে ও মেয়েদের ফুটবল। পুরুষ জাতীয় দল যেখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচশূন্য বছর পার করেছে সেখানে মেয়েদের ব্যস্থতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১৭ সালটা কিশোরী ফুটবলাররা রাঙ্গিয়ে দিয়েছেন। ফুটবলে একমাত্র শিরোপা এসেছে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ থেকে। প্রথমবারের মতো মেয়েরা জিতল সাফের শিরোপা। এক আসরে ভারতকে টানা দুইবার হারিয়ে বিজয়ের মাসে শেষ হাসি হেসেছে বাংলাদেশ। অথচ ছেলেদের ফুটবলের অবস্থা তো অনেকটাই ত্রাহি। র‌্যাংকিং বলছে আর মাত্র তিনধাপ পেছালে ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে যাবে লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে এর চেয়ে নিচে আর কখনো যায়নি বাংলাদেশ। ফিফার সর্বশেষ ঘোষিত র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের স্থান এখন ১৯৭! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বলেই মেনে নিতে হবে। গত জানুয়ারিতে ১৯০ নম্বর দিয়ে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে অনুপস্থিত থাকায় এই অবস্থা হয়েছে র‌্যাংকিংয়ে। অথচ বয়সভিত্তিক সাফের আসরে খেলতে নামার আগে সুখবর নিয়েই মাঠে নেমেছিল কিশোরীরা। র‌্যাংকিংয়ে ১০০ তে এখন অবস্থান করছে মেয়েরা। হয়তো শিরোপা জয়ের কারণে সেটা আরো কমতে পারে। তবে মেয়েরা এবার যে ফুটবল খেলেছে তাতে বাহবা দেওয়ার মানুষের অভাব পড়েনি। দুর্দান্ত খেলে নিজেদের জালে একটি বল প্রবেশ না করতে দিয়েই ট্রফি নিয়ে উল্লাস করেছে গোলাম রব্বানী ছোটনের শীষ্যরা।
পায়ের নিখুঁত কারুকাজ। যেন একেকজন চিত্রশিল্পী। স্কিলের চূড়ান্ত প্রদর্শনী দেখা গেছে প্রতিটা ম্যাচেই। বল নিয়ে চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে একটার পর একটা গোল করেছে মারিয়া মান্ডাররা। কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম যেন নতুন দিনের জয়গান গেয়ে শেষ করেছে এবারের আসর। জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের কারণে মেয়েদের আসরটি জায়গা হারিয়েছিল বঙ্গবন্ধু জাতীয় ষ্টেডিয়াম থেকে। তাতে যদিও মাঠে দর্শক উপস্থিতি বেড়েছে। ফাইনালটা তাই ১-০ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে ফাইনালের ড্রেস রিহার্সেলে বাংলার কিশোরীদের ভারত বধ ৩-০ গোলে। বয়সভিত্তিক আসরে এ নিয়ে টানা তিনবার ভারতকে হারিয়েছে লাল-সবুজের মেয়েরা। বিজয়ের মাসে কখনোই ফুটবলের কোন শিরোপা জেতা হয়নি। কিশোরীরাই সেই স্বপ্নপূরণ করল। তাও আবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েই। চার জাতি আসরের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ছিল ফেবারিট। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান টুর্নামেন্টে খেলতে আসেনি। তাই সরাসরি লিগ পর্বে খেলা হয়। প্রথম ম্যাচেই নেপালকে ৬-০, পরের ম্যাচে ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ভুটানকে ৩-০, নেপালকে ১০-০ গোলে হারিয়ে ভারতও ফাইনালে উঠে যায়। বছরের শুরুটা খুব খারাপ হয়নি। এক ঝাঁক কিশোরী নিয়ে প্রথমবারের মতো নারী সাফ ফুটবলের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ অভিজ্ঞ খেলোয়াড়-সমৃদ্ধ আগের টানা তিন আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত। ফাইনালে হেরেছিল বাংলাদেশ। পুরুষ ফুটবলের মতো মেয়েদের বয়সভিত্তিক থেকে জাতীয় দল সবখানেই ভারতীয়দের জয়জয়াকার ছিল। এবার সেই সা¤্রাজ্য দখল করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা।
অথচ গেল বছরটা ফুটবলে খুব বেশি অর্জন নেই। ঘড়োয়া ফুটবলে বদলায়নি পুরনো চেহারা। বারবারই বিরতিতে পড়ে পেশাদার ফুটবল হয়ে গেছে অপেশাদার। জাতীয় দল থেকে বয়সভিত্তিক আসর সবখানেই খেলা হলে বন্ধ ছিল বিপিএল। ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ভুটানের কাছে হারার পর জাতীয় দল আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেয়নি। তবে পুরুষ ফুটবলে অনূর্ধ্ব-১৮ দল চমৎকার পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্ভাগ্যক্রমে দেশকে শিরোপা উপহার দিতে পারেননি জাফর ইকবালরা। নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করলেও হেড টু হেডের সমীকরণে রানার্সআপ হয়েই দেশে ফিরতে হয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নৈপুণ্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। এএফসি কাপ বাছাই পর্বে কাতারের মাটিতে কাতারকে পরাজিত করে চমক দেখায়। ভালো খেলার সান্তনা হিসেবে শুধু বছরটা শেষ করতে হয়নি। এক শিরোপায় বছরটা রঙিন হয়ে গেছে। তা এসেছে মেয়েদের সাফল্যের বদৌলতে। ফুটবলে কোনো আসরে অনেক দিন পর ফাইনালে ভারতকে হারাল। ঘরের মাঠে টুর্নামেন্ট হলেও মারিয়ারা শিরোপা জিতবে এই আশা কারোর ছিল না। কেননা পুরুষদের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে ভারতই বরাবর ফেবারিট। গত বছরই মূল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের মহিলা জাতীয় দল হেরে যায় ভারতের কাছে। শিরোপার হিসেব কেউ করেননি। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ও অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ঘরের মাঠে খেলা তাই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে দেশবাসীকে শিরোপা উপহার দিতে চাই। কথা রেখেছেন গুরু-শিষ্য।
মারিয়া মান্ডারা অনেকটাই নির্ভার ছিলেন এবারের টুর্ণামেন্টে। ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে টানা দুই ম্যাচে পরাজিত করেছে। যা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বিরল ঘটনায় বলা যায়। চার ম্যাচে ১৩ গোল দিয়েছে প্রতিপক্ষের জালে, বিপরিতে কোন গোল হজম করেনি। যা আরও একটি রেকর্ড হয়ে থাকল। ফুটবলে পুরুষ জাতীয় দল ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। সত্যি বলতে কি ফুটবলে এখন যত আশা মেয়েদের ঘিরেই। আগে নেপাল ও তাজিকিস্তানে আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন ১৪ বছর বয়সী দল। এএফসি কাপ বাছাই পর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলে অনূর্ধ্ব-১৬ দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ। এবারতো অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ জিতে আবারও যোগ্যতার প্রমাণ দিল মেয়েরাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ বিজয়ী বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নতুন পরিকল্পনা করেছে খেলাটি নিয়ে। বাফুফে সভাপতি কাজি সালাউদ্দিন ট্রফি বিজয়ী দলেল সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ১০ হাজার টাকার পাশাপাশি বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। যদিও এটিকে পর্যাপ্ত বলছেন না কেউ। নারী ফুটবলারদের অধিকাংশ খুবই নিম্নবিত্ত পরিবারের। পরিবার নিয়ে তিন বেলা অনেকে ঠিকমতো খেতে পারেন না। এই দরিদ্র ফুটবলারদের জন্য বেতনের ব্যবস্থা করার দাবী এখনো জোড়ালো হচ্ছে। যদিও এখন খেলোয়াড়দের একটা সম্মানী দিচ্ছে বাফুফের মহিলা উইং। ২০১৮ সালে মেয়েদের পেশাদার লিগ চালু করার ঘোষণা দিয়েছে বাফুফে সভাপতি। এছাড়া চার বছরের জন্য পরিকল্পনাও সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সাফল্যের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে বাংলাদেশ লাল দল চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৯৯ সালে সাফ গেমসে প্রথম সোনা জিতে বাংলাদেশ, ২০০৩ সালে সাফ শিরোপা। ২০১০ সালে এস এ গেমসে সোনা, ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে যুবারা চ্যাম্পিয়ন। নেপালে দুবার আঞ্চলিক ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন অনূর্ধ্ব-১৪ মহিলা দল। ২০১৫ সালে এএফসি কাপ বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন। এই সাফল্য সহ মেয়েদের যত সাফল্য এসেছে তাতে একজন কোচের কথা বড় করেই বলতে হবে, তিনি গোলাম রব্বানী ছোটন। ২০০৬ সালে বাফুফেতে কোচ হিসেবে চাকুরি শুরু। এরপর ২০০৮ সালে জাতীয় ফুটবল দলের সহকারী কোচ ছিলেন তিনি। মেয়েদের ফুটবলে সাবেক এ ফুটবলারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২০০৯ সালে। ২০১০ সালে সিনিয়র নারী ফুটবল দলের সহকারী কোচ ছিলেন ছোটন। ওই সময় বাংলাদেশ ব্রোঞ্জ জিতেছিল। কোচিং ক্যারিয়ারে ছোটনের সাফল্যের গল্পটা চলমান রয়েছে গত তিন বছর ধরে। ২০১৩ সালে শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ নারী আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে তার অধীনে বাংলাদেশ হয়েছিল তৃতীয়। আর ২০১৫ সালেই কোচ হিসেবে শিরোপা জয়ের প্রথম আনন্দে মেতে উঠেছিলেন তিনি। নেপালে অনুষ্ঠিত নারী অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। গত বছর তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত একই আসরে ভারতকে পরাভূত করে সেরা হয়েছিল লাল-সবুজের দলটি। আর ২০১৬ সালেই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইপর্বে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বের টিকিট কেটেছিল মেয়েরা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওই আসরে কুষ্ণা রানী সরকারের দল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছিল। সে দলটিই এবার কিশোরী সাফের শিরোপা জিতেছে। সেই সাফল্যের রূপকার কোচ ছোটন। মেয়েদের ফাইনাল ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচারের কথা ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি)। কিন্তু তারা ঘোষণা দিয়েও এই ম্যাচটা দেশবাসীকে দেখায়নি। যা দেশবাসীর সঙ্গে একপ্রকার প্রতারণার শামিলই মনে করছেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। যেখানে একটা পত্রিকা, কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন খেলা দেখিয়েছে, সেখানে তাদের ঘুম ভাওঙ্গনী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খেলা দেখানোর আগ্রহই নেই দেশের সরকারি এই টেলিভিশনের।
তাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ও হতাশ ফুটবলপ্রেমীরা। মেয়েদের ফাইনাল ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বাফুফের হেড অব মিডিয়া আহসান আহমেদ অমিত জানিয়েছিলেন, বিটিভি ফাইনাল খেলা দেখাবে। কেন বিটিভি খেলা দেখায়নি? কেন দেখায়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’আমরা নিশ্চিত হয়েই আপনাদের বিটিভিতে সরাসরি খেলা দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলাম। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকেও বিটিভিকে বলা হয়েছে খেলা দেখানোর জন্য। এমনকি বিটিভি’র জেনারেল ম্যানেজারও আমাদের জানিয়েছিলেন খেলা দেখাবেন। কিন্তু হঠাৎ করে তারা এত বড় একটা টুর্নামেন্টের খেলা দেখায়নি। এর জন্য জিএমই দায়ী। তার কারণেই মেয়েদের ফাইনাল খেলা দেখতে পারেনি বিটিভি’র অনেক দর্শক’। যদিও বিটিভি’র কর্তাদের দাবী, সরকারি বিভিন্ন প্রোগ্রামের কারণে মেয়েদের খেলা দেখাতে পারেননি তারা। তবে এমন সাফল্যের পর সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার কোন বিকল্প দেখছেন না ফুটবলবোদ্ধারা। কারণ বয়সভিত্তিক দলই হয়ে থাকে জাতীয় দলে প্রবেশের সঠিক রাস্তা। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল দিয়ে যে নতুন জাগরণ তৈরি হয়েছে মেয়েদের ফুটবলে সেটা ধরে রেখে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। কারণ এখনো তো ভরসা মেয়েরাই। কারণ সাফল্যের কারণেই মূলত পিছিয়ে পড়া এইসব মানুষগুলোই এখন মশাল হাতে এগিয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ