শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

যথাযোগ্য মর্যাদায় রাজশাহীতে মহান বিজয় দিবস উদযাপিত

রাজশাহী অফিস : যথাযোগ্য মর্যাদায় গতকাল শনিবার রাজশাহীতে মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে এবং সকালে রাজশাহীর শহীদ মিনারগুলোতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। এসময় শহীদ মিনারগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
রাতে ভুবনমোহন পার্ক শহীদ মিনারে প্রথমেই রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার পক্ষে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় রাসিক, জেলা আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ, বাসদ, সিপিবি, জেলা যুবলীগ, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।  
রাত ১২টা এক মিনিটে রাজশাহী কলেজ শহীদ মিনারে প্রথমেই কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষক-কর্মকর্তারা কলেজের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সেখানেও নামে মানুষের ঢল। এই শহীদ মিনারে মহানগর ও জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের নেতৃত্বে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন ব্যবসায়ী এবং সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের শহীদ মিনারে ভোরে প্রথমেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর রহমান। এরপর জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক এম খুরশীদ হোসেন, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবর রহমান ও জেলা পুলিশ সুপার মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকারও। পরে এক মিনিট নিরবতা পালনের মধ্যে দিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়া এসময় দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে সকালে জেলার সকল প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া সকল সরকারি হাসপাতাল, শিশুসদন ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিবেশন করা হয় উন্নতমানের খাবার। দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকে জেলা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নেয় বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। আলোকসজ্জা করা হয় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে প্রদর্শন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রও। জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন দিবসটি উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করে।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন বিকেলে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে মেয়র একাদশ বনাম বিভাগীয় কমিশনার একাদশের মধ্যে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এছাড়া রোববার বিকেলে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বসবাসরত খেতাবপ্রাপ্ত ও সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্বর্ধনা জানাবে সিটি কর্পোরেশন।
দিবসটি উপলক্ষে শনিবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবকও অর্পণ করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ওয়ার্ড কার্যালয়গুলো থেকে মাইকে প্রচার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং দেশাত্ববোধক গান। বিকেলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাজশাহীতে বিজয় র‌্যালি বের করা হয়। 
বিকেলে রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে মহানগর বিএনপি কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন মহানগর মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ও মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম খোকা।
ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজশাহীতে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইসলামী ব্যাংক ফাউ-েশন পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে বর্ণাঢ্য বিজয় দিবস র‌্যালি বের করা হয়। আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণ, বিনামূল্যে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প প্রভৃতি কর্মসূচির।
ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ : গতকাল ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের প্লে-গ্রাউন্ডে আয়োজন করা হয় বিজয় দিবসের আলোচনা সভা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। কলেজ সেক্রেটারি আবদুল আজিজ রিয়াদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডাঃ মোঃ নজরুল ইসলাম। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ডাঃ মোঃ আব্দুল মুকিত সরকার, প্রফেসর ডাঃ মোঃ ওবায়দুল্লাহ, প্রফেসর ডাঃ মামুন উর রশীদ, প্রফেসর ডাঃ সৈয়দ মোঃ গোলাম কিবরিয়া, প্রফেসর ডাঃ মোঃ এমদাদুর রহমান প্রমুখ। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন।
ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্যোগে বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং ও রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রাজশাহীর ডাইরেক্টর প্রফেসর ডাঃ মোঃ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে হাসপাতালের প্রশাসনিক ইনচার্জ সাইফুল আলমসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল: মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের উদ্যোগে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল রাজশাহীর সিনিয়র অফিসার (প্রশাসন) ছামিউল হক ফারুকীর পরিচালনায় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডাঃ মোঃ মাসুদ আলী। অনুষ্ঠানে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল হান্নানসহ অন্য কমকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ক্যাম্পে মোট ১০৫ জনের ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং করানো হয়।
মানব মানচিত্রের ডিসপ্লে: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মানব মানচিত্র তৈরি করেছেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় রাজশাহী কলেজ মাঠে মানব মানচিত্রের ডিসপ্লে করা হয়। এতে অংশ নেন কলেজের সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থী।
রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা: হবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, রাজশাহী কলেজ মাঠে মানব মানচিত্রের ডিসপ্লে করেছে শিক্ষার্থীরা এটা অনেক আনন্দের। রাজশাহী কলেজ সৃজনশীলতার প্রতীক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এসে বলেছে, তারা শহীদ মিনার তৈরি করবে। গত বছরের আগের বছরে মানব পতাকা ও গত বছর মানব শহীদ মিনার তৈরি করা করা হয়। কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, আমরা গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে পরিকল্পনা করছিলাম মানব মানচিত্র তৈরির। যার ডিসপ্লে করা হলো আজ (গতকাল)। এর আগে মানব শহীদ মিনার ও মানব পতাকা করেছিলাম। এবার আমরা মানব মানচিত্র তৈরি করলাম।
মহান বিজয় দিবসের সভায় রাজশাহী জামায়াত নেতৃবৃন্দ : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজশাহী মহানগর জামায়াত আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নেতারা বলেছেন, দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় সূচিত হয়েছিল। দেশের আপামর ছাত্রজনতা, কৃষক, শ্রমিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের কথা বলার অধিকার, ইতিহাস ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করতে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়নি। বরং দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। গতকাল শনিবার বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরীর উদ্যোগে নগরীর একটি মিলনায়তনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট আবু মোহাম্মাদ সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় দলটির মহানগর শাখার অন্য নেতারা বক্তব্য দেন। সভায় নেতারা বলেন, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা বিকাশের পরিবর্তে পুরাতন কল-কারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে ভারতের মার্কেটে পরিণত করার কারণে বহুল সম্ভাবনাময় বস্ত্র ও পাট শিল্প আজ হুমকির মুখে। ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর প্রদান এবং বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে মানুষ হত্যার ফলে আজ আমরা অরক্ষিত। তারা আরো বলেন, দেশের মানুষ এখনও অধিকাংশ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। স্বাধীন দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে অনবরত গুপ্ত হত্যা চলছে এবং বছরের পর বছর নিরপরাধ মানুষদের কারাগারে বন্দীজীবন কাটাতে হচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, মানবতাবোধকে উজ্জীবিত করার পরিবর্তে সরকার বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অপবাদ দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের আটক করেছে। জামায়াতের অগ্রযাত্রায় ভীত হয়ে বর্তমান সরকার জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে অন্যায় গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে আমীরে জামায়াত ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ কারাগারে আটক সকল নেতার মুক্তি দাবি করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ