শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কোটি টাকার কারবার-লুডুখেলার নামান্তর

ডা. মিজানুর রহমান : [দুই]
দৈনিক যুগান্তর ১২ ডিসেম্বর “হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেড়শ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন- ১৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১ হাজার ৬৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা প্রাক প্রকল্প প্রস্তাব। DBC টেলিভিশনে ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং তারিখে প্রচারিত সংবাদ “বায়ু দূষণে বছরে ক্ষতি ২০ হাজার কোটি টাকা।”
“দৈনিক করতোয়া ৩০ ডিসেম্বর” জানুয়ারিতে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৭’শ ৪৪ কোটি। দৈনিক সংগ্রাম ৩০ ডিসেম্বর “লন্ডভন্ড অর্থনীতি, বেসরকারী ব্যাংক দখল সহ আর্থিক খাতে অস্থিরতার মধ্যদিয়ে শেষ হল ঘটনাবহুল ২০১৭”। গত ৯ বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১০দশমিক ৬৭ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি।
দৈনিক সংগ্রাম ২৮ ডিসেম্বর “খুলনার ফুলতলার আইয়ান জুটমিল গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড” ক্ষতির পরিমাণ সোয়াশ’ কোটি টাকা। দৈনিক কালের কন্ঠ “নতুন শিল্পভাবনা ও অর্থনৈতিক পরাশক্তির স্বপ্ন” শিরোনামে লেখায় ওয়াটারহাউস কুপোরস গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতার ভিত্তিতেত বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি আকার হবে এক হাজার ৩২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০৫০ সালে গিয়ে যা দাঁড়াবে তিন হাজার ৬৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি আর পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন ছাড়া এই লক্ষ অর্জন করা সম্ভব হবেনা। দৈনিক সংগ্রাম ৩১ ডিসেম্বর “কেসিসির ৮০ কোটি টাকা গৃহকর অনাদায়ী” ১৪টি প্রতিষ্ঠানে আদায় অনিশ্চিত।
দৈনিক সংগ্রাম ৩১ ডিসেম্বর “বিনিয়োগ পরিবেশ নেই ভরসাম্যহীন অর্থনীতি” শিরোনামে লেখার মাঝে- আমানতের সুদ হার কম আর বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকার কারণে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই। ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। বলা হয়েছে, আমদানি-রফতানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধানত এই অর্থ পাচার করা হয়।
দৈনিক আজকালের খবর ০১ জানুয়ারি ২০১৮, “দেশে লুটপাট খুন আর সন্ত্রাসের রাজনীতি চলছে” বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমানও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন- দেশে লুটপাট, সন্ত্রাস ও খুনের রাজনীতি চলছে। আওয়ামী লীগের কিছুসংখ্যক লোক টাকার কুমির হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দেশে চারজন মাত্র কোটিপতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার জন। শুধু কোটিপতি নয়, কোটি কোটি পতি তারা। আর গরিব - দিনমজুর ও মেহনতি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসছে। দৈনিক প্রথম আলো ৩১ ডিসেম্বর” ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়, যার ৬ কোটি ডলার উদ্ধার হয়নি। দৈনিক আজকের খবর ৩১ ডিসেম্বর “পাবনা সুগার মিল শ্রমিকদের ৫ কোটি টাকা আত্মসাত! দৈনিক প্রথম আলো ৩১ ডিসেম্বর “মাথাপিছু আয় গত অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৪৮৫ ডলার বা এ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলার।
দৈনিক সমকাল ০১ জানুয়ারি “স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল” ৪২ বছর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় থাকার পর বাংলাদেশ চলতি বছর উন্নায়নশীলদেশ হওয়ায় স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আগামী মার্চে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটি এই স্বীকৃতি দেবে। দৈনিক যুগান্তর ১ জানুয়ারি “৫৫৩ কোটি টাকা দুর্নীতির ঘটনা অনুসন্ধানে দুদক” পরিশোধন করা ছাড়াই কনডেনসেট বিক্রি। দৈনিক আজকালের খবর ১ জানুয়ারি “বছরে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির মিশন”-বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যাসেসিয়েশন।
দৈনিক আজকালের খবর ১ জানুযারি, ২০১৮ “৪৫ বছরে. সর্বোচ্চ মূনাফা রূপালী ব্যাংকের” ৪৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা করেছে রাষ্ট্রয়াত্ত্ব রূপারী ব্যাংক লি:। ২০১৭ সালে ৫১১ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে পুঁজি বাজারে নিবন্ধিত একমাত্র রাষ্ট্রয়ত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। অথচ ২০১৬ সালেই ব্যাংকটি প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসানে ছিল। দৈনিক যুগান্তর ২ ফেব্রুয়ারী “বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠেছে নতুন চর॥ স্থায়ী করতে ১০৫ কোটি টাকার প্রকল্প।”
উপরোক্ত অর্থনৈতিক হাজার হাজার কোটি টাকার সংবাদগুলোর বেশিরভাগই হতাশা ব্যাঞ্জন। এ ধরনের হতাশাপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম জাতীয় প্রচার মাধ্যম পত্র-পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে একের পর এক প্রচারিত হতে থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ “উন্নয়নশীল দেশ” হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের মিশন-ভিশন এর ঘোষণার পূর্বাভাস এর শেষ পরিণতি কি হতে পারে? সে ব্যাপারে বিবেক দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব দেশের সকল সচেতন নাগরিক ও সম্মানিত পাঠকদের উপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমার।
তবে এ কথা জোড় দিয়ে বলা যায় যে, অর্থনৈতিক শোষন, বৈষম্য, জালিয়াতি, রাজনৈতিক নীপিড়ন এবং অপসংস্কৃতির গোলামি থেকে দেশকে রক্ষা করতে করতে হলে সুদ, ঘুষ, অপরাজনীতি ও দুর্নীতি রোধ করে ইনসাফপূর্ণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। সে জন্য জাতীয় পর্যায়ে মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে হলে আদর্শ নৈতিক ও ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন শিক্ষার ব্যাপক সম্প্র্রসারণ প্রয়োজন। যাতে করে সমাজে আদর্শ, বিবেক সম্পন্ন, আলোকিত মানুষ তৈরীতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়সহ সকল স্তরে দূর হবে সামাজিক বৈষম্য, জঙ্গিবাদ, মাদক, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, হত্যা, গুম ও নানাবিধ লোমহর্ষক, হৃদয় বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে ৪ কোটির অধিক বেকার যুবককে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অপরিহার্য্য। এক্ষেত্রে যাবতীয় শর্ত পূরণকৃত সরকারী স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৫ হাজার ২৪২ টি (স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি) নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তি করার গুরুত্ব অপরীসিম। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক- কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৭৫ হাজার। প্রতি বছর বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা এখাতে অর্থ বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়েও কোন কাজ হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়- স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি করতে হলে চলতি বাজেটে অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ নতুন এমপিওভুক্তি খাতে এ বাজেটে এক টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি। যে কারণে ৭-১৫ বছর পূর্বে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক- কর্মচারীরা তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পৌষের কনকনা শীতে বস্ত্রহীন খাদ্যহীন অবস্থায় ফুটপাতে লাগাতর আমরণ অনশনে অংশগ্রহণ করে অসুস্থ হয়ে একের পর এক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অপর দিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক- কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দিগুণ করা হয়েছে। যার কারনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির গ্যারাকলে পিষ্ট হচ্ছেন ননএমপিও শিক্ষকরাসহ সাধারণ জনগণ।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত অবিলম্বে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করা। এতে করে ক্ষমতাসীন সরকারের ভাবমূর্তি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং উল্লেখযোগ্য বেকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দূর হবে মানুষ গড়ার কারিগরদের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি। এটি অবশ্য সরকারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ব ইস্তেহারের ঘোষণাও বটে। [সমাপ্ত]
লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক গবেষক ও সমাজকর্মী
ই-মেইল : dr.mizanur470@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ