বুধবার ২০ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

ফিলিস্তিনসহ সারা মুসলিম বিশ্বে বিক্ষোভ

সংগ্রাম ডেস্ক : বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনের জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একতরফা স্বীকৃতি দেয়ার পরই বিক্ষোভ-প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো মুসলিম বিশ্ব। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে তারা মার্কিন পতাকায় আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করছে বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা। ওদিকে হোয়াইট হাউজ সতর্ক করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সঙ্গে মাহমুদ আব্বাসের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করলে তা ফিলিস্তিনের জন্য ‘উল্টো ফল’ বয়ে নিয়ে আসবে।
অপরদিকে ওআইসি বলেছে, ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘোষণা দিয়েছেন তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্পের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গত বৃহস্পতিবার দিনভর বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে এবং পাথর নিক্ষেপ করে প্রতিবাদ জানান।
তারা একপর্যায়ে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইসরাইলি বাহিনী বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতি টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলী ছুড়তে থাকে। এতে অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হন।
অপরদিকে, তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের বাইরে বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকও সমস্ত মুসলিমকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, যেকোনো স্থানের মুসলিমদের এটা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিতে হবে যে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এমন ঘোষণার কড়া নিন্দা জানাচ্ছি।
এছাড়া, গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভে জ্বলে ওঠে পুরো মুসলিম বিশ্ব। প্রতিবাদে বাংলাদেশেও গতকাল বিক্ষোভ করে বিভিন্ন সংগঠন।
শুধু মুসলিমরাই নন, সারা বিশ্বই ট্রাম্পের এ ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এ ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে আমি নীরব থাকতে পারি না।’ তিনি পবিত্র শহরটিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান।
জেরুসালেম বিষয়ে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি পাল্টে দেয়া ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্ররাও। ট্রাম্পের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁেক্রা। গত বৃহস্পতিবার এক টুইট বার্তায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেও বলেছেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত শান্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবে না। তিনি বলেন, জেরুজালেমে ইসরাইল ও ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব থাকা উচিত।
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল জানান, তার দেশ জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেবে না। জেরুসালেমের মর্যাদা শুধু দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, ইসরাইলে তার দেশের দূতাবাস তেল আবিবেই থাকবে। তার কথায় স্পষ্ট যে, কানাডা জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, সৌদি আরবও এ স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্পের ঘোষণা নাকচ করেছে আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ।
হোয়াইট হাউজের হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সঙ্গে মাহমুদ আব্বাসের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করলে তা ফিলিস্তিনের জন্য ‘উল্টো ফল’ বয়ে নিয়ে আসবে বলে সতর্ক করেছে হোয়াইট হাউজ।
বিবিসি জানায়, এ মাসের শেষের দিকে পেন্সের ফিলিস্তিন সফরে যাওয়ার এবং প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনের এক জ্যেষ্ঠ নেতা পেন্সকে ‘স্বাগত জানানো হবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার সকালে আব্বাসের ফাতাহ পার্টির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জিব্রিল রাজব বলেন, পেন্সকে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে স্বাগত জানানো হবে না। এ বিষয়ে আব্বাস এখনও কোনো মন্তব্য করেননি।
পরে ওই দিন হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভাইস-পেসিডেন্ট পূর্ব নির্ধারিত সময়েই ওই বৈঠক আয়োজন চান।
“মাইক পেন্স এখনও আব্বাস ও ফিলিস্তিনের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। ওই বৈঠক বাতিলের কোনো পরিকল্পনা তাদের জন্য উল্টো ফল বয়ে নিয়ে আসবে।”
গত বুধবার হোয়াইট হাউজে এক ভাষণে ট্রাম্প জেরুসালেমকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান।
ট্রাম্পের এ ঘোষণা জেরুসালেমের স্বীকৃতি দেওয়ার মত স্পর্শকাতর একটি বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের অবস্থানের পুরো উল্টো নীতি।
ওই ঘোষণার পর গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৩১ ফিলিস্তিনি।
বেথলেহেম, রামাল্লাহ ও অন্যান্য শহরগুলোতেও বিক্ষোভ-সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে ৪৯ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট।
ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের দল হামাস এরই মধ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন ইন্তিফাদা (গণআন্দোলন) শুরুর ডাক দিয়েছে।
হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভ-সমাবেশ করার জন্য ফিলিস্তিনি, মুসলিম এবং আরবদেরকে আহ্বান জানিয়ে দিনটিকে ‘ ক্ষোভ দিবস’ বলে অভিহিত করেছেন।
ফিলিস্তিন থেকে পেন্সের ইসরাইল ও মিশর যাওয়ার কথা রয়েছে।
ওআইসির প্রতিক্রিয়া
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) বলেছে, ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘোষণা দিয়েছেন তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া, ট্রাম্পের এ ঘোষণার মধ্যদিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর বৃহত্তম এ সংস্থা এসব কথা বলেছে। ওআইসি আরো বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত বিশ্বের মুসলমানদের মনে আঘাত দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কথিত শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়ায় আমেরিকা এতদিন যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসছিল তা ধ্বংস হবে এবং আমেরিকার এ অবৈধ ঘোষণায় বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐতিহাসিক ও ইসলামি পরিচিতি মুছে যাবে না। সংস্থাটি বলেছে, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হারাম শরীফের ইমামের মন্তব্য
পবিত্র মক্কা মদিনার পরিচালনা কমিটির প্রধান ও হারাম শরীফের ইমাম ও খতিব শাইখ ড. আব্দুর রহমান আস সুদাইস বলেছেন, বাইতুল মোকাদ্দাস আরব ও ইসলামি শহর এবং এ পরিচয় নিয়েই তা টিকে থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল শুক্রবার তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও তৃতীয় সম্মানের স্থান। বাইতুল মুকাদ্দাস আমাদের প্রিয় হজরত মুহাম্মাদ সা.এর মেরাজ সফরের অংশ।
 সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আবদুল আজিজ থেকে নিয়ে সকল বাদশাহগণই ফিলিস্তিনি জনগণ ও বাইতুল মুকাদ্দাসের ব্যাপারে সর্বদা সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করে আসছেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের সম্মান রক্ষায়ও বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজীজও ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ