মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ছাত্ররাজনীতি যেনো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে!

জিবলু রহমান [দুই] :  বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের খাদ্যসংকট দেখা যাচ্ছে। তিতুমীর কলেজ থেকে বুয়েটের ক্যানটিন-কোথাও যেন তাদের কিনে খাওয়ার অবস্থা নেই। কোথাও বাকির নামে ফাঁকি আর কোথাও মাগনা ভোজনের দাবি তুলে ছাত্রলীগ তার ‘গৌরবের ঐতিহ্যকে’ যে ধুলায় লুটাচ্ছে, তা কি দেখার কেউ নেই? অনাহারে থেকে থেকে তারা কি এতই দুর্বল হয়ে গেছে যে রেস্তোরাঁয় মার খেয়ে পালিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নিরীহ গাড়ি ভাঙচুর করে ঝাল মেটাচ্ছেন। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৮ জুলাই ২০১৫)। সাম্প্রতিক সময়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও মারাত্মকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে টেন্ডারবাজিতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে সন্ত্রাসীরা।

বর্তমান সমাজে অসহিষ্ণুতা সমস্যাটি তীব্র আকার ধারণ করেছে। আগের যুগে মানুষের চাহিদা ছিল সীমিত। তাই মানুষের সম্পর্কও ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু আজ নানা কারণে মানুষের আচরণের সহজ-সরল বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমেই লোপ পেয়ে তা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আর তার চাক্ষুস প্রমাণ পাওয়া গেল উচ্চ আদালতের একটি রায়ে। 

৩১ অক্টোবর ২০১৭ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত রাজধানীর পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় হাইকোর্টের ৮০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যালোচনা করে আদালতের কিছু আক্ষেপ জাতির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। 

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কুপিয়ে খুন করে বিশ্বজিৎ দাসকে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে বিশ্বজিত দাসের দর্জি দোকান ছিলেন। তিনি থাকতেন লক্ষ্মীবাজার। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। এই হত্যাকা-ের পরপরই সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবির জড়িত। হত্যাকা-ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট হলে সরকারের সংশ্লিষ্টরা তখন অভিযোগ করেন বিশ্বজিতের আত্মীয় স্বজন জামায়াত-শিবির করে।

শুরু থেকেই বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে গণমাধ্যম যতখানি সরব ছিল, ততখানি তৎপর ছিল না পুলিশ। বিশ্বজিৎ হত্যার তদন্তের নানা অসংগতিও গণমাধ্যমে উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত বিচারিক আদালতের রায়ে ৮ জনকে মৃত্যুদ- ও ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। এরপর মামলা হাইকোর্টে আসে। ৬ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আটজনের মধ্যে দুজনের মৃত্যুদ- বহাল রাখেন, চারজনের মৃত্যুদ- কমিয়ে যাবজ্জীবন ও দুজনকে খালাস দেন। যদিও মৃত্যুদ- পাওয়া ওই দুজন এখনো পলাতক। 

বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বলেছেন, দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতিকে কলুষিত করছে কিছু যুবক। ছাত্র রাজনীতির নামে তারা সংঘবদ্ধভাবে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। রাজনৈতিক নেতাদের নিজস্ব এলাকায় আধিপত্যকে ধরে রাখার জন্য মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে এবং হিংস্রভাবে শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়। কিছু তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা তাদের নিজস্ব স্বার্থে ছাত্রদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ছাত্রনেতাদের ছাত্রাবাসের প্রশাসন চালানো, জোর করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়ার মতো প্রবণতারও সমালোচনা করা হয়েছে। তথাকথিত কিছু রাজনীতিবিদ নিজেদের স্বার্থে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন বলেও রায়ে বলা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেছেন, ‘দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস কিছু তরুণের জন্য কলঙ্কিত হচ্ছে। যাঁরা ছাত্ররাজনীতির নামে প্রকৃতপক্ষে সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ত। এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য কখনো কখনো তাঁদের ক্ষমতা-শক্তির প্রকাশ্য ও নির্মম প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে। কিছু তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা নিজেদের স্বার্থে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাও করেন। সংবাদপত্রে এ-ও দেখেছি যে পাবলিক পরীক্ষায় নকল করতে না দেওয়ায় শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে। অনেক ছাত্রাবাসে তাঁরা প্রশাসন নিজের হাতে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিট ভাড়া দেন। বিশাল কর্মী বাহিনী দেখিয়ে প্রশংসা ও বাড়তি কৃতিত্ব পেতে তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সভা ও শোভাযাত্রায় অংশ নিতে বাধ্য করেন। এটি উদ্বেগ ও হতাশাজনক পরিস্থিতি। জাতি এ থেকে পরিত্রাণ চায়। এটি আশা করা যায় যে সরকার ও বিরোধী পক্ষের দায়িত্বশীল জাতীয় নেতারা এই সমস্যার সমাধানে ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলন বিষয়ে নীতি গ্রহণ করবেন। তাঁরা অবশ্যই তরুণ এবং শিক্ষার্থীদের আইন নিজের হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষের কর্মীদের প্রতিরোধে উৎসাহ দেবেন না, এমনকি পরিস্থিতি সংঘাতপূর্ণ এবং বিশৃঙ্খল হলেও। কেননা এসব সংঘাতপূর্ণ ও বেআইনি কর্মকা- দেখার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। 

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘তরুণ অনুসারীদের উদ্দেশে রাজনৈতিক নেতাদের এমন আগুন ধরানো বক্তব্য দিতে দেখি, যেখানে ধ্বংসাত্মকভাবে হলেও প্রতিরোধ করার কথা বলা হয়। অভিযুক্ত শাকিল ও ইমদাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে দেখা যায় যে ঘটনার আগের দিন তাঁদের নেতারা যেকোনো মূল্যে প্রতিপক্ষের কর্মীদের প্রতিরোধ করতে নির্দেশনা ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন। সেই কথিত নেতারাই সেদিনের (হত্যাকা-ের দিন) অবরোধবিরোধী কর্মসূচির নেতৃত্বে ছিলেন। ঘটনার পর তাঁরা অনুসারীদের মৃত্যুর মুখে ফেলে দৃশ্যপটের বাইরে চলে যান।’

শাকিল ও রাজনের মৃত্যুদ- বহাল রাখার বিষয়ে রায়ে বলা হয়, ‘এই হতভাগ্য তরুণ বিশ্বজিৎ অবরোধের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো রাজনৈতিক দলেই ছিলেন না। হামলার সময় তিনি ছিলেন পুরোপুরি অরক্ষিত ও অনিরাপদ। এমনকি অভিযুক্তদের কাছে দয়াভিক্ষা চেয়েছিলেন, কিন্তু অভিযুক্তরা তা শোনেনি। এটি প্রকাশ্য দিবালোকে বর্বর হত্যাকা-, যা জনসাধারণের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। অপরাধের মূল দায় শাকিল ও রাজনের, যারা প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে বিশ্বজিতের ওপর আঘাত করেছিল। তরুণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তাদের পরিচয় এই অপরাধের গুরুত্ব কমায় না। তাই আমরা তাদের মৃত্যুদ-ের সাজার বিষয়টি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখার যুক্তি খুঁজে পাই না।’

কয়েকজনের সাজা কমানোর বিষয়ে রায়ে বলা হয়, অভিযুক্ত নাহিদ, শাওন, ইমদাদ এবং লিমন বিশ্বজিতের ওপর প্রাণঘাতী কোনো আঘাত করেননি। কিন্তু তাঁদের সেখানে অবস্থান ও ঘটনায় অংশগ্রহণ অভিন্ন উদ্দেশ্য প্রমাণ করে। যদিও এই চারজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অতীত অপরাধের ইতিহাস নেই। তাঁরা সবাই তরুণ এবং তাঁদের মধ্যে নাহিদ, শাওন এবং ইমদাদ প্রায় পাঁচ বছর ধরে মৃত্যুদ-াদেশ পাওয়ার যন্ত্রণা ভোগ করছেন। তাঁরা স্বভাবগত অপরাধী নন এবং ছাড়া পেলে তাঁদের অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনা খুব কম।’ এ ক্ষেত্রে নালু বনাম রাষ্ট্র মামলার উদাহরণ তুলে ধরা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ