বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে

হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং বিভিন্ন খাতে আর্থিক দুর্নীতি ও জালিয়াতির পাশাপাশি অবৈধভাবে বিদেশে টাকা পাচারের মতো কর্মকান্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় ধারণা করা হয়েছিল, সরকার ও ব্যাংকসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ সতর্ক হবে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরবে। অন্যদিকে বাস্তব অবস্থায় পরিবর্তন তো ঘটেইনি বরং একযোগে সব খাতেই লাফিয়ে বেড়ে চলেছে দুর্নীতি। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে বুধবার প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত নয় বছরে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অন্যদিকে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। সাড়ে তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে অবলোপনের নামে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার মন্দ ঋণকে আড়াল করে ফেলার কৌশল। এই অর্থকে যোগ করা হলে দেশে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ বর্তমানে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইন ও নিয়ম না মেনে বিশেষ করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়ার ফলেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ এভাবে বেড়ে গেছে। সরকারদলীয় পরিচিতির বিবেচনায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে শুধু নয়, ঋণের অর্থ নির্ধারিত সময়ে ফেরৎ না দিলে যেহেতু কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না সে কারণেও ঋণের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারি ৫৬টি ব্যাংকের প্রতিটিই কমবেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে। পরিমাণে কম হলেও খেলাপি ঋণ রয়েছে এমনকি বিদেশী ব্যাংকগুলোরও।
আশংকার অন্য এক কারণ হলো, অর্থের পরিমাণের সঙ্গে ঋণ খেলাপি ব্যক্তিদের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেড় লাখের বেশি ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছেন। যুক্তির অবশ্য শেষ নেই তাদের। সময়মতো ঋণ এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া, রাজনৈতিক সংকটের কারণে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মঘটসহ শ্রমিক অসন্তোষের মতো অনেক অজুহাতের কথাই জানিয়ে থাকেন ঋণ খেলাপিরা। অন্যদিকে তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন, এসবের অধিকাংশই আসলে খোঁড়া যুক্তি। আসলে গলদ রয়েছে তাদের উদ্দেশের মধ্যে। বড় কথা, খেলাপি ঋণের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এই নেতারা প্রভাব খাটিয়ে ঋণের ব্যবস্থা যেমন করেন তেমনি আবার বাঁচিয়ে দেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কবল থেকেও। ফলে ঋণের অর্থ না দিয়েও পার পেয়ে যান খেলাপিরা। মূলত সে কারণেই বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এভাবে বেড়ে যাওয়াকে ব্যাংকিং ইতিহাসে এক বিরল ও অস্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আশংকার দ্বিতীয় কারণ হলো, বর্তমান সরকারের আমলে খেলাপি ঋণের ব্যাপারে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকই এগিয়ে রয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি সুপারিশের আড়ালে ক্ষমতাসীনদের চাপের কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে চলেছে বলে মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞরা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি না থাকার সুযোগে ব্যাংকিং খাতের চরম অব্যবস্থাপনার কথাও বলেছেন তারা। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ব্যাংকিং খাত তথা সমগ্র অর্থনীতিই মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও তথ্যাভিজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার খবর অত্যন্ত আশংকাজনক হলেও ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ রয়েছে বলেই একে বিস্ময়কর বা অস্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে না। এ যে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ নয় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে নিয়মিতভাবেই। প্রসঙ্গক্রমে শেয়ারবাজারের লক্ষ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা থেকে ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসবের অনেক ঘটনারই উল্লেখ করা যায়। কারণ, প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিটি কেলেংকারিতে ক্ষমতাসীনদের রথি-মহারথিরাই জড়িত রয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদগুলোর দিকেও লক্ষ্য করা যেতে পারে। সরকারের প্রথম আমলে এমন সব স্বল্প বয়সীকেই পরিচালনা পরিষদগুলোতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, যারা ব্যাংকিং-এর অ, আ, ক, খ সম্পর্কে কিছু জানেন কি না তা নিয়ে পর্যন্ত প্রশ্ন উঠেছে। তাদের প্রধান ‘যোগ্যতা’- সবাই ছাত্রলীগের নেতা বা নেত্রী ছিলেন। এসব পরিচালকও ভালোই দেখিয়ে ছেড়েছেন, যার প্রমাণ দেয়ার জন্য ‘হলমার্ক’সহ দু’চারটি মাত্র কেলেংকারির উল্লেখই যথেষ্ট। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক একাই কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ওদিকে রথি-মহারথিদের হুকুম তামিল করতে গিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারাও ছেড়ে কথা বলেননি। তারাও ঘুষ খেয়েছেন যথেচ্ছভাবে। এভাবে সবার অংশগ্রহণেই সর্বনাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে গেছে দেশের ব্যাংকিং খাত।
বলা দরকার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সততা ও সদিচ্ছার অভাবই পরিস্থিতিকে এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কারণ, অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীনরা শুধু ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসবেই মেতে থাকছেন না, এমন আরো কিছু পদক্ষেপও নিয়েছেন, যেগুলোর কারণেও একদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতি। যেমন মাঝখানে প্রায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঢালাওভাবে গ্যাসের সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখার কারণে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানই উৎপাদনে যেতে পারেনি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে খেলাপি ঋণও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের কবল থেকে রক্ষা করতে হলে সরকারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য শুধু ঘুষ-দুর্নীতির পথ থেকে সরে আসাই যথেষ্ট নয়, ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার দিকেও নজরদারি বাড়াতে হবে। কেবলই দলীয় পরিচিতির কারণে কাউকে ঋণ দেয়া চলবে না এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে। সেই সাথে গ্যাসের সংযোগ দেয়া এবং বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে ওঠাসহ এমন আয়োজন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে প্রকৃত শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা ঋণের অভাবে বাধাগ্রস্ত না হন। এভাবেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসতে পারে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ