শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

এস এমই ঋণ বিতরণে অনিয়ম

এম এস শহিদ : দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক এসএমই ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা  মানছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অমান্য করে অধিকাংশ ব্যাংকই ব্যবসা উপখাতে নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি ঋণ দিচ্ছে। উৎপাদক ও সেবা উপখাতে বিতরণ করছে অনেক কম। ৩৮টি ব্যাংক ও ১২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ জাতীয় অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এ জাতীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উৎপাদনশীল খাতের নামে ঋণ নিয়ে ঋণ গ্রহীতারা এ জাতীয় ঋণ নতুন শিল্প স্থাপন বা কারখানার পরিধি সম্প্রসারণে ব্যয় করে। এ ধরণের ঋণের বিপরীতে অধিকতর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট এসএমই ঋণের সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ ট্রেডিং বা ব্যবসা খাতে বিতরণে নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া এ জাতীয় ঋণের অন্তত ৩০ শতাংশ উৎপাদন এবং ১৫ শতাংশ সেবায় বিতরণের কথা বলা হয়েছে।
 আর ২০২১ সালে এসএমই ঋণের  ৪০ শতাংশ উৎপাদনে,৩৫ শতাংশ ব্যবসায় এবং ২৫ শতাংশ সেবায় বিতরণ করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী এখন থেকে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হলেও নতুন নিয়মের জন্য প্রস্তুতি নেয়া তো দূরের কথা. বরং বিদ্যমান নিয়মই ব্যাংকগুলো মেনে চলছে না। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাষ্ট  ব্যাংকের এমডি আনিস এ খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, আলাদাভাবে উৎপাদন উপখাতে এত গ্রাহক পাওয়া মুশকিল। যে কারণে প্রত্যাশা থাকলেও ব্যাংকগুলো উৎপাদনে ঋণ বাড়াতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বৎসরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৮৩ হাজার ৫০৭ কোটি টাকার এসএমই ঋণ বিতরণ করেছে। পুরো বৎসরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার যা ৬২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তবে এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা উৎপাদনে দেয়া হয়েছে। এটি মোট এসএমই ঋণের মাত্র ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সেবা খাতে দেয়া হয়েছে ১০ হাজার ২২২ কোটি টাকা, যা এসএমই ঋণের ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, আর ৫৩ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যবসা উপখাতে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে যা মোট এসএমই ঋণের ৬৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। মূলত ট্রেডিংয়ের ঋণে অপেক্ষাকৃত কম সমস্যা হওয়ায় ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ বিতরণে উৎসাহ দেখায়। চলতি বৎসরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এক লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এসএসমই ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে বিবেচনায় পুরো বৎসরের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ৬২ দশমিক ৩৯ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। গত বৎসর মোট এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বৎসরগুলোতে অন্য খাতের তুলনায় বাড়তি চাহিদার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি এসএমই ঋণ দেয়া হচ্ছে। যদিও ব্যবসা উপখাতে ব্যাংকগুলো এই ঋণের বড় অংশই দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ উপেক্ষা করে যে সমস্ত ব্যাংক ব্যবসা খাতে এসএমই ঋণ বেশি দিচ্ছে তন্মধ্যে সরকারি মালিকানায় ছয়টি, বিদেশি মালিকানায় দুটি ও বেসরকারি খাতের ৩০টি ব্যাংক রয়েছে।
সরকারি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে, সোনালী, রূপালি, জনতা,অগ্রণী, বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বেসরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে- আইসিবি ইসলামী, এনআরবি, গ্লোবাল, মিউচুয়াল ট্রাষ্ট, পূবালী, মার্কেন্টাইল , সোস্যাল ইসলামী, ব্রাক, ফারমার্স, স্ট্যান্ডার্ড, ওয়ান, যমুনা, বাংলাদেশ কমার্স, ন্যাশনাল, সিটি, এবি, ইস্টার্ন, প্রাইম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ইউনিয়ন, উত্তরা, মেঘনা, ইউসিবি, প্রিমিয়ার, এনআরবি, ঢাকা, আইএফআইসি, কমার্শিয়াল, এক্সিম, মিডল্যান্ড, সাউথইস্ট, এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। আর বিদেশি মালিকানার ব্যাংক গুলোর মধ্যে আছে স্টান্ডার্ড চাটার্ড ও ব্যাংক আল ফালাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসএমই ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিতরণ  করতে হয়।
ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট ঋণের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এসএমইতে বিতরণ করতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশানুযায়ী উৎপাদন ও সেবাখাতে এসএসমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্যবসা উপখাতে এসএমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে  করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎপাদন ও সেবাখাতে এত বেশি গ্রাহক পাওয়া কঠিন।
তাই চাইলেও ব্যাংকগুলো উৎপাদন খাতে ঋণ বাড়াতে পারছে না। এই জন্য তারা ব্যবসা বা ট্রেডিংয়ে সমস্যা কম হওয়ায় ওই খাতে এসএমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, এসএমই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তাদের উচিত এসএমই ঋণ বিতণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে চলেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ