শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জোর আলোচনা জমে উঠতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ২০১৮ সালকে উল্লেখ করা হচ্ছে নির্বাচনের বছর হিসেবে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, একদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে গঠিত এবং এখনো তৎপর দশম সংসদের মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হতে চলেছে, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও অনুষ্ঠিত হয়েছে স্থানীয় সরকারের বেশ কিছু নির্বাচন। এসবের মধ্যে গত মাস ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। কারণ, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে বহুদিন পর দেশের ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল বিএনপিও অংশ নিয়েছিল। অনিয়ম, কেন্দ্র দখল ও কারচুপির অভিযোগে দুপুরের দিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও বিএনপির এই অংশগ্রহণকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় হিসেবেই দেখা হয়েছে। রংপুরের পরপর একদিকে ২৮ ডিসেম্বর দেশের ১২৬টি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে শুরু হয়েছে জোর তৎপরতা। এসব কারণেই আলোচনায় প্রাধান্যে এসেছে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন।
প্রসঙ্গক্রমে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নামের প্রহসন এবং ক্ষমতাসীনদের একতরফা ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকান্ডের কথা উঠলেও কিছু বিশেষ কারণে এই মর্মে আশাবাদের সৃষ্টি হচ্ছে যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলই অংশ নেবে। ওই নির্বাচন হবে সত্যিকার অর্থেই অংশগ্রহণমূলক। এ ব্যাপারে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সর্বশেষ বক্তব্যকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে গত ২ জানুয়ারি তিনি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনের দল। আমরা নির্বাচন করবো। মানুষ পরিবর্তন চায়। আর পরিবর্তেনের জন্য দরকার নিরপেক্ষ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন। একই বক্তৃতায় পূর্বশর্তেরও উল্লেখ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। বলেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই এর অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা ও একদলীয় নির্বাচনও করতে দেয়া হবে না। নির্বাচন করতে হবে বর্তমান অনির্বাচিত সংসদকে ভেঙে দিয়ে। সরকারকেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। সরকারের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেছেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলার পর মামলা চাপিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে সেটা করতে দেয়া হবে না। নির্বাচন করতে হবে সকল দলের অংশগ্রহণে।
নিজের দল সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেছেন, বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় পার্টি। এই দলকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। তেমন কোনো নির্বাচন করার কল্পনা পরিত্যাগ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে খালেদা জিয়া আরো বলেছেন, তার অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারেনি। আগামীতেও হবে না। শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে রেখে তার অধীনে নির্বাচন করার যে স্বপ্ন সরকার দেখছে তা কোনোদিনই পূরণ হবে না। সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে হবে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে। সে নির্বাচনে বিএনপি অবশ্যই অংশ নেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
এদিকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশিষ্টজনদের যেসব অভিমত প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলোতেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন গত মঙ্গলবার একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’জন উপদেষ্টা এবং জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকসহ প্রত্যেকেই বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত একতরফা নির্বাচনের সময় থেকেই দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো সংঘাতের রাজনীতিই বিরাজ করছে। সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনই এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এজন্য প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই দল দুটিকে ছাড় দিতে হবে এবং এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়। সেটা যদি সম্ভব না হয় এবং আবারও যদি ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশিষ্টজনদের এই অভিমত ও আশংকার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। তারা যথার্থই বলেছেন, সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে আসলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত নির্বাচন নামের কর্মকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে। ওই নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনাভোটে ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন, বাকি আসনগুলোতেও গণতন্ত্রসম্মত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘নির্বাচিত’ নামের সে সংসদকেই দশম জাতীয় সংসদ হিসেবে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে বলেই দেশের রাজনীতি সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি রয়েছে অনির্বাচিত হিসেবে বর্ণিত সরকারের দমন-নির্যাতন ও অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড। সুতরাং রাজনীতিতে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু নতুন একটি সংসদ নির্বাচন আয়োজন করলেই চলবে না, সে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এরই মধ্যে নিজেদের ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছেন বলে আমরা মনে করি। ক্ষমতাসীনদের উচিত বিএনপির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া। তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়কÑ যে নামেই হোক, একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সরকারকে দেশের অন্যতম জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রশ্নেও নেতিবাচক অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের মতে সব মিলিয়ে এমন আয়োজন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য সকল দলও একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে এবং ওই নির্বাচন যাতে সত্যিকার অর্থেই অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আমরা চাই না, আরো একটি ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হোকÑ যে ব্যাপারে বিশিষ্টজনেরা সতর্ক করে দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ