শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রক্তক্ষরণ-খিঁচুনিতে ৫৫ শতাংশ মায়ের মৃত্যু আশংকাজনকহারে বেড়েছে সিজারিয়ান প্রসব

স্টাফ রিপোর্টার : রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনির কারণে ৫৫ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে এবং এসবের চিকিৎসায় অগ্রগতি কম। অন্যদিকে, দেশে মাতৃমৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০১০ সালে প্রতি লাখে যেখানে ১৯৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো, সেখানে প্রতি লাখে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান আগের চেয়ে উন্নত হলেও মাতৃমৃত্যুর হার গত ছয় বছরে প্রতি লাখে ২ জন বেড়েছে।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি পরিচালিত একটি জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।  গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর হোটেল রেডিসনে নিপোর্ট আয়োজিত ‘বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্য সেবা জরিপ- ২০১৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জরিপ প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক। নিপোর্টের মহাপরিচালক রওনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল শিক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সচিব ফয়েজ আহমেদ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, নিপোর্টের পরিচালক (গবেষণা) রফিকুল ইসলাম সরকার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
জরিপ মতে, এখনও ৫০ শতাংশের বেশি প্রসব বাড়িতে হচ্ছে। কমিউনিটি পর্যায়ে মাত্র ১৭ শতাংশ প্রসবের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ প্রতিরোধে মিসোপ্রসটল ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে। মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে (কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়) রক্তক্ষরণ বন্ধে অক্সিটোসিন ইনজেকশন সরবরাহ করা হয়। মাত্র ২৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খিঁচুনির চিকিৎসায় ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ইনজেকশন সরবরাহ হয়।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানসম্মত মাতৃস্বাস্থ্য সেবা প্রদানে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। স্বাভাবিক প্রসব সেবাদানকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মাত্র ৩৯ শতাংশ কেন্দ্রে চব্বিশ ঘণ্টা সেবা প্রদানের জন্য নিজস্ব সেবাদানকারী আছে। ৩ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানসম্মত স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদানের প্রস্তুতি আছে। মাত্র ৪৬ শতাংশ উপজেলা বা উচ্চতর পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং মাত্র ২০ শতাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি প্রসূতি সেবার উপর প্রশিক্ষিত কমপক্ষে একজন সেবাদানকারী আছেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, মাতৃ-শিশু মৃত্যু হ্রাসে সরকার বেশ জোরালো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসবের বলেই আজ দেশে মাতৃ মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। তবে দেশের স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী মায়ের পরিবার-পরিজনদের আরো সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় সচেতনতা-সতর্কতার অভাবে হাতের কাছে সেবা থেকেও মায়ের মৃত্যু ঘটে।
জরিপে মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৮৪ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মৃত্যুহার ৩২২ (প্রতি লাখে) থেকে ১৯৪ এ হ্রাস পেয়েছিল। এটিই ছিল উল্লেখযোগ্য সফলতা। তবে ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ১৯৬ দাঁড়ায়, যা ২০১০ সালের প্রায় অনুরূপ। ১৯৬ জনের মধ্যে গর্ভাবস্থায় মারা যান ৪৮ জন, প্রসবের সময় ১৩ জন এবং প্রসব পরবর্তী ৬ সপ্তাহের মধ্যে ১৩৫ জন মা মারা যান।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় ২০১৬ সালে ৫০ শতাংশ প্রসব সম্পাদিত হয়েছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ২৭ শতাংশে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হারও বেড়েছে। ২০১০ সালে ২৩ শতাংশ মাতৃপ্রসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হত। এই হার এখন ৪৭ শতাংশে ঠেকেছে। তবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় অপরিবর্তিত।
বাংলাদেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানসম্মত মাতৃস্বাস্থ্য সেবা প্রদানের প্রস্তুত নয় উল্লেখ করে জরিপে বলা হয়, মায়েরা যেকোনো সমস্যা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পর যদি সেখানে সার্বক্ষণিক সেবাদানকারী থাকে তবে মাতৃমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। বাংলাদেশে ৩৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও মাত্র ৩ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র সেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত। এটি মাতৃমৃত্যু বৃদ্ধির অন্যতম কারণও।
এ ছাড়া উপজেলা বা উচ্চতর পর্যায়ে বেসরকারি ক্লিনিকে ৯৬ শতাংশ সিজারিয়ান প্রসব হয়। তবে মাত্র ১৬ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কম্প্রিহেনসিভ জরুরি সেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তুলনায় সেবার প্রস্তুতি দুর্বল। এটিও মাতৃমৃত্যু হার না কমার অন্যতম কারণ।
জরিপে বলা হয়, দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সম্পাদিত প্রসবের হার ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই সিজারিয়ান প্রসব হয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে।
 দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ১২ শতাংশ, ২০১৬ তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশে। এর মধ্যে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে ৮৩ শতাংশ, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৫ শতাংশ এবং এনজিও’র হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ৩৯ শতাংশ মা সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ