শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

জাতিগত বিদ্বেষেই রোহিঙ্গা নিধন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গারা মুসলিমরা বিশ্বের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের দেয়া তথ্য অনুযায়ি রোহিঙ্গা পৃথিবীর সবচাইতে বেশি নিগৃহীত নৃগোষ্ঠীর নাম। আরাকান এক সময় স্বাধীন থাকলেও বৌদ্ধ রাজা বোদাওয়াফা এই ভূখন্ডটি দখল করে নেন। ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন। তাদেরকে নিজ দেশেই পরবাসী হিসেবে জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়। কেড়ে নেয়া হয় নাগরিকত্ব ও সহায়-সম্পদ। স্বাভাবিক চলাফেরায়ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। হত্যাযজ্ঞ ও নিধনযজ্ঞ হয়ে ওঠে তাদের জন্য নিত্যদিনের অনুসঙ্গ। এক সময়ের মুসলিম রাজ-রাজরাদের রোসাঙ্গ এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের পদপিষ্ট হয়ে এখন রীতিমত বধ্যভূমি। চারিদিকে শুধু তাজা লাশের সারিসারি স্তূপ, বারুদের গন্ধ আর মজলুম মানুষের আর্তনাদ-আহাজারী।
রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবেই নির্মূল করা হচ্ছে বলে জাতিসংঘ এক প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছে। আর এ প্রতিক্রিয়ায় বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি ঘটেছে। মূলত ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষের কারণেই আরাকান রাজ্যে এই জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে দীর্ঘদিন থেকেই। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগদস্যুরা পরিকল্পিতভাবে সেদেশ থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করতে চায়। আর সে ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই গত ২৫ আগস্ট আরাকান রাজ্যে নতুন করে হত্যাযজ্ঞ ও নিধনযজ্ঞ শুরু করা হয়েছে। মিয়ানমার বাহিনী ও বৌদ্ধ জঙ্গিরা রোহিঙ্গাদের কুপিয়ে, জবাই ও গুলী করে, আগুনে পুড়িয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। নারীদের গণহারে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসীদের জিঘাংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু ও বৃদ্ধরাও। ফলে আশ্রয়হীন মানুষের শ্রোত বাংলাদেশ মুখী হয়েছে। চলমান সহিংতায় এ পর্যন্ত ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান। তারা খোলা আকাশের নীচে অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী একদিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগতভাবে নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে পরিকল্পিতভাবে আবারও গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরার আয়োজন করছে বলেই মনে হচ্ছে। তাই রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে ফের সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অং সান সুচিকে ফাঁদে ফেলে দেশটির ব্যাপক ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী ফের ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মিয়ানমারের ৭০ বছরের ইতিহাসে ৫৫ বছরই শাসন করেছে সেনাবাহিনী। দেশটিতে আবার সেনাশাসন ফিরতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন। ২০১৫ সালে একটি অবাধ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনী এখনও দেশটির দন্ডমুন্ডের কর্তা।
সংসদে ২৫ ভাগ আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তারা। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো এখনও সেনাবাহিনীর দখলেই রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব মন্ত্রণালয়ের ওপর দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেতা সুচির কোনো ক্ষমতাই নেই। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে সেনাবাহিনী। ক্ষমতায় টিকে থাকতে সুচি প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
চাইলেও সেনাবাহিনীর ক্ষমতার লাগাম টানার ক্ষমতা নেই কথিত গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সুচির। তাই রাখাইনে গত ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের’ কথিত হামলার পরপরই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’-এর অনুমতি দেয়া হয় সেনাবাহিনীকে। সমালোচকরা বলছেন, সুচিকে আরও দুর্বল ও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু করতে সেটি ছিল সামরিক বাহিনীর নীলনকশার একটি অংশ। এরপর সেখানে সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে চলেছে। খোদ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, রাখাইনের ৪৭১টি রোহিঙ্গা গ্রামের ১৭৬টি তথা ৪০ ভাগ গ্রাম এখন জনশূন্য। গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের বাস ছিল।
এ পরিস্থিতিতে সেনা অভিযানের নিন্দা জানানোর জন্য সুচির ওপর চাপ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং তারই এক সময়ের ঘনিষ্ঠজনরা। তবে সুচি তাতে কর্ণপাত করছেন না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে ফের ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে। সেনারা তাকে দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি রেখেছিল। তিনি আর সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না। তাই তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির ক্যাথলিক ধর্মগুরু কার্ডিনাল চার্লস মং বো।  টাইম ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, সুচির অবস্থান নড়বড়ে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র এখনও ভঙ্গুর। সুচি ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলেও এখন ‘দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছেন’। সেনাশাসন ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ‘অন্ধকার বাহিনী (ডার্ক ফোর্স)’। বো বলেন, ‘একটি ভুল পদক্ষেপেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হতে পারেন এবং মিয়ানমারে গণতন্ত্রের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, মিয়ানমারের ইতিহাসে সেনাবাহিনী তিনবার গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছে।’
দৃশ্যত সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা থেকেই সুচি রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে হয় নীরব থাকেন, না হয় সেনাবাহিনীর সমর্থনেই কথা বলেন। বেসামরিক রোহিঙ্গাদের গণহত্যা চালিয়েও সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা সন্ত্রাসীদের হত্যা করছে। সুচিও তাদের বক্তব্যই সমর্থন করে যাচ্ছেন। যা রাখাইন পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটিয়েছে এবং রোহিঙ্গা গণহত্যাকে উৎসাহ যুগিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীর সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে সুচি সারা দুনিয়া থেকে যেভাবে নিন্দা কুড়াচ্ছেন, যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন তাতে তার অবস্থান উল্টো আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী এখনও তাকে সমর্থন দেয়। তবে তিনি ক্ষমতাহীন নেত্রী- এ ধারণা জনমনে বদ্ধমূল হলে তাতে সেনাবাহিনীর অবস্থানই পাকাপোক্ত হবে।
সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্ষমতা আরোহণ হচ্ছে বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো মনে করছেন তথ্যাভিজ্ঞ মহল। কারণ এতে ক্ষমতা রাখাও বিপজ্জনক, ছাড়াও বিপজ্জনক। মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দীর্ঘকালব্যাপী আন্তর্জাতিক বিধি-নিষেধের ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটাতে বাধ্য হয়েছে। অং সান সুচির জন্য সামনের সময়টি বিপজ্জনক এবং স্পর্শকাতর। সেনাবাহিনী বাধ্য হয়ে বেসামরিক সরকারকে গ্রহণ করলেও তারা সময়ান্তরে মিসরের সেনাপ্রধান আবুল ফাত্তাহ আল সিসির মতো সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। যা সুচির জন্য মহাবিপদ ঢেকে আনতে পারে।
টাইম ম্যাগাজিনকে কার্ডিনাল বো বলেন, ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা দেশটির চেয়েও বড়। বিশ্বজুড়ে ইসলাম ভীতি ও ক্ষমতাধর দেশগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করলেও তারা এতে তৃপ্ত থাকতে পারেনি। বরং  অনেক দেশেই  ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার কষ্ট লাগে যে কিছু লোক উগ্র জাতীয়তাবাদী অনুভূতি ছড়াচ্ছে। রাখাইনের লোকজন চরম দুর্ভোগ, অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার’।
মিয়ানমারে খ্রিষ্টানরা রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বললেও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে দেশটির বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বরং রোহিঙ্গা দমনে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। অনেকেই বলেন, এর কারণ তাদের উগ্র ইসলাম বিদ্বেষ। সাম্প্রতিক সময়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সুচির শাসনেও ইসলাম বিদ্বেষ প্রচার করে বেড়াচ্ছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। যা রাখাইন পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।
বিবিসির সাংবাদিক ফার্জাল কিয়েন মান্দালয়ের কিম উন মিন জি মঠে আট সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলেন। তাদের একজন আইন্দার সাক্কা বিউইনথা বলেন, ভারতের দিকে তাকান। সেখানে ইসলামী অনুপ্রবেশকারীরা লোকজনকে মুসলিম হতে বাধ্য করেছে। তার কথার অর্থ হল রাখাইন যাতে মুসলিম জনপদ না হয় সে জন্য তারা রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে সহায়তা দিচ্ছে। উগ্র বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মা বা থা বলেন, বাঙালি (রোহিঙ্গা) ইস্যুতে সুচি সঠিক পথেই আছেন। তিনি সঠিক কথাই বলছেন। ফার্জাল কিয়েন লিখেছেন, বেশিরভাগ বৌদ্ধের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো সহানভূতি দেখা যাচ্ছে না।
তিনি লিখেছেন, রাখাইন রাজ্যে মানবাধিকার ও মানবিকতার ট্র্যাজেডি আসন্ন। চলমান দমন-পীড়ন আরও বেশ কিছুদিন চলতে পারে। তবে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের যে মুখোশ রাখাইনে উন্মোচিত হয়েছে তা দেশটির ভবিষ্যতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নিপীড়ন সত্ত্বেও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া।
বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের অবস্থানও মিয়ানমারের পক্ষে। কেননা, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে নৃশংসতা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে উপস্থিত হয়ে সুচি সরকারকে সমর্থন দেন। সাফ জানিয়ে দেন, রাখাইনে উগ্রপন্থী সহিংসতা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে একমত পোষণ করছে ভারত। এদিকে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ভারত সরকার ত্রাণ পাঠিয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন। যা ভারতের দ্বৈতনীতির বহিঃপ্রকাশ।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে ভারত এখন কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার মতো ভারতও মিয়ানমারের সঙ্গে আছে। সম্প্রতি ঢাকায় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। জানা যায়, ৫০ বছরের সেনা শাসনকালে মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। আবার চীনে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। রাশিয়ার আছে চেচেন বিদ্রোহী। তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বিপরীত অবস্থানের মতো কৌশলগত স্বার্থও চীন ও রাশিয়ার রয়েছে। মিয়ানমারের উদ্দেশ্য হল রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে একেবারে বের করে দেয়া। কার্যত সেটিই করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল থেকে বলা হচ্ছে, চীন কৌশলগত দিকটার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ চীন দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তার করে আছে। মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ হলে কারা আসবে সবাই তা জানে। সে জন্য চীন সেটা উৎসাহিত করে না। রাশিয়ার কারণও একই। তারাও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চায় না। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হলে তাদের দেশেও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ ওঠে। সেখানেও হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসতে পারে। সে জন্য তারা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে বাধা দিচ্ছে। ভারতের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভারত অনেকটা ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমার কাউকেই অখুশি করতে চায় না। এখন বাংলাদেশ কতটুকু বোঝাতে সক্ষম হবে তার নির্ভর করেই ভারতের নীতি স্থির হবে।
তথ্যাভিজ্ঞমহল মনে করেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেকায়দায় পড়েছে। রাষ্ট্রগুলো এ সমস্যাকে মানবিকতার বদলে কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে নিয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রগুলোর চেয়েও বহির্বিশ্বে জনমত গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব¡ারোপ করা। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষে একটা উচ্চ নৈতিক গ্রাউন্ড আছে। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে জনগণের মতামত বাংলাদেশের পক্ষে আছে। বাংলাদেশের পাবলিক ডিপ্লোমেসি এবং মিডিয়ায় মানবিক গ্রাউন্ডের প্রচারকে সামনে এনে জনমত গড়তে হবে। এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের তেমন কিছু করণীয়ও নেই।
মিয়ানমারের অস্ত্র সরবরাহ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ পর্যন্ত এই দেশগুলোই করে। ফলে মিয়ানমারকে সঠিক পথে আনতে তারা ভূমিকা রাখতে পারে। দেশগুলো মানবিকতার পক্ষে থেকেও মিয়ানমার থেকে সুযোগ নিতে পারে। এ বিষয়গুলো চীন, রাশিয়া ও ভারতকে বোঝানো উচিত। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে গত ২৫ আগস্ট জঙ্গি হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে। অভিযানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ সব রকমের নিষ্ঠুরতা দেখায়। সেনা অভিযানে তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়।
সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে হতভম্ব করে দেয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান এটিকে জাতিগত নিধনের পাঠ্যবই উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক বসে। এবং রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেয়। তবে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো কড়া পদক্ষেপে যায়নি। কারণ স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়ার ভেটো দেয়ার আশঙ্কা ছিল। রাখাইনে গণহত্যার বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় গণ আদালতে শুনানি হচ্ছে।
রাখাইনে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করেন। সেখানে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সুচির উদ্দেশে প্রকাশ্যে বক্তৃতায় বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে উগ্রপন্থী সহিংসতা নিয়ে আমরা আপনার উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করি, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিরপরাধ জীবন যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে।’ এরপর ১২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন চায় চীন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, মিয়ানমার সরকার তাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে চেষ্টা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তার পাশে থাকা। ১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।’ এতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘আমরা মিয়ানমার সরকারের পক্ষে আমাদের সমর্থন প্রকাশ করছি এবং সন্ত্রাসীদের প্ররোচনা এড়িয়ে চলতে সব ধর্মের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
বাস্তবতা হল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার মতো ভারতও মিয়ানমারের সঙ্গে আছে এবং থাকবে। জানা যায়, ৫০ বছরের সেনা শাসনকালে মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। আবার চীনে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। রাশিয়ার আছে চেচেন বিদ্রোহী। তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বিপরীত অবস্থানের মতো কৌশলগত স্বার্থও চীন ও রাশিয়ার রয়েছে। মিয়ানমারের উদ্দেশ্য হল রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে একেবারে বের করে দেয়া।
কারণ, তারা বিশ্বময় মুসলিম বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারকে মুসলিম শূন্য করতে চায়। আর এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়ে যাচ্ছে ভারত, চীন ও রাশিয়ার মত রাষ্ট্র। তাই আরাকানে গণহত্যা বন্ধে মুসলিম উম্মাহকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে বিশে^র শান্তিকামী মানুষকে।
smmjoy@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ