ঢাকা, মঙ্গলবার 2 June 2020, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৯ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বারী সিদ্দিকীর দাফন নেত্রকোনায়

সংগ্রাম অনলাইন : ‘শুয়া চান পাখি আমার, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি..’ বহুল জনপ্রিয় এ আধ্যাত্মিক গানের কণ্ঠশিল্পী বারী সিদ্দিকী চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেছেন। তিনি আর জাগবেন না।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আধ্যাত্মিক ও লোকগান সৃষ্টির প্রখ্যাত এ গীতিকার, বাঁশিতে যাদুকরী সুরের মূর্ছনা তোলা বংশীবাদক ও প্রথিতযশা এ সঙ্গীতশিল্পী আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

এ শিল্পী গত কয়েকদিন ধরেই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দু’টার দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহেরাজেউন)। স্কয়ার হাসপাতালের কর্মকর্তা মাহমুদুন্নবী জানান, রাত দু’টা ৫ মিনিটে বারী সিদ্দিকী ইন্তেকাল করেছেন।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

তার বড় ছেলে সাব্বির সিদ্দিকী জানান, বছর দুয়েক যাবৎ তার বাবা কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। গত বছর থেকে সপ্তাহে ৩ দিন তিনি কিডনির ডায়ালাইসিস করছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, তার দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে পরেছিল। তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। এ ছাড়া গত শুক্রবার রাতে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি অচেতন ছিলেন।

সাব্বির জানান, স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর তার বাবার মরদেহ মোহাম্মদপুরের আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মরদেহ সকাল সাতটায় ধানমন্ডির বাসায় নেয়া হয়। বাসা থেকে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে মরদেহ নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগীত জগতের অনেকেই জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর তার মরদেহ বহনকারী গাড়িটি নিয়ে যাওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে। সেখানে সকাল পৌনে ১১টার দিকে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ জানাজায় বিটিভির কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ শিল্পী ও কলাকুশলীরা অংশগ্রহণ করেন।

দুই জানাজায় অংশ নেয়া শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে ছিলেন ফকির আলমগীর, নকীব খান, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, রবি চৌধুরী, মানাম আহমেদ, নোলক বাবু, পল্লব স্যান্নাল, জালাল আহমেদ প্রমুখ। বিটিভি প্রাঙ্গণ থেকেই তার লাশবাহী গাড়ি নেত্রকোনা গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দেয়।

সাব্বির তার বাবার শেষ ইচ্ছার কথার উল্লেখ করে বলেন, তার বাবার ইচ্ছানুযায়ী তাকে নেত্রকোনার কারলি গ্রামে তার নিজ হাতে গড়া ‘বাউল বাড়ি’তে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। অনেক আশা করে তার বাবার এ বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তবে দাফনের আগে বাদ আসর নেত্রকোনা সরকারী কলেজ মাঠে তার তৃতীয় ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

বাঁশি ও কণ্ঠের মাদকতায় মুগ্ধতা ছড়ানো এ শিল্পী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের ফচিকা গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে নেত্রকোনা শহরে এ শিল্পীর আরো দুটি বাড়ি আছে। তারই একটি হলো কারলি গ্রামের এ ‘বাউল বাড়ি’।

ধ্রুপদী সংগীতে বারী সিদ্দিকীর তালিম নেয়া শুরু ১২ বছর বয়সে। তিনি গোপাল দত্ত, আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ আরও অনেকের কাছে তালিম নিয়েছেন। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনেতে পন্ডিত ভিজি কারনাডের কাছেও তালিম নেন। ১৯৯৯ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে এ উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

বারী সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন নেত্রকোনা আঞ্জুমান সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক করেন। এরপর পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন সংগীতের সঙ্গে। বংশীবাদক হিসেবে তখন তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বাসা থেকে বের হতেন সকাল ৯টায়, ফিরতেন রাত ১২টায়। স্টুডিও, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার কিংবা মঞ্চের অনুষ্ঠান নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। গান গাইতেন বাসায় কিংবা পরিচিতজনদের মাঝে।

তবে নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে গানের জগতে বারী সিদ্দিকীর আসা এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করা। ১৯৯৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটি নির্মাণ করেন। তখন ওই ছবিতে গান গাওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রণ পান। ওই ছবির ‘শুয়া চান পাখি আমার, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি..’, ‘পুবালি বাতাসে..’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়..’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া মরদ লোকের কাম..’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো..’ গানগুলোই বারী সিদ্দিকীকে পৌঁছে দেয় সারাদেশের সব শ্রেণীর দর্শক শ্রোতার কাছে। এরপর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

বারী সিদ্দিকী এ পর্যন্ত ১৬০টি গান গেয়েছেন। তার ১২টি একক ও ২টি মিশ্র এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য এ্যালবামগুলো হলো -‘নিলুয়া বাতাস’, ‘দুঃখ দিলে দুঃখ পাবি’, ‘মনে বড় জ্বালা’, ‘দুঃখ রইলো মনে’, ‘ভালোবাসার বসতবাড়ি’, ‘সরলা’, ‘ভাবের দেশে চলো’ প্রভৃতি। তিনি একাধিক চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন।

মৃত্যুর আগেও তিনি একটি এ্যালবামের কাজ করেছেন। এ এ্যালবামের ১০টি গানের কথা লিখেছেন দেলোয়ার আরজুদা শরফ, সুর ও সংগীত পরিচালনা এবং গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন স্বয়ং বারী সিদ্দিকী। এ এ্যালবামটি প্রসঙ্গে সাব্বির বলেন, কিছুদিন আগে গানগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। বাবার অসুস্থতার কারণে কাউকে জানানো সম্ভব হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে বারী সিদ্দিকী বরাবরই গান গাইতেন উল্লেখ করে তার ছেলে আরো জানান, হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় তার কোন এক জন্মদিনে বারী সিদ্দিকীকে দু-একটা বিচ্ছেদ গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই রাতে হুমায়ূন আহমেদের ধানমন্ডিতে বাসায় বসার ঘরে বারী সিদ্দিকী ৩৫টি গান গেয়েছিলেন। তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন নতুন এ মেধাবী শিল্পীর গান।

চিকিৎসকরা তাকে পূর্ণ বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি জানান, কিন্তু তার বাবার চিকিৎসকদের জানালেন- ‘আমি গান গাইতে গাইতে মরতে চাই। আমার মৃত্যু যদি মঞ্চে হয়, তাহলে সেটাই হবে আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের।’ সূত্র: বাসস। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ