বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

তুর্কি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যাকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম। বাংলাদেশে তিন দিনের সফরকালে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালিতে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মুখে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং আগুন দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার বর্ণনা শোনার পর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযান চালানো হচ্ছে। অবিলম্বে এই অভিযান বন্ধ করার এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদে তাদের দেশে ফেরৎ পাঠানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার এবং সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে কি হচ্ছে এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জাতিগত নিধনের অভিযান চালাচ্ছে সে সব বিষয়ে জাতিসংঘকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানোর এবং তারা যাতে সকল অধিকারসহ নিরাপদে বসবাস করতে পারে সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একযোগে কাজ করা দরকার। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসার জন্যও জাতিসংঘ এবং সকল রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী। শুধু দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করার এবং আহ্বান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। সফরের শেষদিনে কক্সবাজারের কয়েকটি আশ্রয় শিবির পরিদর্শনকালে দুটি মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধন করেছেন এবং জেলা প্রশাসকের কাছে দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি স্টাফ কার বুঝিয়ে দিয়েছেন। পায়ে হেঁটে এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মতো মাটিতে বসে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা শোনার মধ্য দিয়েও নিজের তথা তুরস্কের আন্তরিকতার প্রমাণ রেখে গেছেন প্রধানমন্ত্রী ইলদিরিম। উল্লেখ্য, তিনিই প্রথম নন, তারও আগে ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে আসা শুরু করার পরপর সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি মিসেস এরদোগান। তার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমর্থনে ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। 

সে ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে নানাভাবে তুরস্ক রোহিঙ্গাদের এবং বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে। এখনো দেশটির সাহায্য অব্যাহত রয়েছে। তুরস্ক একই সাথে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ইলদিরিম বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠককালেও তিনি শুধু আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেননি, রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানোসহ দ্বিপক্ষীয় ও পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গিকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। 

আমরা তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিমের বক্তব্য এবং আহ্বানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। লক্ষণীয় যে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ চালানোর অভিযোগ উত্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনি সঠিকভাবেই সমস্যার প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই তুরস্ক মিয়ানমার বিরোধী বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছে। মূলত তুরস্কের এই অবস্থানের কারণেই ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত তৎপর না হয়ে পারেনি। সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধেই নিরাপত্তা পরিষদ এক সর্বসম্মত বিবৃতিতে অবিলম্বে রাখাইন রাজ্যে চলমান গণহত্যা ও সহিংসতা বন্ধ করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। জাতিগত নিধনের কথা না বললেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরাপত্তা পরিষদ ওই বিবৃতিতে বলেছিল, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর ‘মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ’ করছে। এই সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাসহ সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন ও সমান সুযোগ বজায় রাখার জন্যও আহ্বান জানিয়েছিল নিরাপত্তা পরিষদ।

ওদিকে নিরাপত্তা পরিষদ সংযম দেখালেও জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস কিন্তু সে সময়ই বলেছিলেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ চালানো হচ্ছে। এই অভিযানকে ‘সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য’  বলে অভিমত প্রকাশ করে মহাসচিব গুতেরেস আরো বলেছিলেন, গণহত্যা ও সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের সকলকে অবশ্যই নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার এবং আইনসম্মত নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ও অধিকারের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগ দিতে হবে।

বলা দরকার, মূলত চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ তথা জাতিসংঘের পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হলেও সাধারণভাবে বিশ্ব জনমত রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষেই রয়েছে। এই সমর্থন ক্রমাগত আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলেই মিয়ানমারকে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ পর্যন্ত গঠন করতে হয়েছে। ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার চাতুরিপূর্ণ কৌশলও কম নেয়নি। এখনো দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশেষ করে তুরস্কের বলিষ্ঠ অবস্থান ও ভূমিকা রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্যও সুফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ব্যাপারে সরকারকেই উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ইলদিরিমের বক্তব্য ও আহ্বানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো গেলে জাতিসংঘসহ সকল দেশ ও সংস্থাও রোহিঙ্গাদের পক্ষে আসবে বলে আশা করা যায়। কারণ, তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আধুনিক রাষ্ট্র। সুতরাং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির আহ্বানে যেমন সমর্থন পাওয়া যাবে তেমনি মিয়ানমারের পক্ষেও তুরস্ককে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। তেমন অবস্থায় রোহিঙ্গা মুসলিমরা নাগরিকত্ব এবং সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারসহ নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার এবং নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ পাবে বলেই আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ