সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

মোহাম্মদ নূরুজ্জামান : খুলনার সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

আব্দুর রাজ্জাক রানা : মোহাম্মদ নূরুজ্জামান খুলনার সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিক। ১৯৪২ সালে তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় তার পিতার হাত ধরে এ পেশায় প্রবেশ করেন। এ পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ও সম্পাদনা করেন মওলানা আহমদ আলী। নূরুজ্জামান সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সরকারি অফিসের ডিউটি শেষে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ‘দৈনিক নবযুগ’ অফিসে খ-কালীন কাজ করতেন। ‘দৈনিক নবযুগ’-এ তাঁর বেতন ছিল ৫০ টাকা। অবশ্যই সে সময় এক সের ভাল চাল পাওয়া যেত ৫-৬ পয়সায়। নূরুজ্জামান সে সময় থাকতেন চার নম্বর আন্তনী বাগান লেনে দোতলায় কুড়ি টাকা ভাড়ায় তিন রুমের একটি ফ্লাট নিয়ে।
‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সাত বছর কাজ করার পর প্রতিকূল অবস্থার চাপে পত্রিকাটি ১৯৪৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু’র বড় দা ব্যারিস্টার শরৎ চন্দ্র বসু কলকাতা ডে কার্স লেন থেকে ‘দ্যা নেশন’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। মোহাম্মদ নূরুজ্জামান এ প্রত্রিকায় যোগ দেন। কিন্তু শরৎ বোস আকস্মৎ মারা যাওয়ায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি দৈনিক ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় যোগদান করেন। এর কিছু দিন পর ‘স্বরাজ’ থেকে তিনি চলে যান ‘দৈনিক পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকায়।
১৯৪৯ সালে ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি রামকৃষ্ণ ডালমিয়ার বাঙ্গালী স্ত্রী ১৯ কনভেন্ট রোডের ইন্টালী থেকে ‘দৈনিক সত্যযুগ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি ছিলেন ‘দৈনিক নবযুগ’ এর সম্পাদক মওলানা আহমদ আলী’র বন্ধু। সত্যেন্দ্রনাথ  মজুমদারের ডাকে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান ১৯৪৯ সালের ১৫ জুলাই ‘দৈনিক সত্যযুগ’ পত্রিকায় বার্তা বিভাগে নাইট-ইন-চার্জ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫১ সালে ‘দৈনিক সত্যযুগ-এ তাঁর লেখা একটি খবর প্রকাশ করায় তিনি যেহেতু সরকারি দফতরে চাকরি করতেন তাই তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদে পশ্চিম দিনাজপুর বদলীর অর্ডার ইস্যু করেন বিভাগীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মোহাম্মদ নূরুজ্জামান তখন রাইটার্স-এ গিয়ে বিভাগীয় মন্ত্রী (পরে মুখ্য মন্ত্রী) শ্রীযুক্ত প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সঙ্গে দেখা করেন। মন্ত্রীর কথা তার তেমন মনোপুত না হওয়ায় তিনি তৎকালীন পশ্চিম বঙ্গের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কালীপদ মুখার্জীর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের বদলীর অর্ডার বাতিল করার ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য প্রফুল্ল সেন এবং কালিপদ মুখার্জী অহযোগ আন্দোলনের সময় মওলানা আহমদ আলী’র সঙ্গে ভলেন্টীয়ার হিসাবে ঘুরতেন। এ জন্য তারা মন্ত্রী হওয়ার পরও মওলানা আহম্মদ আলীর সাথে দেখা হলে পায়ের ধুলা কপালে স্পর্শ করেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। এসব কথা মওলানা আহমদ আলী জীবিত থাকাকালে বহুবার তার নিকটজন ও সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন।
এরপর মোহম্মদ নূরুজ্জামান তার পূর্বের জায়গায় বহাল হলেও তিনি মর্মাহত হন এবং চাকরি থেকে ইস্তোফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এসময় বিলেতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ব্যারিস্টার হাসান ইস্পাহানী এক সপ্তাহের ছুটিতে কলকাতায় আসেন। তখন মওলানা আহমদ আলী’র সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় একটি সংবাদপত্র প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করে তার সহযোগীতা কামনা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক মতবাদে যেহেতু মওলানা আহমদ আলী মুসলিম লীগ বিরোধী, তাই সরাসরি সহযোগীতার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্ত মোহাম্মদ নূরুজ্জামান এ সময় ইস্পাহানী সাহেবকে তার একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। ব্যারিস্টার হাসান ইস্পাহানী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে বিলেতে নিয়ে তার অফিসেই চাকরি দিতে চান। কিন্তু  তার পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনিত হওয়ায় তাদের প্রতি সেবার বিষয় চিন্তা করেই বিলেত যেতে অসম্মতি জানালেন। অতঃপর ব্যারিস্টার ইস্পাহানী খুলনাস্থ ইস্পাহানী ম্যাচ কোম্পানীর জিএমকে একটা চিঠি লিখে দেন (১৯ জানুয়ারী ১৯৫২ সাল)। চাকরি ঠিক হলেও সাংবাদিকতায় এমন নেশা ধরেছে যে ঐ সময় কলকাতা ত্যাগ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বার্ধক্যজনিত কিছুটা শারীরিক অচলাবস্থায় মওলানা আহমদ আলী কলকাতা ত্যাগ করে খুলনায় নিজ গ্রাম ডুমুরিয়ার মেছাঘোনা গ্রামে এসে বসবাস করতে থাকেন। নূরুজ্জামান কলকাতায় বসে মাঝে-মধ্যে তার আব্বার গুরুতর অসুস্থতার খবর পান। তখন তিনি কলকাতায় বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পত্রিকা ও সরকারি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে খুলনায় চলে আসেন। তিনি ব্যারিস্টার হাসান ইস্পাহানীর পত্র দেখিয়ে ইস্পাহানী ম্যাচ ফ্যাক্টরীতে এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ অফিসারের পদে যোগদান করেন। একই সাথে কলকাতার ‘দৈনিক সত্যযুগ’ পত্রিকার স্টাফ করেসপনডেন্টের দায়িত্ব নেন। এ সময় ‘শ্রমিক নির্যাতনে ইস্পাহানী গোষ্ঠীর ভূমিকা’ শিরোনামে দৈনিক সত্যযুগ পত্রিকায় নূরুজ্জামান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর কিছুদিন পর ইস্পাহানী এমপ্লয়েজ এসোসিয়েশন গঠিত হয়। এ এসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন সাংবাদিক মোহাম্মদ নূরুজ্জামান।
১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইস্পাহানীতে চাকরি করার পর স্বেচ্ছায় তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। চাকরি থেকে অব্যাহতি নেয়ার পর নূরুজ্জামান একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্য ১৯৬৯ সালের ১০ অক্টোবর খুলনার ডিসি অফিসে আবেদন করেন। ১৯৭২ সালে শেষের দিকে তিনি ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার খুলনাস্থ স্টাফ করেসপনডেন্ট হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিষয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে করে খুলনার সাংবাদিকদের ঐক্যবন্ধ সাংগঠনিক তৎপরতায় যোগ দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া তিনি কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন তথা সংবাদপত্র  শিল্পকে গণমুখি করে তুলতে এবং পেশাজীবী সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য ‘খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব দেখা দেয়। অতঃপর ‘সাংবাদিক ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠার্থে এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ‘খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন’ এর নির্বাচনের জন্য ব্যাপক আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে ২৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
সাংবাদিকদের অভূতপূর্ব ঐক্যে যাতে ফাটল না ধরতে পারে এ জন্য মোহাম্মদ নূরুজ্জামান নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অধিকাংশ সাংবাদিক বন্ধুর অনুরোধে তিনি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সভাপতি পদের জন্য মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করে জমাদিতে বাধ্য হন। মনোনয়নপত্র নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রত্যাহার করায় একমাত্র সভাপতি পদ ছাড়া অন্যান্য সব পদেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ¦ন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন। শুধুমাত্র সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনী ফলাফলে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের উপর নেমে আসে নানা খড়গ। সংবাদপত্র বন্ধের পায়তারাও চলতে থাকে। ঢাকাসহ সারাদেশের সাংবাদিক ও পত্রিকা সেবীরা রুদ্ররোষে গর্জে ওঠেন। ঢাকার বিএফইউজের নেতৃবৃন্দ এক জুরুরী বৈঠকে বসেন। সরকারের এ গণবিরোধী সর্বনাশা নীতি পরিবর্তনের লক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দদের ডেপুটেশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৯ আগস্ট গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে সাংবাদিক ডেপুটেশন যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়। সে মোতাবেক বিএফইউজের নেতৃবৃন্দে’র ডাকে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান কেইউজে’র সভাপতি হিসাবে খুলনা থেকে ঢাকা যান।
১৯৭৪ সালের ১৯ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএফইউজে, ডিইউজে, সিইউজে ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের মতবিনিময় হয়। নেতৃবৃন্দ দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করার পরও শেখ মুজিবর রহমান তার সিদ্ধান্তে অটল বলে জানান। তবে তিনি আশ্বাস দেন যে, কোন সাংবাদিক পত্রিকা বন্ধ করার পর বেকার হবে না। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তাদেরকে চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
এরপর মোহাম্মদ নূরুজ্জামান খুলনায় ফিরে এসে সাংবাদিকদের এক জরুরী বৈঠকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতার ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন। সর্বসম্মতিক্রমে আন্দোলন চলতে থাকে। মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ভাষণ দিতে থাকেন। এরপর একের পর এক ঘটতে থাকে নানা ঘটন-অঘটন। ১৯৮০ সালের ১১ আগস্ট মোহাম্মদ নূরুজ্জামান সম্পাদক ও প্রকাশক হিসাবে ‘সাপ্তাহিক বিশ্ববার্তা’ বের করেন। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা করতেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রের একজন নিয়মিত কথক এবং একজন ইসলামী চিন্তাবিদও।
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান ১৯২১ সালে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার মেছাঘোনা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মওলানা আহমদ আলী ও মাতার নাম লুৎফুন নেছা। ২০০২ সালের ৯ জুলাই খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী রোডস্থ নিজ বাস ভবনে ইন্তিকাল করেন। তিনি মেছাঘোনাস্থ পারিপারিক করবস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে শায়িত আছেন। তিনি এম হেফজুর রহমান, হাফেজ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, মোছাঃ সালেহা বেগম ও আব্দুস সাত্তার নামের চার সন্তান রেখে গেছেন। যারা স্ব-স্ব স্থানে বিভিন্ন খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার বড় ছেলে এম হেফজুর রহমান সাংবাদিকতার পেশায় জড়িত রয়েছেন। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা করছেন। লিখেছেন বহু কবিতাও। তার মধ্যে একটি কবিতার কয়েকটি পংতি দিয়ে শেষ করছি। ‘জানি আর কোনদিন আসবে না/ বকবে না, বলবে না কোথায় ছিলে?/ তুমি চলে গেছো ওপারে, ওই অজানা ঠিকানায়।/ একদিন সবাইকেই যেতে হবে/ ‘জম্মালে মরিতে হবে’ এটাই সত্য, আর সব মিথ্যে,/ তার পরেও মনে এত কষ্ট কেন?/ চোখে এত পানি কোথায় জমানো ছিল? / তুমি যেখানেই থাক, যতদূরেই থাক/ আমাদের মন থেকে কোন দিন যাবে না মুছে।/ মনে অনেক কষ্ট, চোখে পানি ঝরছে অবিরত/ কোথায় গেছো চলে আমাদের ফাঁকি দিয়ে?/ মোনাজাত করি আজ দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে/ তিনি যেন বেহেশত নসিব করেন তোমাকে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ