মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রসবকালে মাতৃমৃত্যু

সন্তান প্রসব করার সময় দেশে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতি এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে ১৯৬ জন মায়ের। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৯৪। শুধু তা-ই নয়, প্রতি পাঁচজন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজন প্রসবের আগে, প্রসবকালে এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে কোনো রকম স্বাস্থ্যসেবাই পান না। ৫০ শতাংশ গর্ভবতী নারী দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী বা ধাত্রীর সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকেন। 

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১৬-এর উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে আশংকাজনক আরো অনেক তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩১ লাখ শিশুর জন্ম হয় কিন্তু ১০ লাখেরই জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গেও রয়েছে বিস্ময়কর কিছু তথ্য। যেমন অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম দেয়া হয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় জানা গেছে, প্রসবের সময় খুব বেশি হলে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ গর্ভবতী মায়ের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়তে পারে। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশেরই স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করার কথা। 

অন্যদিকে বাংলাদেশে অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে ঢালাওভাবে। একই কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয়া তথা সিজারিয়ান শিশুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ২০০১ সালে মাত্র তিন শতাংশ শিশুকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মায়ের গর্ভ থেকে বের করা হয়েছে। ২০১০ সালে এই শিশুদের হার ছিল ১২ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিনজনেরও বেশি শিশুর জন্ম দেয়া হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে তথ্য জানা গেছে তা বিস্ময়কর শুধু নয়, যে কোনো বিচারে অগ্রহণযোগ্যও। যেমন ব্যক্তি মালিকানাধীন বা প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে সাত লাখ ৫০ হাজার শিশুর। একই সময়ে এনজিও হাসপাতালে জন্ম হয়েছে ৪৩ হাজার শিশুর। বাকি শিশুরা জন্ম নিয়েছে সরকারি হাসপাতালে। বলা বাহুল্য, সরকারি হাসপাতালে সুযোগ পাওয়া যায় না বলেই গর্ভবতী মায়েরা ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হতে বাধ্য হন। আর এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক যেহেতু রোগীর সেবার চাইতে নিজেদের বাণিজ্য ও মুনাফা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে সেহেতু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান ভূমিষ্ঠ করার ক্ষেত্রেও দৌরাত্ম্য সীমা ছাড়িয়ে যায়। তারা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সময় দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং  নানা ভয়-ভীতি দেখিয়ে গর্ভবতী নারী ও তার স্বজনদের অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে বাধ্য করে। এর ফলে শিশুর পরিবারকে বিপুল অর্থের বোঝা টানতে হলেও হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে। তাদের আয় লাফিয়ে বেড়ে যায়। 

তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, মূলত বেশি অর্থের লোভেই সকল প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম দিয়ে থাকে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই গর্ভবতী নারী ও তার স্বজনরা সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ হওয়ায় চিকিৎসকদের কথায় তারা ভয় পেয়ে যান এবং সে অবস্থারই সুযোগ নেয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি মাতৃ ও শিশু কল্যাণ নিয়ে তৎপর অন্য সকল সংগঠনও তাদের গবেষণা রিপোর্টে জানিয়েছে, স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি নানা কারণে অনেক বেড়ে যায়। 

অস্ত্রোপচারের সময় তাৎক্ষণিক কিছু জটিলতা দেখা দেয়, বেশ কিছু ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীর জরায়ু ফেলে দিতে হয়। তাছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাকে অতিরিক্ত রক্ত দিতে হয়, যে রক্ত আবার ওই হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে তাদেরই বেঁধে দেয়া দরে কিনতে হয়। চিকিৎসকরা এমনকি স্বজনদের রক্ত নিতেও অস্বীকৃতি জানান। পাশাপাশি রক্ত দানের জন্য ইচ্ছুক স্বজনদের রক্ত পরীক্ষা এবং গর্ভবতী নারীর রক্তের সঙ্গে ক্রস ম্যাচিংসহ এমন কিছু বিষয়ের জন্য জেদ ধরে বসেন যেগুলো সম্পন্ন করতে অনেক সময় তো লাগেই, একই সাথে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও জটিলতাও বেড়ে যায়। এজন্যও স্বজনরা হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসকদের হুকুম মানতে বাধ্য হন। 

কথা শুধু এটুকুই নয়। অনুসন্ধানে ও পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে সুযোগ পাওয়া যায় না বলেই গর্ভবতী নারীদের প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করতে হয়। তাছাড়া সুযোগ পাওয়া গেলেও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রায় সকলেই কোনো না কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সঙ্গে জড়িত থাকায় রোগীদের তারা ওইসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য প্রভাবিত করেন। অনেককে ভয় দেখিয়ে বাধ্যও করা হয়। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও কিন্তু সকলে সমান ও ঝুঁকিমুক্ত চিকিৎসা সেবা পান না। অনেক গর্ভবতীর প্রসবের সময় চিকিৎসকরা উপস্থিত থাকেন না। তাদের পরিবর্তে নার্স ও আয়ারা প্রসব করানোর দায়িত্ব পালন করে। ফলে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে অনেক মাকেই বিপদে পড়তে হয়। কারো কারো এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। তাছাড়া অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভেতরে ছুরি-কাঁচি পর্যন্ত রেখে দেয়া হয়। মাত্র ক’দিন আগে কুমিল্লার এক ক্লিনিকে তো জমজ বাচ্চার একজনকে ভেতরে রেখেই অস্ত্রোপচারের কাজ সম্পন্ন করেছেন একজন নারী চিকিৎসক! অর্থাৎ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো কেবলই অর্থের জন্য ব্যস্ত থাকে। গর্ভবতী নারী ও শিশুর জীবনের ব্যাপারেও তাদের কোনো দায়িত্ব বোধ থাকে না।

এভাবেই বাংলাদেশে একদিকে মাতৃমৃত্যু বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে বাড়ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর নামে বাণিজ্য। আমরা মনে করি, অবস্থায় অবশ্যই পরিবর্তন ঘটানো দরকার। আর এজন্য দরকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সুবিধা অবারিত করা। সরকারের উচিত সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় নিয়ম ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যাতে গরীব ও সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সকলের পক্ষেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পাওয়া সহজে সম্ভব হয়। কোনো পর্যায়েই যাতে ঘুষের অর্থ গুনতে না হয়। সরকারকে একই সাথে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর বাপারেও কঠোর অবস্থান নিতে হবে, তারা যাতে গর্ভবতী নারীসহ অসুস্থ মানুষদের শোষণ ও বিপন্ন করতে না পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ