শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

শান্তিচুক্তির দুই দশক পার ॥ পার্বত্যাঞ্চল এখনো অশান্ত

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল ও মিয়া হোসেন : কাল শনিবার ২ ডিসেম্বর পূর্ণ হচ্ছে পার্বত্য চুক্তির ২০ বছর। পাহাড়ে শান্তির আশায় করা এই চুক্তির পর দু‘দশক  পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে শান্তিতো ফিরে আসেইনি বরং নানা কারণে সন্দেহ-অবিশ্বাস, হিংসা হানাহানি এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি অনেকগুণ বেড়েছে বলে মনে করেন পাহাড়িরা।

এখনো প্রতিনিয়ত বারুদের গন্ধ আর আধিপত্যের দ্বন্দ্বে রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে সবুজ পাহাড়। অপহরণ চাঁদাবাজি যেমন অনেক গুণ বেড়েছে তেমনি বেড়েছে খুন, রাহাজানি আর পারস্পরিক দ্বন্দ্বও। চুক্তির আগে পাহাড়ে-বনে-জঙ্গলে থেকে যারা চোরাগুপ্তা হামলা চালাতো তারাই এখন শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অট্টালিকায় বসে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে।

সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে খোদ সরকারি মন্ত্রী এমপি ও কর্মকর্তারা পাহাড়ে অস্ত্র উদ্ধারের দাবি তুলছেন। কিন্তু বাস্তবে সন্ত্রাসীদের নিরস্ত্র করা বা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না হওয়ায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম দিন দিন বেড়েই চলেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী উপজাতিদের প্রতিনিধি জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং শান্তি বাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা।

চুক্তির ২০ তম বর্ষপূর্তি সামনে রেখে এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা বলেছেন, সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধী। এই চুক্তি বাস্তবায়ন সরকার করে না। উল্টো যারা চুক্তির বাস্তবায়ন করতে চায়, সেই জেএসএসের বিরুদ্ধে নানা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। বুধবার রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে এ অভিযোগ করেন সন্তু লারমা। পার্বত্য চুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জনসংহতি সমিতি।

এর আগে ২০১৪ সালে সরকারকে একটি আল্টিমেটামও দেন সন্তু লারমা। ওই বছর পার্বত্য চুক্তি ১৭ বছর পূর্তির প্রাক্কালে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি ঘোষণা দেন যে, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হলে তারা অসহযোগ আন্দোলনে যাবেন। এই আন্দোলন সহিংস বা অহিংস যেকোনো ধরনের হতে পারে বলেও হুমকি দেন তিনি। পরবর্তীতে ঘোষিত ওই কর্মসূচীর দেখা মেলেনি ।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের ভূখন্ড থেকে আলাদা করে জুম্মল্যান্ড গঠনের দাবিতে আন্দোলন করা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও তাদের সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনী দুই দশকেরও বেশি সময় তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাস রাহাজানী চালানোর প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিবাহিনীর সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নামে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে পাহাড়ের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে এক তরফা সুবিধা দিয়ে করা এই চুক্তিকে সংবিধান বিরোধী কালো নামে আখ্যায়িত করে পাহাড়ের বাঙালি জনগোষ্ঠী,বিএনপি-জামায়াতসহ তৎকালীন চারদলীয় জোট এবং দেশের বুদ্ধিজীবী মহল।

পক্ষান্তরে চুক্তির মাধ্যমে শান্তি বাহিনীর একটি অংশের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নিয়ে তখনকার সরকার এই চুক্তিকে শান্তিচুক্তি নামে আখ্যায়িত করে।

চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করে। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ৪ দফায় শান্তিবাহিনী মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পন করে। সে বছরই ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভারত থেকে উপজাতীয় শরনার্থীদের মোট ৬ দফায় ১২ হাজার ৩২২ পরিবারের ৬৩ হাজার ৬৪ জন উপেন্দ্র লাল চাকমার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ফিরে আসে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ৬ মে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংসদে পাশ হয়।

১৫ জুলাই ১৯৯৮ এক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয় এবং খাগড়াছড়ির তৎকালীন আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ কল্প রঞ্জন চাকমাকে প্রথম পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। এর পর ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সরকার জনসংহতি সমিতির প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমাকে চেয়ারম্যান করে ২২ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সন্তু লারমা দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অদ্যাবদি তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন।

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত পার্বত্য চুক্তির ৭২টি শর্তের মধ্যে ৪৮টি শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যে ধারাবাহিকতায় সরকারের ২৯ বিষয় ও বিভাগের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট। এর মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিসহ প্রধান প্রধান বিভাগগুলি অন্তর্ভুক্ত। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার বাঙালি অধিবাসীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয় এবং তারা নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে পড়ে।

এদিকে পাহাড়ের বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অধিকার ক্ষুণœকারী এই চুক্তি বাতিল বা সংশোধের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আর ইউপিডিএফ নামে পাহাড়িদের অপর একটি সংগঠন এই চুক্তিতে তাদের দাবির প্রতিফলন হয়নি বলে একই সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

এই আন্দোলনের জন্য তারা পাহাড়ের সকল ব্যবসা বাণিজ্য ও উন্নয়ন কাজের উপর টোল আরোপ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অব্যাহতভাবে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ইউপিডিএফকে মোকাবেলার নাম করে শান্তিবাহিনী আবারো অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে তারাও চাঁদাবাজি খুন ও গুমের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

পক্ষান্তরের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাহাড় থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর ক্যাম্পগুলো সর্বশেষ সরকারের আগের মেয়াদের পার্বত্য এলাকা থেকে একটি ব্রিগেডসহ ৩৫টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়।

বন জঙ্গল ঘেরা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নাভি হিসেবে পরিচিত পার্বত্য এলাকা থেকে এসব সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ায় চারদিকে বর্তমানে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে।

চাঁদাবাজির এলাকা ভাগাভাগী ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষ চাঁদাবাজদের গুলীতে নিহত হচ্ছে অসংখ্য যুবক, সাধারণ পাহাড়ি এবং বাঙালিরাও তাদের আক্রোশের শিকার হচ্ছে।

চুক্তি পরবর্তী ২০ বছরে পাহাড়ে সাম্পদায়িক সংঘাত এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন হয়েছে সরকারি হিসাব মতে ৪১৯ জন মানুষ। এর মধ্যে বাঙালি ১২১ জন এবং পাহাড়ি ২৯৮ জন।

অন্য সূত্রগুলো বলছে,নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও পাহাড়ে তিনটি বিবাদমান উপজাতীয় সংগঠনের সংঘাতে গত ২০ বছরে কমপক্ষে ৭০০ জন নিহত হয়েছে। 

প্রতিনিয়ত চাঁদার জন্য বাঙালিদের ধরে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও সরকারি বেসরকারি উন্নয়ন কর্মী ও উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে জিম্মি করা হচ্ছে।

পক্ষান্তরে সাধারণ পাহাড়িরা বলছেন, “চুক্তির ফলে গুটি কয়েক মানুষ সুবিধা পেলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠী সাধারণ উপজাতীয়দের মাথা বিক্রি করে নিজেরা ফায়দা লুটছে এবং দেশের বিরুদ্ধে য়ড়যন্ত্র করছে। সাধারণ মানুষ থেকে চাঁদা নিয়ে এসব নেতারা নিজেদের ছেলে মেয়েদের বিদেশে লেখাপড়া করাচ্ছে, আর দাতাদের টাকায় গড়া এনজিও কর্মকান্ডে নিজ আত্মীয়দের বড় বড় পদে বসিয়ে দিচ্ছে।” সব মিলিয়ে পাহাড় আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠার আশঙ্কা করছে সাধারণ মানুষ।

সরকারই পার্বত্য চুক্তির বিরোধী

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা বলেছেন, সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধী। এই চুক্তি বাস্তবায়ন সরকার করে না। উল্টো যারা চুক্তির বাস্তবায়ন করতে চায়, সেই জেএসএসের বিরুদ্ধে নানা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। গত বুধবার রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে এ অভিযোগ করেন সন্তু লারমা। পার্বত্য চুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জনসংহতি সমিতি।

সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা বলেন, বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেই পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল। তাহলে তারা কেন চুক্তি বাস্তবায়ন করে না? তাদের যদি সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকে, তাঁরা যদি গণতান্ত্রিক হয়, অসাম্প্রদায়িক হয়, তাঁরা যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়, তাঁরা যদি দেশের উন্নয়ন চায়, তাহলে আজ এই বাস্তবতা কেন? প্রতিবছর কেন একই কথা বলতে হয়। 

সন্তু লারমা বলেন, ‘বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, বাম-ডান বা মধ্যপন্থী নানা পন্থী রাজনৈতিক দল কেউ কিছু বলে না আমাদের ব্যাপারে। ২০ বছর হলো পার্বত্য চুক্তি হয়েছে, কেউ তো তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে না। সরকারি দল (আওয়ামী লীগ), বিএনপি সরকারের আমলেও হয়নি।’ তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুম্ম জনগণের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের আর পেছনে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতর জন্য সরকার দায়ী থাকবে। 

‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব’

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, যাদের ওপরে চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব তারাই এ থেকে সরে যাচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর 

পার্বত্যবাসীর ভূমি অধিকার সমস্যা ও সমাধান’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন রিইব এর নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, এএলআরডি’র চেয়ারপারসন খুশী কবির, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বাঞ্ছিতা চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রমুখ।

সুলতানা কামাল বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তি ২০ বছর পর অনেকটা বাস্তবায়ন হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে সেই কাজগুলো অগুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি বাস্তবায়নের ফলাফল পাওয়ার বিষয়টা আমরা পৌঁছাতে পারছি না এখনো। লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।’

দিন দিন প্রতিবন্ধকতাগুলো আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতে চুক্তি বাস্তবায়ন করা যতটা সহজ ছিল এখন সেটা আর তত সহজ নেই। কারণ জনপ্রতিনিধির যে ব্যাপার আছে সেটা বদলে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগষ্ঠীর অনুপাত বদলে গেছে। নানা আইনকানুন চলে এসেছে। যে আইনগুলো সংশোধন করা হয়েছে সেটাও যে খুব বেশি যথাযথ সংশোধন হয়েছে সেটাও না। যে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার কথা ছিল সেটা সেভাবে গড়ে উঠেনি।’

সুলতানা কামাল বলেন, ‘ক্রমশ চুক্তি বাস্তবায়ন বাধার সম্মুখীন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক যেসব পক্ষ রয়েছে তাদের যে আচরণ তাতে আমরা এ কথা বলছে বাধ্য হচ্ছি যে-যাদের ওপরে চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব তারা এর থেকে সরে গেছে। তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।’

বর্তমান প্রেক্ষাপট

এদিকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে উপজাতিরা। পার্বত্য এলাকায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে বিগত ২০ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও পার্বত্যবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি চুক্তির মৌলিক অনেক বিষয়। বাস্তবে দেখা যায় চুক্তির বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে। শান্তিচুক্তি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়ে/দপ্তর হস্তান্তর করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তির কিছু কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে অবশিষ্ট চুক্তি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এরপরও আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনের নেতা ও কতিপয় বুদ্ধিজীবী ক্রমাগত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করে যাচ্ছেন। সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকলেও আঞ্চলিক উপজাতি রাজনৈতিক দলসমূহের বিরূপ মনোভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। পার্বত্য জেলা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলেন, আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনগুলোর এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব থাকলে সরকারের একার পক্ষে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। চুক্তি বাস্তবায়নে সকলকে শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তির সুফল হিসেবে উপজাতি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, তাদের দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বেশকিছু সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশের সমতলের জেলাগুলোর মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। পার্বত্য জেলার অধিবাসীরা জানান, পার্বত্যাঞ্চলে মোতায়েনরত সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৩ পার্বত্য জেলায় ৪১ হাজার ৮৪৭ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২২ হাজার ৪১০ জনকে বিধবা ভাতা, ৭ হাজার ৩১১ জনকে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ৯৮১ জন প্রতিবন্ধীকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে ১ হাজার ৪৬টি সমিতির মাধ্যমে ৫২ হাজার ১৭২ জন সদস্যের দারিদ্র্যবিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৬২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে যেখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ ছিল না সেখানে নির্মিত হয়েছে ১টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১টি মেডিকেল কলেজ। হাইস্কুল ও কলেজের সংখ্যা যেখানে ছিল মাত্র ১১টি সেটা এখন ৪৭৯টি। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার হার ২ ভাগ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪৪ দশমিক ৬২ ভাগে পৌঁছেছে। যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার হার ৫৯ দশমিক ৮২ ভাগ সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ ভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের শিক্ষার হার ২৩ ভাগ । সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ১টি থেকে ৩টি করা হয়েছে, হাসপাতালের সংখ্যা ৩টি থেকে ২৫টিতে উন্নীত হয়েছে। যেখানে কোনো খেলার মাঠ ছিলো না সেখানে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। কলকারখানা, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ১৯৩টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১৩৮২টিতে উন্নীত হয়েছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এককালের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে।

পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উপজাতিদের জন্য ৫ ভাগ সংরক্ষিত কোটার ব্যবস্থা করেছেন, উপজাতিদের সরকারি ট্যাক্সের আওতামুক্ত রেখেছেন। এ সবই করা হয়েছে তাদের আর্থ-সামাজিক ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে। সরকারের দেয়া এসব সুবিধা ভোগ করে শিক্ষা, চাকরি এবং জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে উপজাতিদের ব্যাপক উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। দিন দিন এ অবস্থার আরও উন্নতি হবে। শান্তিচুক্তির সুফল ভোগ করে উপজাতিদের বর্তমান জীবন যাত্রার মান, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রসরতা প্রভৃতি বিবেচনা করে এ কথা বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ নয়। তবে স্বাধীন নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের দিক থেকে পাহাড়ের বাংলাভাষী অধিবাসীরা অনেক পেছনে, সর্বাংশে বঞ্চিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ