মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আসেম সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

গত সোমবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দুই মহাদেশ এশিয়া ও ইউরোপের অর্ধ-শতাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যে সম্মেলন শুরু হয়েছে সেখানেও রোহিঙ্গা সমস্যা এবং বাংলাদেশের সংকট প্রাধান্য অর্জন করেছে। ‘আসেম’ নামের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা ও গণহত্যা বন্ধ করে অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ঢল থামাতে হবে। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে তারা যাতে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে য়েতে পারে সে জন্য ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এ উদ্দেশে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা। ‘আসেম’ সম্মেলনের প্রথম দিনের অধিবেশনে সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল অং সান সু চি’র বক্তব্য। মিয়ানমারের প্রধান নেত্রী হিসেবে সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে সু চি যে বক্তব্য রেখেছেন, সে বক্তব্যে বিস্ময়করভাবে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গই অনুপস্থিত ছিল। তিনি বরং সুকৌশলে নির্যাতন ও গণহত্যার অসহায় শিকার রোহিঙ্গাদের ওপরই সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার জন্য দোষ চাপিয়েছেন। রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখের পরিবর্তে সু চি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে যে সংঘাত চলছে তার জন্য অনুপ্রবেশ ও অভিবাসনই প্রধানত দায়ী। অনুপ্রবেশকারীরা সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা ছড়াচ্ছে। এর ফলে সামাজিক সংহতি নষ্ট হচ্ছে এবং সমাজ থেকে শান্তি বিতাড়িত হচ্ছে। একই কারণে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে এবং মানুষে মানুষে ও এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। অং সান সু চি’র বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ না করা হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, তিনি আসলে আরো একবার সংকটের মূল কারণকে পাশ কাটিয়ে গেছেন এবং সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার জন্য রোহিঙ্গাদের ওপর দোষ চাপানোর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার মতো তিনিও মনে করেন না যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। সু চি প্রকারান্তরে বরং রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। অং সান সু চি’র এই বক্তব্য ও অবস্থানের কারণে রোহিঙ্গা সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে নৈরাশ্যের সৃষ্টি হলেও বিশেষ করে ইউরোপের সকল দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাই তাদের বক্তৃতায় আহ্বানের আড়ালে মিয়ানমারের ওপর দায় চাপিয়েছেন। দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এ প্রসঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র তিন দফা প্রস্তাব সম্মেলনে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছে। মিয়ানমার যাওয়ার আগেরদিন বাংলাদেশ সফর করেছেন তিনি। রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে গিয়েও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা হয়েছে তার। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম প্রস্তাবে রাখাইন রাজ্যে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে এমন পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে যাতে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে। মন্ত্রী ওয়াং ই জানিয়েছেন, তেমন পরিবেশ এরই মধ্যে সৃষ্টি হতে শুরু করেছে এবং জ্বালাও পোড়াও বন্ধ হয়েছে। চীনের দ্বিতীয় প্রস্তাবে রয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জন। এজন্য দেশ দুটিকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সংলাপ ও সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন তিন। তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াং ই। দু’দেশের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে নিজের আলোচনার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, তার মনে হয়েছে, উভয় দেশই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। সুতরাং সংকটের সমাধান করা কঠিন বা অসম্ভব হবে না বলেই তার বিশ্বাস। বলার অপেক্ষা রাখে না, আসেম সম্মেলনে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্য ও অবস্থান রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষেই এসেছে। এমনকি এতদিন যে চীনকে মিয়ানমারের পক্ষের শক্তি হিসেবে মনে করা হতো, সেই রাষ্ট্র চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সাধারণভাবে তথা বাংলাদেশের সমর্থনেই বক্তব্য রেখেছেন। একই বক্তব্য প্রকাশ করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। আমরা চীনের এই বক্তব্য ও অবস্থানকে উৎসাহ্ব্যঞ্জক বলে মনে করি। লক্ষণীয় যে, চীন তার প্রথম প্রস্তাবে রাখাইন রাজ্যে জ্বালাও পোড়াও তথা হত্যা-সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং দেশটি মনে করে, মিয়ানমার সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরই মধ্যে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে যখন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে তাদের দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়া সম্ভব। আমাদের ধারণা, চীন যদি মধ্যস্থতা করে এবং মিয়ানমারের ওপর নিজের প্রভাব খাটায় তাহলে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া সময়ের বিষয়ে পরিণত হতে পারে। আমরা তেমনটাই আশা করতে চাই। একথাও অবশ্য মনে রাখা দরকার যে, মিয়ানমারের প্রধান নেত্রী অং সান সু চি আসেম সম্মেলনেও কোনো আশার কথা শোনাননি। তা সত্ত্বেও আমরা মনে করি, আওয়ামী লীগ সরকার যদি ভারতের প্রভাবমুক্ত হয়ে চীনের সহায়তা নেয়ার চেষ্টা করে এবং আসেমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ, বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশেষ করে জাতিসংঘও বাংলাদেশের পক্ষেই ভূমিকা পালন করে চলেছেÑ যার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া গেছে গত ১৭ নভেম্বরের ভোটাভুটিতে। এতে বিরত থাকার আড়ালে ভারত প্রকৃতপক্ষে বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের ১৩৫টি রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর অর্থ, বিশ্বের প্রায় সব দেশই রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। বাংলাদেশও যেহেতু শান্তিপূর্ণ পন্থায় রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানোর চেষ্টা করছে সেহেতু সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ইতিবাচক বলা যায়। এখন দরকার সুচিন্তিত কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং বিশেষ করে চীনের এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অন্যান্যের সহায়তা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে বসা এবং চুক্তিতে উপনীত হওয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ