বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০
Online Edition

সঙ্গীতশিল্পী বারী সিদ্দিকী আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার ও নেত্রকোণা সংবাদদাতা : ‘শুয়া চান পাখি আমার, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি..’ জনপ্রিয় এ ভাববাদী গানের কণ্ঠশিল্পী বারী সিদ্দিকী আর নেই। যশস্বী এ সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার ও বাঁশীবাদক কয়েকদিন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৫ মিনিটে ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য ভক্ত-গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে বড় ছেলে সাব্বির সিদ্দিকী গতকাল শুক্রবার সকালে তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রাজধানী ঢাকা ও নেত্রকোণায় চার দফা নামাযে জানাযা এবং তার স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিবেদনের পর এদিন বাদ মাগরিব পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরসমাহিত করা হয়। এদিকে, আধ্যাত্মিক ও লোকগানের এ নন্দিত শিল্পীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলাদা আলাদা বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
সাব্বির সিদ্দিকী জানান, বছর দুয়েক ধরে তার বাবা কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। গত বছর থেকে সপ্তাহে তিন দিন তিনি কিডনির ডায়ালাইসিস করছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, তার দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে পরেছিল। তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। এ ছাড়া গত ১৭ নবেম্বর রাতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রাজধানীর বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি অচেতন ছিলেন। ১৮ নবেম্বর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক আবদুল ওয়াহাবের তত্ত্বাবধায়নে সাত দিন আইসিইইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও তার অবস্থার অবনতি ঠেকানো যায়নি।
সাব্বির জানান, স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর তার বাবার লাশ মোহাম্মদপুরের আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে লাশ সকাল সাতটায় ধানমন্ডির বাসায় নেয়া হয়। বাসা থেকে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে লাশ নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রথম নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঙ্গীত জগতের অনেকেই মরহুমের জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করেন।
এরপর তার লাশ বহনকারী গাড়িটি নিয়ে যাওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে। সেখানে সকাল পৌনে ১১টার দিকে তার দ্বিতীয় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এ জানাযায় বিটিভির কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ শিল্পী ও কলাকুশলীরা অংশগ্রহণ করেন। বারী সিদ্দিকী বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এ দুটি নামাযে জানাযায় অংশ নেয়া শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে ছিলেন ফকির আলমগীর, নকীব খান, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, রবি চৌধুরী, মানাম আহমেদ, নোলক বাবু, পল্লব স্যানাল, জালাল আহমেদ প্রমুখ। বিটিভি প্রাঙ্গণ থেকেই তার লাশবাহী গাড়ি নেত্রকোনা গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দেয়।
মূলত লোকগান ও আধ্যাত্মিক ধারার গানের জন্য পরিচিত এই শিল্পী গত শতকের শেষ দিকে সারা দেশের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছান কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে। চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকে তার দরদী কণ্ঠের বেশ কিছু আবেগমাখা গান দারুণ জনপ্রিয়।
সাব্বির সিদ্দিকী জানান, আসর নামাযের পর নেত্রকোণা শহরের সাতপাই এলাকার সরকারি কলেজ মাঠে বারী সিদ্দিকীর তৃতীয় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তার লাশবাহী গাড়ি কলেজ মাঠে নিয়ে আসলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার দর্শক শ্রোতা ভক্তবৃন্দের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাদ আসর সেখানেই তার তৃতীয় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।  পরে সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের কারলী গ্রামে নিজে হাতে গড়া ‘বাউল বাড়ী’তে নিয়ে গেলে সেখানে চতুর্থ দফা নামাযে জানাযা শেষে বাদ মাগরিব পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সরকারি কলেজ মাঠে মরহুমের নামাযে জানাযায় উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি কামরুল কাদের রিপন, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস, জেলা প্রশাসক ড. মোঃ মুশফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মতিয়র রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশলাফ আলী খান খসরু, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার রায়, জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক ড্যাব নেতা অধ্যাপক ডাঃ আনোয়ারুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম মনিরুজ্জামান দুদুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বাঁশি ও কণ্ঠের মাদকতায় মুগ্ধতা ছড়ানো বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নবেম্বর নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের ফচিকা গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে নেত্রকোনা শহরে এ শিল্পীর আরো দুটি বাড়ি আছে। তারই একটি হলো কারলি গ্রামের ‘বাউল বাড়ি’।
পরিবারেই শৈশবে তার গান শেখার হাতেখড়ি হয়। কিশোর বয়সে নেত্রকোণার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন বারী। পরে ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ বহু গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য পান। একটি কনসার্টে বারি সিদ্দিকীর গান শুনে তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন ওস্তাদ আমিনুর রহমান। পরে ছয় বছর ধরে চলে সেই প্রশিক্ষণ।
বিগত শতকের সত্তরের দশকে নেত্রকোণা জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন বারী সিদ্দিকী। পরে ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ধ্রুপদী সংগীতের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। এক সময় বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং উচ্চাঙ্গ বংশীবাদনের প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পন্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন বারী। দেশে ফিরে লোকগানের সঙ্গে ধ্রুপদী সংগীতের মিশেলে গান শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে এ উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশ নেন।
ঢাকার বিভিন্ন স্টুডিওতে বাঁশি বাজিয়ে বেড়ানোর মধ্যেই ১৯৯৩ সালে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে তার বাসায় এক অনুষ্ঠানে বাঁশি শোনাতে যান বারী সিদ্দিকী। সেই অনুষ্ঠানে বারীর বাঁশির চেয়ে তার কণ্ঠে গাওয়া রশিদ উদ্দিন বাউল আর উকিল মুন্সির গানই বেশি পছন্দ হয় হুমায়ূনের। পরে লেখক হুমায়ূনের আগ্রহেই বারীর কণ্ঠে ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়,’ ‘পুবালি বাতাসে’ গানগুলো রেকর্ড করা হয়। টেলিভিশনে ‘রঙের বাড়ই’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’ গানটি প্রচার করা হলে বারী সিদ্দিকী পৌঁছে যান সারা দেশের শ্রোতাদের হৃদয়ে।
বারী সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন নেত্রকোনা আঞ্জুমান সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক করেন। এরপর পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন সংগীতের সঙ্গে। বাঁশীবাদক হিসেবে তখন তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বাসা থেকে বের হতেন সকাল ৯টায়, ফিরতেন রাত ১২টায়। স্টুডিও, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার কিংবা মঞ্চের অনুষ্ঠান নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। গান গাইতেন বাসায় কিংবা পরিচিতজনদের মাঝে।
তবে নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে গানের জগতে বারী সিদ্দিকীর আসা এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করা। ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটি নির্মাণ করেন। তখন ওই ছবিতে গান গাওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রণ পান। ওই ছবির ‘শুয়া চান পাখি আমার, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি..’, ‘পুবালি বাতাসে..’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়..’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া মরদ লোকের কাম..’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো..’ গানগুলোই বারী সিদ্দিকীকে পৌঁছে দেয় সারাদেশের সব শ্রেণির দর্শক শ্রোতার কাছে। এরপর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
বারী সিদ্দিকী এ পর্যন্ত ১৬০টি গান গেয়েছেন। তার ১২টি একক ও ২টি মিশ্র এলবাম প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য এলবামগুলো হলো -‘নিলুয়া বাতাস’, ‘দুঃখ দিলে দুঃখ পাবি’, ‘মনে বড় জ্বালা’, ‘দুঃখ রইলো মনে’, ‘ভালোবাসার বসতবাড়ি’, ‘সরলা’, ‘ভাবের দেশে চলো’ প্রভৃতি। তিনি একাধিক চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন।
মৃত্যুর আগেও তিনি একটি এলবামের কাজ করেছেন। এ এলবামের ১০টি গানের কথা লিখেছেন দেলোয়ার আরজুদা শরফ, সুর ও সংগীত পরিচালনা এবং গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন স্বয়ং বারী সিদ্দিকী। এ এলবামটি প্রসঙ্গে সাব্বির বলেন, কিছুদিন আগে গানগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। বাবার অসুস্থতার কারণে কাউকে জানানো সম্ভব হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ