বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বৈরী আবহাওয়ায় দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদনে ধস

খুলনা অফিস : গত কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ার কারণে সুন্দরবনের সাগর উপকূলের দুবলার চরের বিভিন্ন জেলে পল্লিতে শুঁটকি উৎপাদনে ধস নেমেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ভারী বৃষ্টি ও কুয়াশা পড়ায় সাগর থেকে আহরিত মাছ শুকাতে না পারায় কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল থাকায় জেলেদের গভীর সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া মওসুম অনুযায়ী অক্টোবরের প্রথমেই জেলেদের সাগরে যাওয়ার কথা। কিন্তু অক্টোবর থেকে চলতি নবেম্বর মাস পর্যন্ত দুই দফায় সাগরে মাছ আহরণ বন্ধ ছিল। এ কারণে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন এবার কিছুটা কমে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন জেলেরা। প্রায় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হওয়ার আশঙ্কা করছে বন বিভাগ। সুন্দরবন বন বিভাগের সূত্র জানায়, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শুরু থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দুবলার চরে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়। এ সময় সুন্দরবন উপকূলের গভীর সমুদ্র এলাকায় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী সামুদ্রিক মাছ শিকার করে থাকে। পরে এ মাছ সুন্দরবনের দুবলার চরসহ আশপাশের চর এলাকায় রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। কিন্তু এ বছর অক্টোবরের ২৩ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে শুঁটকি মওসুম। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী গত ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় এ সময়ে মাছ ধরার অনুমতি দেয়নি বন বিভাগ। এরপর গত ২৮ অক্টোবর থেকে ৫ নবেম্বর পর্যন্ত রাসমেলা উপলক্ষে মাছ আহরণ ও শুঁটকিকরণ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এসব কারণে দুবলার জেলেরা মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরিতে বড় একটা সময় হারিয়েছেন। এতে শুঁটকির উৎপাদনও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন জেলেরা। দুবলার চরের মৎস্যজীবী ও শুঁটকি ব্যবসায়ী আবুল বাশার ব্যাপারী জানান, তারা চলতি মওসুমে সাগরে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি তৈরির জন্য লাখ লাখ টাকা লগ্নি করেছেন। এ অবস্থায় গত কয়েক দিনের বৈরি আবহাওয়ার কারণে শুঁটকি তৈরির জন্য মাছ শুকানো যাচ্ছে না। দুবলার চরের ব্যবসায়ী মতলেব মিয়া বলেন, বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে মাছ শুকানো যায়নি, আমরা শেষ। সবারই একই অবস্থা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপরতো কারও হাত নেই। দেখি পরে কি হয়। দুবলা ফিসারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন জানান, সাগর থেকে আহরিত সামুদ্রিক মাছ রোদের অভাবে না শুকানোর কারণে পচে যাচ্ছে। এছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন জেলে ট্রলার ও নৌকায় করে সাগরে মাছ ধরতেও পারছেন না। তা ছাড়া বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ জলসীমায় রয়েছে ভোরতীয় জেলেসহ দেশি দস্যুদের আগ্রাসন। এরই মধ্যে দুবলার আলোরকোলের চাকলা থেকে ভারতীয় জেলেরা সাতক্ষীরা তালার ব্যবসায়ী রব বহদ্দারের মাছসহ তিনটি জাল কেটে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া দেশীয় জলদস্যুদের উৎপাতে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে দস্যু বাহিনী বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এলাকার ২৩ জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করেছিল। এসব জেলেরা সবাই সাগর থেকে মাছ ধরে এনে দুবলার চরে শুঁটকি প্রক্রিয়া করতো। এ অবস্থায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক দুবলার চরসহ আশপাশের মৎস্যজীবী ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার ওপরে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন। জেলে ও মহাজন সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি মওসুমকে ঘিরে এ বছর ১০-১৫ হাজার জেলে ও মৎস্য আহরণকারী জড়ো হয়েছেন সুন্দরবনের দুবলার চর, মেহের আলীর চর, আলোর কোল, অফিসকিল্লা, মাঝেরকিল্লা, শেলার চর ও নারকেলবাড়িয়া চরে। সুন্দরবন অভ্যন্তরে ছয়টি মৎস্য আহরণ, শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র নিয়ে দুবলার জেলে পল্লি। হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীরা দুবলার চর এলাকায় মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কাজে যোগ দিলেও বৈরি আবহাওয়ায় শুঁটকি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের দুবলার চর জেলে পল্লির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেষ্ট রেঞ্জার কাজী মোকাম্মেল কবির জানান, বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এবার এ খাত থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় অনেক কমে যেতে পারে। তবে সামনের দিনগুলোতে কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস না হলে রাজস্ব আদায়ের এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন এ কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ